যৌন হয়রানি
জাহানারা আলম এবং নারী ক্রিকেটে সুরক্ষা ও জবাবদিহিতা
বদরুল হাসান
বদরুল হাসান
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলমের অভিযোগের সত্যতা অবশেষে খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিসিবি ইতোমধ্যে অভিযুক্ত কোচ মঞ্জুরুল ইসলামকে শাস্তিও দিয়েছে।
২০২২ সালে জাহানারা তৎকালীন জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের কোচ মঞ্জুরুল ইসলামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। সে অভিযোগ আমলে নেয়নি বিসিবি। গত ৭ নভেম্বর জাহানারা আলম একটি ইউটিউব চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মঞ্জুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগগুলো আবারও তোলেন। এ নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা শুরু হলে ৯ নভেম্বর বিসিবি ওই তদন্ত কমিটি গঠন করে। দীর্ঘ চার মাসেও কমিটি প্রতিবেদন না দিলে ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় শুটার সাবরিনা সুলতানা উচ্চ আদালতে বিসিবির বিরুদ্ধে একটি রিট করেন। আদালত বিসিবির ওই নীরবতাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না মর্মে রুল জারি করেন। মূলত ওই দিনই বিসিবিতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিসিবি মঞ্জুরুল ইসলামকে বিসিবির ক্রিকেট-সংশ্লিষ্ট সব কাজ থেকে নিষিদ্ধ করেছে।
বিষয়টা ততদিনে রসিকতায় পর্যবসিত হয়েছে। মঞ্জুরুল ২০২৫ সালের জুন থেকেই বিসিবির কোনো চুক্তির অধীনে নন। ফলে তাঁর শাস্তিটা হয়ে পড়েছে প্রতীকী। নারী ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি বাস্তবে দুর্বলই থেকে যাচ্ছে।
২০২২ থেকে ২০২৬, অভিযোগ উত্থাপন থেকে তদন্ত কমিটি গঠন–এ দীর্ঘ সময়ে বিসিবিতে ছিলেন তিনজন সভাপতি: নাজমুল হাসান পাপন, ফারুক আহমেদ এবং বর্তমানে আমিনুল ইসলাম বুলবুল। রাজনৈতিক অবস্থানে তাদের মধ্যে ভিন্নতা স্পষ্ট হলেও অভিযোগটি নিষ্পত্তির ব্যাপারে একই গড়িমসি দেখা গেছে। বুলবুল দায়সারা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বটে, তবে আদালতে রিট না হলে তা আলোর মুখ দেখত কিনা সন্দেহ।
নিছক একটা রুল হলেও আদালত একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছেন–নারী ক্রীড়াবিদদের সুরক্ষায় যে নিয়মকানুন আছে, সেগুলো কি বাস্তবে কার্যকর? কাগজে-কলমে নীতিমালা থাকাই যথেষ্ট? সেগুলো মাঠে ও ড্রেসিংরুমে কাজ করছে কিনা, সেটাই মুখ্য। এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে দেরি, অস্পষ্টতা বা তথাকথিত দাপ্তরিক পদক্ষেপ অনেক সময় সমস্যার সমাধান তো করেই না; বরং আস্থার সংকট বাড়িয়ে তোলে।
জাহানারা আলম বাংলাদেশের একজন উল্লেখযোগ্য নারী ক্রিকেটার। দীর্ঘদিন তিনি জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতো একজন অভিজ্ঞ ও পরিচিত খেলোয়াড় যখন অসহায় বোধ করেন, তবে নতুন বা কম পরিচিত কোনো খেলোয়াড়ের অবস্থান কতটা নিরাপদ–তা বোঝাই যায়।
বর্তমানে জাহানারা আলম খেলার বাইরে এবং অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। এটি কোনো স্বাভাবিক ক্রীড়া-বিরতি বলে মনে নাও হতে পারে। বরং দীর্ঘদিন একটি ব্যবস্থার ভেতরে থেকে যখন একজন খেলোয়াড় নিজেকে উপেক্ষিত ও অনিরাপদ মনে করেন, তখন দূরে সরে যাওয়াটাই অনেক সময় একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়।
সাবেক নারী দলের অধিনায়ক রুমানা আহমেদ জানিয়েছেন, জাহানারা যা বলেছেন, তা তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গেও মেলে। এমন ঘটনার প্রভাব মাঠের বাইরেও পড়ে। স্কুল বা স্থানীয় পর্যায়ের মেয়েরা প্রশ্ন করতে শুরু করে–এই পরিবেশে এগোনো কতটা নিরাপদ? সময়ের সঙ্গে এই অনিশ্চয়তা নারী ক্রিকেটকে দুর্বল করে–খেলোয়াড়দের দক্ষতার অভাবে নয়, বরং ব্যবস্থার ওপর আস্থার ঘাটতিতে।
ক্রীড়া হোক বা অন্য ক্ষেত্রে–ভয়ের কারণে নীরবতা সব জায়গাতেই একই রকম ক্ষতিকর। এই প্রসঙ্গে মনে রাখা জরুরি, হাইকোর্ট নিজেই ২০০৯ সালে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে যে নির্দেশনাগুলো দিয়েছিলেন, সেগুলো এখনও কার্যকর আইন হিসেবে বিবেচিত। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল–প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বাস্তবে যদি এই নির্দেশনাগুলো বিসিবিতে যথাযথভাবে মানা হতো, তাহলে আজ আদালতকে নতুন করে ব্যাখ্যা চাইতে হতো না।
জরুরি কাজ হলো আস্থা ফেরানো। বিসিবি যৌন হয়রানিবিষয়ক একটি অভিযোগ কমিটি গঠন করেছে। তবে অভিযোগ করলে তার কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার মিলবে এবং অভিযোগকারীর ক্যারিয়ারের কোনো ক্ষতি হবে না–এ নিশ্চয়তা বিসিবিকে দিতে হবে। একই সঙ্গে সামগ্রিক আচরণবিধিতে কী পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তার লঙ্ঘনের শাস্তি কী হবে তাও জানানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট যতটুকু এগিয়েছে–তা টেকসই হবে কিনা, এটি শুধু মাঠের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে এই বিশ্বাসের ওপরও যে প্রয়োজনের সময় প্রতিষ্ঠানগুলো খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়াবে।
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি এবং পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে পৃথক দুই অধ্যাদেশের খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। অধ্যাদেশ দুটিকে আইনে পরিণত করা এখন নতুন সরকারের দায়িত্ব। বর্তমান সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক মো. আমিনুল হক। একজন ক্রীড়াবিদের নেতৃত্বে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা জোরদারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দেশের সব খেলায় যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার অবস্থানকে আরও সুস্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য একীভূত নীতিমালা, স্বাধীন অভিযোগ ব্যবস্থা, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক তদন্ত প্রক্রিয়া, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তত্ত্বাবধানে একটি নিরাপদ ডিজিটাল অভিযোগ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা যেতে পারে। এমন কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হলে ব্যক্তিনির্ভর বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে পূর্বনির্ধারিত, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
জাহানারা আলমের অভিজ্ঞতা তাই শুধু একটি বিতর্ক নয়। এটি একটি সতর্ক সংকেত; যা উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাগুলোকেও ঝুঁকিতে ফেলা হবে।
খেলাধুলায় নারীর অংশগ্রহণ নারীর সাহসে ঘটে ঠিকই, কিন্তু তাদের টিকে থাকা নির্ভর করে বৈষম্য এবং নিপীড়ন, নির্যাতন ও যৌন হয়রানি থেকে তাদের সুরক্ষা কতটা মজবুত তার ওপর।
বদরুল হাসান: উন্নয়ন ও মানবিক নীতি বিশেষজ্ঞ
[email protected]
- বিষয় :
- হয়রানি
