বাণিজ্যচুক্তি
ট্রাম্পে অতিষ্ঠ ইউরোপ ভারতমুখী
রাবিন্দর কৌর
প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১১:০৬ | আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:২৫
স্টিভ জবস প্রথম আইফোন উন্মোচনের ঘোষণা দেন ২০০৭ সালে। তখন যুক্তরাষ্ট্রে সাবপ্রাইম মর্টগেজ সংকট ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিচ্ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নে নতুন করে রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া যুক্ত হয়। ভারত প্রথমবারের মতো এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হয়। ঠিক এই সময়েই দিল্লি ও ব্রাসেলসের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা শুরু। যার ফল দেখা যাচ্ছে প্রায় দুই দশক পর চলতি সপ্তাহেই কয়েক মাসের আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
গত ২৭ জানুয়ারি ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একে মাদার অব অল ডিলস বা সব চুক্তির জননী হিসেবে অভিহিত করেন। এই চুক্তির লক্ষ্যদল প্রায় ২০০ কোটি ভোক্তা এবং বিশ্বের মোট জিডিপির এক-চতুর্থাংশ মানুষ। চুক্তির আওতায় ভারতের ঐতিহ্যগতভাবে সুরক্ষাবাদী অভ্যন্তরীণ বাজারের কিছু অংশ উন্মুক্ত করা হচ্ছে, যাতে উৎপাদন ও সেবা খাতে রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো যায়। এর বিনিময়ে ইউরোপীয় গাড়ি ও পানীয় মাদক ভারতীয় মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের কাছে তুলনামূলক সস্তা হবে। তবে ইইউ-ভারত সামগ্রিক কৌশলগত এজেন্ডা কেবল বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এতে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা, বহুপাক্ষিকতায় অঙ্গীকার, জনশক্তি চলাচল এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত।
প্রায় ২০ বছর ধরে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা না থাকলেও হঠাৎ এই গতি কেন? ডোনাল্ড ট্রাম্পই তার একমাত্র উত্তর। ইইউ-ভারত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি মূলত মার্কিন-পরবর্তী এক বিশ্বব্যবস্থার আভাস দিচ্ছে। ইতোমধ্যে বিশ্ব ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি, শাস্তিমূলক শুল্ক আর বহুপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দেখেছে। বস্তুত আগে থেকেই আলোচনা চলছিল। গাড়ি, মাদক, কৃষি ও দুগ্ধপণ্যের মতো বিষয়ে মতবিরোধের কারণে প্রাথমিক আলোচনা চলছিল, যা ২০১৩ সালে বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালে কভিড-পরবর্তী সময়ে বিশ্বের ঝুঁকিমুক্তির প্রচেষ্টা এবং চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় করার প্রয়াসে আলোচনা ফের শুরু হয়। তবে পরিহাস হলো, চীন নয়, বরং ট্রাম্পের ছায়াই এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার আগেই ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নেওয়ার তোড়জোড় ইউরোপকে সংকটে ফেলে। ঘনিষ্ঠ মিত্রের কাছ থেকে এমন সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি ইউরোপজুড়ে অভিভাবকশূন্যতার অনুভূতি তৈরি করে।
এই সংকটের মধ্যে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করেন। এরপর তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ নামে বিশ্বের ৯০টি দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করেন। ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ হলো রাশিয়ার তেল কেনার কারণে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিনল্যান্ডে ন্যাটোর কয়েকটি দেশের সেনা পাঠানোর প্রেক্ষাপটে আবারও ইইউ ও যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে শুল্ক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন শুধু অনির্ভরযোগ্য নয়, বরং ইউরোপের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে ইউরোপে আবারও ‘ডি-রিস্কিং’ ও ‘ডিকাপলিং’ ধারণা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে এবার লক্ষ্য চীন নয়, বরং ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র। এখানে কেবল সাপ্লাই চেইন নয়; জবরদস্তির বিরুদ্ধে কৌশলগত সক্ষমতার প্রশ্নও জড়িত। ফরাসি সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত মার্কিন ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যার জুমের পরিবর্তে নিজস্ব ভিসিও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া তারই উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্র যখন তথাকথিত ডনরো ডকট্রিনের মাধ্যমে পশ্চিম গোলার্ধে নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছে, তখন একসময় মার্কিন এশিয়া নীতির কেন্দ্রে থাকা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য আরও উন্মুক্ত হয়ে উঠছে।
এই বাণিজ্য চুক্তিটি এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হলেও এটি একটি সাম্প্রতিক প্রবণতার অংশ, যেখানে বহু দেশ নতুন জোট গঠনের চেষ্টা করছে। সম্প্রতি বেলজিয়াম দক্ষিণ আমেরিকার মার্কোসুর ব্লকের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে এবং আরও কয়েকটি চুক্তি প্রক্রিয়াধীন। ভারতও গত কয়েক মাসে যুক্তরাজ্য ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করেছে। বহুপাক্ষিকতা, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, এমনকি ডি-ডলারাইজেশনের যে স্বপ্ন পশ্চিমের বাইরের অনেক দেশ দীর্ঘদিন ধরে দেখছে, তা এখন বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে; প্রথমে ধীরে, এখন দ্রুতগতিতে।
বিশ্ব যখন এগিয়ে চলছে তখন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে যেন আমেরিকা একা হয়ে যাচ্ছে।
রাবিন্দর কৌর: অধ্যাপক, এশিয়ান স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব কোপেনহেগেন; গার্ডিয়ান থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
