আইনশৃঙ্খলা
ঐতিহ্য থেকে আধুনিকতার পথে বিজিবি
মো. তানজিলুর রহমান
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) আমাদের জাতীয় সত্তার এক জীবন্ত প্রতীক এবং সার্বভৌমত্ব, আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। টানা ২৩০ বছরের গৌরবোজ্জ্বল পথচলায় বিজিবি দেশের সীমান্ত রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি মাদক ও চোরাচালান দমন, মানব পাচার রোধ, দুর্যোগ মোকাবিলা, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ অর্পিত যে কোনো দায়িত্ব সর্বোচ্চ সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালন করে আসছে।
সময়ের পরিক্রমায় বিজিবি আজ প্রযুক্তিনির্ভর বর্ডার ম্যানেজমেন্ট বা সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন মানদণ্ড গড়ে তুলেছে। একদিকে আধুনিক অস্ত্রের সংযোজন ঘটেছে, আরেকদিকে বডি ক্যামেরা ও স্মার্ট সার্ভেইলেন্স সিস্টেম চালু করেছে। বসানো হয়েছে সমন্বিত কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম; এর মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম সরাসরি কেন্দ্রীয় নজরদারির আওতায় এসেছে; প্রয়োজনে মহাপরিচালক সরাসরি মাঠ পর্যায়ের কমান্ডারের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারছেন। ড্রোন–সেন্সর ও রাডার প্রযুক্তির ব্যবহার, সাইবার-সচেতনতা এবং যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ–এ সবকিছুর সমন্বয়ে বাহিনীর বহুমাত্রিক সক্ষমতা গড়ে উঠেছে। স্থানীয় জনসাধারণের সক্রিয় অংশীদারিত্বকে আধুনিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার একটি অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে কেবল বাহিনীর মানবিক ভাবমূর্তি নয়, বরং এর অপারেশনাল গ্রহণযোগ্যতাও সুদৃঢ় করছে। বাহিনীটি আজ গণমানুষের বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে।
এক অবিরাম বিবর্তনের উপাখ্যান
কোনো বৃক্ষের শক্তি যেমন তার শিকড়ের গভীরতায় নিহিত, তেমনি একটি বাহিনীর শক্তি তার ঐতিহ্যের গভীরতায় নির্ভর করে। বিজিবির শিকড় বাংলার ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত। ১৭০০ সালের শেষভাগে চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল ছিল অত্যন্ত অস্থিতিশীল একটি এলাকা। লুসাই পরিচয়ধারী অপরাধীরা নিয়মিত ঝটিকা আক্রমণের মাধ্যমে গ্রামবাসীকে হত্যা করত, তাদের মাথা কেটে নিত এবং ঘরবাড়ি লুট ও পুড়িয়ে দিত। এ পটভূমিতে ১৭৯৫ সালের ২৯ জুন এ অঞ্চলের তৎকালীন শাসক ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খাগড়াছড়ির রামগড়ে ‘রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন’ নামে একটি বাহিনী গঠন করে। মাত্র ৪৪৮ জন সৈনিক, ছয় পাউন্ডের চারটি কামান এবং দুটি অনিয়মিত অশ্বারোহী দলের মাধ্যমে আজকে যে বাহিনী বিজিবি বলে পরিচিত তার যাত্রা শুরু হয়। বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব ছিল সীমান্ত টহল, অনুপ্রবেশ ঠেকানো, ডাকাতি ও বিদ্রোহ দমন এবং প্রশাসনকে সহায়তা করা। এই বাহিনী সফলভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে।
১৭৯৯ সালে রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন ঢাকার বাইরে সবুজে ঘেরা পিলখানা এলাকায় তাদের প্রথম ক্যাম্প স্থাপন করে, যা ‘স্পেশাল রিজার্ভ কোম্পানি’ নামে পরিচিত ছিল। এই পিলখানা আজও বিজিবির সদরদপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি বাহিনীর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, কারণ এখান থেকেই গত দুই শতাব্দী ধরে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষার কাজে নেতৃত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ১৮৬১ সালে এটি ‘ফ্রন্টিয়ার গার্ডস’ নামে পুনর্গঠিত হয়, সৈন্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৫৪। ১৮৯১ সালে এর নাম ‘বেঙ্গল মিলিটারি পুলিশ’ রাখা হয়, যেখানে সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বও যুক্ত হয়। ১৯২০ সালে ‘ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস’ নাম দিয়ে এর আধুনিকায়ন হয়; যেখানে প্রশিক্ষণ, ইউনিফর্ম ও কমান্ড কাঠামোর উন্নতি সাধন করা হয়। ১৯৪৭ সালের পর এটি ‘ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস’ (ইপিআর) নামে পরিচিতি পায়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) এবং ১৭ বছর আগে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নাম দেওয়া হয় ছোট একটা টহল দল হিসেবে জন্ম নেওয়া আজকে বটবৃক্ষসম এ বাহিনীর।
মুক্তিযুদ্ধে অমর বীরত্ব: স্বাধীনতার প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শুরু করে তখন পিলখানায় ইপিআর সদরদপ্তর থেকে বিদ্রোহের প্রথম অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে। ইপিআরের বাঙালি সদস্যরা সর্বপ্রথম পাকিস্তানি অফিসারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং বাহিনীর নিজস্ব বেতারযন্ত্রে স্বাধীনতার ঘোষণা সারাদেশে পৌঁছে দেন; যা মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে যুগান্তকারী গতি আনে। তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও রণকৌশল প্রাথমিক পর্যায়ে অসংগঠিত মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটগুলোকে নেতৃত্ব ও প্রশিক্ষণ প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রণাঙ্গনে এই বাহিনীর প্রায় ১২ হাজার সদস্যের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং ৮১৭ জনের আত্মাহুতি স্বাধীনতার ভিত্তি দৃঢ় করে।
বিজিবির দুজন সূর্যসন্তান–শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ এবং শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ–তাদের তুলনাহীন আত্মত্যাগের জন্য বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত হন। এ ছাড়া আটজন ‘বীরউত্তম’, ৩২ জন ‘বীরবিক্রম’ এবং ৭৭ জন ‘বীরপ্রতীক’ খেতাবপ্রাপ্ত সদস্য এই বাহিনীর বীরত্বের মুকুটে একেকটি উজ্জ্বল পালক যোগ করেছেন।
পাহাড়ে রক্তে লেখা বীরত্বের মহাকাব্য
স্বাধীনতার পরও বিজিবির আত্মত্যাগের ইতিহাস শেষ হয়নি। ১৯৭২ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন এক রণাঙ্গন তৈরি হয়, যেখানে ‘শান্তি বাহিনী’ নামক সশস্ত্র গোষ্ঠীর রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা শুরু হয়। এর বিরুদ্ধে তৎকালীন বিডিআর সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৯৭২ সালের ১ জুন সিপাহি আব্দুল লতিফ শান্তি বাহিনীর গুলিতে প্রথম শহীদ হন। আজ পর্যন্ত ১১২ জন বিজিবি সদস্য দেশের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ১৯৮০ সালের ২২ এপ্রিল। বান্দরবানের মদক সীমান্ত ফাঁড়িতে (বিওপি) অতর্কিত হামলায় সুবেদার আজিজুর রহমানসহ ২০ জন বিজিবি সদস্য শহীদ হন। পালানোর সুযোগ থাকলেও সুবেদার আজিজুর রহমান ফাঁড়ি ছাড়েননি, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেও রক্ষা করেছিলেন দেশের মাটি। এই অসীম সাহসিকতার জন্য তিনি মরণোত্তর ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব লাভ করেন।
১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০ বছরের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে আজ পর্যন্ত বিজিবি বিভিন্ন অভিযানে সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৩২ জন সদস্যকে আটক করেছে এবং এসএমজি, রাইফেল, পিস্তলসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে।
আজকের বিজিবি শুধু সশস্ত্র প্রহরী নয়, পাহাড়ের মানুষের বন্ধুও বটে। দুর্গম অঞ্চলে বই বিতরণ, বিনামূল্যে চিকিৎসাশিবির আয়োজন আর স্থানীয় ভাষায় জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্র এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থার সেতু তৈরি করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৬টি ব্যাটালিয়নের অধীনে ১৫০টি বিওপি এবং অসংখ্য অস্থায়ী ক্যাম্প এখন শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতীক।
মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাফল্য
বিজিবি মিয়ানমার সীমান্তে বিশেষত জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক (এফডিএমএন) অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ, মাদক চোরাচালান দমন, মানব পাচার রোধ এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর আশ্রয় নেওয়া সদস্যদের সফলভাবে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অনুপস্থিতিতে এবং আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণের কারণে বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বিজিবি এসব এলাকায় শক্তিশালী নজরদারি ও তিন স্তরের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলেছে। বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে প্রায় ১৩ লাখ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক বাস করছে।
বিজিবি কক্সবাজারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক ক্যাম্পগুলোতে অবস্থানরত ব্যক্তিদের মধ্যে অপরাধ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও দমন ত্বরান্বিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে।
বিজিবির বহুমাত্রিক দায়িত্ব
আগেই বলা হয়েছে, বিজিবির দায়িত্ব শুধু সীমান্ত পাহারায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং বহুবিধ। বিশেষ করে ইয়াবা, আইস, ফেনসিডিল ও হেরোইনের মতো সর্বনাশা মাদকের বিরুদ্ধে বিজিবি সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়ছেন। মাদকের পাশাপাশি স্বর্ণ, অস্ত্র, বিস্ফোরক, জাল মুদ্রা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের রাত-দিন চোরাচালান রোধেও তারা সমান তৎপর।
বিজিবির কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দিক হলো, মানব পাচার প্রতিরোধ। এই বাহিনীর অভিযানে বহু নারী ও শিশু পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার হয়ে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন। শুধু অক্টোবর ২০২৫ মাসেই টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি) অভিযান পরিচালনা করে পাচারকারীদের হাত থেকে প্রায় ৮৬ জন নারী ও শিশুকে উদ্ধার করে।
বিজিবির এই সাফল্যের চিত্র পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। ২০২৪ সালে সারাদেশে ২ হাজার ১৮৪ কোটি ২৮ লাখ টাকারও বেশি মূল্যের চোরাচালান পণ্য জব্দ করা হয়, যার মধ্যে স্বর্ণ, অস্ত্র, মাদকদ্রব্য ও বিভিন্ন সামগ্রী রয়েছে। শুধু ডিসেম্বর ২০২৫ মাসেই বিজিবি ১৫৫ কোটি ৫৯ লাখ ১১ হাজার টাকা মূল্যমানের চোরাচালান পণ্য জব্দ করেছে। এই সময়ে মাদক ও চোরাচালানে জড়িত ১৭১ জন এবং অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমকারী ১৩৪ জন বাংলাদেশি ও ১৫ ভারতীয় নাগরিক এবং ২৭৬ জন মিয়ানমারের নাগরিককে আটক করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
এই ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিজিবি সদস্যরা দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। প্রায়ই তাদের সশস্ত্র অপরাধীদের মুখোমুখি হতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে সুনামগঞ্জে সশস্ত্র চোরাকারবারিদের ছররা গুলিতে একজন বিজিবি সদস্য গুরুতর আহত হন।
২০২৫ সালের ৯ আগস্ট সিলেট ব্যাটালিয়নের একজন সদস্য চোরাকারবারিকে ধাওয়া করতে গিয়ে পানিতে ডুবে শাহাদাত বরণ করেন।
সীমান্ত রক্ষায় নারী শক্তি: বিজিবির অগ্রযাত্রায় নতুন মাত্রা
২০১৬ সালে ৯৭ জন নারী সৈনিকের প্রথম ব্যাচ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বিজিবিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেই অভিযাত্রা আট বছরের ব্যবধানে আজ এক শক্তিশালী রূপ পেয়েছে। বর্তমানে বিজিবিতে প্রায় এক হাজার ১০০ জন নারী সদস্য কর্মরত, যারা দেশের সীমান্ত রক্ষায় পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে দায়িত্ব পালন করছেন। বাহিনীর এই নারী সদস্যরা শুধু দাপ্তরিক কাজেই সীমাবদ্ধ নন; তারা ফ্রন্টলাইনেও সমান পারদর্শী। সীমান্তে টহল, চেকপোস্ট পরিচালনা, অনুসন্ধান ও তল্লাশি, চোরাচালান দমন এবং এমনকি রাত্রিকালীন অপারেশনের মতো কঠোর সামরিক দায়িত্বেও তারা নিজেদের সক্ষমতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। পেশাগত প্রশিক্ষণেও বিজিবির নারী সদস্যরা পিছিয়ে নেই। সাম্প্রতিক ব্যাচগুলোতে নেতৃত্ব, শারীরিক সক্ষমতা ও সামরিক দক্ষতায় তাদের সাফল্য এই অগ্রযাত্রাকে আরও দৃঢ় করেছে। শারীরিক ও সামরিক কসরতে তারা পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঈর্ষণীয় ফল অর্জন করছে। এর এক উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন পাহাড়ি তরুণী নুখিংসাই মার্মা। তিনি বিজিবির ১০২তম রিক্রুট ব্যাচের মৌলিক প্রশিক্ষণে শ্রেষ্ঠ নারী সৈনিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তাঁর মতো এমন অদম্য নারী সদস্যরাই আজ নিষ্ঠার সঙ্গে সীমান্তে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিয়োজিত আছেন। কঠোর সামরিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি বিজিবির নারী সদস্যরা মানবিক সেবায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনপদে তারা সামাজিক সেতুবন্ধ তৈরি করছেন। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে বই বিতরণ, বিনামূল্যে চিকিৎসাশিবির পরিচালনা এবং মা ও শিশু সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণের মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছেন। তাদের এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও গণমুখী ও সুদৃঢ় করে তুলেছে।
ভবিষ্যতের পথে অগ্রযাত্রা
দুর্গম অঞ্চলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী গতিশীলতা: পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথ, কর্দমাক্ত রাস্তা বা সংকীর্ণ ভূখণ্ডে প্রচলিত যানবাহন ব্যবহার করে দ্রুত সাড়া দেওয়া সম্ভব হয় না। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজিবিতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অলটেরিন ভেহিকল (এটিভি) সংযোজন করা হয়েছে। পাশাপাশি সম্প্রতি বাহিনীতে শক্তিশালী বাইক সরবরাহ করা হয়েছে; যার ফলে এখন যে কোনো পরিস্থিতিতে, যে কোনো দুর্গম ভূখণ্ডে দ্রুততার সঙ্গে বিজিবি টহল পরিচালনা করতে সক্ষম, ফলে ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দুর্গম সীমান্তে এই যান অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সহজতর করেছে।
সদস্যদের সুরক্ষা ও মনোবল বৃদ্ধি: অনেক প্রত্যন্ত সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালনের সময় বিজিবি সদস্যদের ঝড়বৃষ্টি এবং বিশেষত বজ্রপাতের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে কোনো নিরাপদ আশ্রয় থাকে না। এই প্রাণঘাতী ঝুঁকি নিরসনে উন্মুক্ত ও আশ্রয়বিহীন সীমান্ত পোস্টগুলোতে ইতোমধ্যে কয়েক হাজার বিশেষ ‘শেল্টার পোস্ট’ নির্মাণ করা হয়েছে। এই শেল্টার পোস্টগুলোতে পর্যায়ক্রমে ‘থান্ডার অ্যারেস্টার’ বা বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা সংযুক্ত করা হচ্ছে, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় সদস্যদের জীবন রক্ষা এবং মনোবল সুদৃঢ় রেখে আস্থার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।
ভবিষ্যতের পথে অবিচল: এই বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যের শিরায় প্রবাহিত দেশপ্রেমই সীমান্তের প্রতিটি ইঞ্চিকে নিরাপদ রাখার প্রেরণা; যা তাদের কর্মদক্ষতা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার মাধ্যমে প্রতিদিন নতুন করে প্রমাণিত হচ্ছে। এর দীর্ঘ পথচলার এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করি সেই বীর পূর্বসূরিদের, যাদের রক্তের বিনিময়ে এই বাহিনীর ভিত্তি রচিত হয়েছে। আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই সেই সব পরিবারকে, যারা নীরবে ত্যাগ স্বীকার করে তাদের প্রিয়জনকে দেশমাতৃকার সেবায় উৎসর্গ করেছেন। আগামী দিনে সীমান্তে চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ, সাইবার ঝুঁকি ও আঞ্চলিক অস্থিরতা নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। তাই বিজিবি স্মার্ট সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এগোচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ, সাইবার ঝুঁকি, আঞ্চলিক অস্থিরতা, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, মানব পাচার এবং যে কোনো অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় বিজিবি পেশাদারিত্ব, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং জনসম্পৃক্ততার সমন্বয়ে দেশপ্রেমকে বাস্তব সক্ষমতায় রূপান্তর করবে–এটাই হোক আগামী দিনের সমৃদ্ধ বিজিবির প্রতিশ্রুত পথনকশা।
লে. কর্নেল মো. তানজিলুর রহমান: পদাতিক অধিনায়ক, হবিগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৫ বিজিবি)
- বিষয় :
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
