দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দ্বিতীয় গল্প
শশাঙ্ক সাদী
শশাঙ্ক সাদী
প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৮ | আপডেট: ১০ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে একটি হিসাবে গণ্য করা হয়। তাই দুর্যোগ প্রস্তুতি ও ঝুঁকি হ্রাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্বের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগার ও পাঠকক্ষ। গত তিন দশকে টেকসই রাজনৈতিক অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ দুর্যোগকালীন তাৎক্ষণিক ‘দাতব্য ত্রাণ’-এর ঐতিহ্য থেকে একটি পরিশীলিত ও সক্রিয় ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’র মডেলে রূপান্তরিত হয়েছে। আজ বাংলাদেশের সমন্বিত দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রমের ভিত্তি হলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, দুর্যোগ সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশাবলি এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি)। এগুলো বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল বিশ্বের সবচেয়ে সুগঠিত ও যুগোপযোগী দুর্যোগ প্রস্তুতি কাঠামোগুলোর অন্যতম হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশের সমন্বিত দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কৌশল ও নীতিকে স্থানীয় পর্যায়ে যুক্ত করা। মন্ত্রণালয়গুলোর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে হাজার হাজার প্রশিক্ষিত প্রান্তিক স্বেচ্ছাসেবকের সম্পৃক্ততা এবং জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির স্বেচ্ছা-কার্যক্রম তার বড় উদাহরণ।
এর ফল অসাধারণ। যেসব ঘূর্ণিঝড় একসময় বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটাত, এখন সেগুলোর ফলে হতাহতের সংখ্যা বহুলাংশে কমে শতকের ঘরে নেমে এসেছে। সাইক্লোনের আগেই পূর্বসতর্কতা ব্যবস্থার তথ্য এখন অধিকাংশ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে তাৎক্ষণিক পৌঁছে যায়। যদিও শিশু, নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগী পূর্বসতর্কতা ব্যবস্থা তথ্য, সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা ও তথ্য পৌঁছানো নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনেক অসমতা ও ফাঁক এখনও রয়েছে।
এই বছর অর্থাৎ ২০২৬ সাল বৈশ্বিক পানি-কূটনীতি এবং সেন্দাই দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ফ্রেমওয়ার্কের অগ্রগতি পরিমাপে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। এমন একটি সময়ে আমরা বলতে পারি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ‘বাংলাদেশ মডেল’ একটি বিশ্বমানের ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে বিশ্ব সম্প্রদায়কে এখন বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দ্বিতীয় গল্প তৈরিতে সাহায্য করতে হবে। কঠিন সত্য ও বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে সফল ও শক্তিশালী জাতীয় ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্নভাবে সফল হতে পারে না।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সীমাবদ্ধতা ও আঞ্চলিক সুযোগ
দুর্যোগের ঝুঁকি খুব কমই রাজনৈতিক সীমানা মেনে চলে, বিশেষ করে বন্যা ঝুঁকি। এটি গঙ্গা-পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার চেয়ে এত স্পষ্ট ও সহজভাবে আর কোথাও দেখানো যায় না। বাংলাদেশ এই অববাহিকার সম্মিলিত জলধারার একেবারে ভাটি প্রান্তে অবস্থিত এবং সেই কারণে এখানে সবচেয়ে নিয়মিত প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলো বন্যা। তাই আমাদের বন্যা-সংক্রান্ত প্রাথমিক দুর্যোগ সতর্কতা ব্যবস্থা যতই উন্নত হোক, তা বহুলাংশে উজানের আগাম তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে অববাহিকাজুড়ে পানিপ্রবাহ-সংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগির বেশির ভাগ প্রক্রিয়া অনানুষ্ঠানিক বা দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার মধ্যে আবদ্ধ। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের কথা। এ সময় আমাদের কাছে চুক্তির ধারা-উপধারায় পরিবর্তন আনার একটি বিরল সুযোগ রয়েছে। সুযোগটি স্পষ্ট: আমাদের অবশ্যই দ্বিপক্ষীয় ‘পানি ভাগাভাগি’র বাইরে গিয়ে অববাহিকার পানিপ্রবাহের প্রয়োগযোগ্য একটি ‘আঞ্চলিক তথ্য আদান-প্রদান প্রটোকল’-এর দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের প্রস্তাবনার লক্ষ্য শুধু ‘পানি বণ্টন’ না, বরং ‘যৌথ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ হওয়া উচিত। পানিপ্রবাহ ও আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্যকে আঞ্চলিক জনহিতকর হিসেবে নির্ধারণ করে আমরা বন্যার পূর্বাভাসকে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে পারি। ২০২৫ সালে জাতিসংঘের পানি কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী প্রথম দক্ষিণ এশীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে তার নেতৃত্বের ইঙ্গিত ইতোমধ্যে দিয়েছে। এই অর্জনগুলোকে একটি কার্যকর আঞ্চলিক প্রটোকলে রূপান্তর করলে সেটি হবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে সক্রিয় পথ। এতে নদীপ্রবাহের মতোই বাস্তব সময়ে পানির তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত হবে।
নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন
নদীর অববাহিকা আমাদের আঞ্চলিক ঝুঁকিকে সংজ্ঞায়িত করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলো একটি ভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে। তা হলো ‘অনানুষ্ঠানিকতার ব্যবধান’। ঢাকার মতো মেগাসিটিতে দুর্যোগের জ্ঞানের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ নয়। কারণ দুর্যোগ ঝুঁকি মানচিত্র, ভূমিকম্প সংক্রান্ত গবেষণার তথ্য ইত্যাদি আমাদের তৈরি আছে। চ্যালেঞ্জটি হলো মিউনিসিপ্যালিটি বা পৌর কর্তৃপক্ষের কার্যকর ‘পরিচালনা ক্ষমতায়ন’-এর অভাব। রেজিলিয়েন্স তৈরির স্বপ্নকে একটি বাস্তবতায় পরিণত করতে হলে দরকার ঝুঁকি-অবহিত উন্নয়নের বাস্তবায়ন। এ জন্য প্রয়োজন পৌর কর্তৃপক্ষগুলোর ক্ষমতায়ন, আর্থিক স্বায়ত্তশাসন এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা।
ইলেকট্রনিক নির্মাণ অনুমতি ব্যবস্থা (ইসিএসপি) বা ঢাকা ভবন বিধিমালার (২০২৫) মতো উদ্ভাবন পৌর কাজে স্বচ্ছতা আনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে বাংলাদেশের অনিয়ন্ত্রিত ভূমি-বাজারে ভবন নির্মাণের মান নিশ্চিত করা ও নগরকেন্দ্রিক দুর্যোগ ঝুঁকি কমিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই রাজনৈতিক প্রভাব এড়িয়ে এগুলোকে ক্রমাগতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের ভবিষ্যৎ কেবল মন্ত্রণালয়গুলোর সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল না। বরং বিল্ডিং কোড বা ভবন বিধিমালা ব্যবহার করে নগরের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকারগুলোর সক্ষমতা অর্জনের ওপরেই তা অনেকাংশে নির্ভরশীল।

ন্যায়সংগত অধিকারভিত্তিক দুর্যোগ ঝুঁকি ভাগাভাগি
বৈশ্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অর্থায়ন কাঠামো থেকে বাংলাদেশের জন্য দরকারি আরেকটি শিক্ষা পাওয়া যায়। নিজস্ব সম্পদকে জাতীয় রেজিলিয়েন্স তৈরিতে ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করে অবিশ্বাস্য এক উদাহরণ দেখিয়েছে। তবুও পদ্ধতিগতভাবে বৈশ্বিক ঝুঁকি প্রকৃতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়– কোনো দেশেরই একা দুর্যোগের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসকেন্দ্রিক সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি হওয়ার পর ১০ বছর অতিক্রান্ত; আজকের দিনেও বৈশ্বিক দুর্যোগ অর্থায়ন মূলত একটি ‘দাতব্য ত্রাণ’ মডেলকে প্রতিফলিত করে। আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীকে ‘দাতব্য ত্রাণ’ সহায়তা মডেল থেকে ‘কাঠামোগত বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলা’ মডেলের দিকে সরিয়ে নিতে একটি ‘বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়াশীল’ পরিবর্তন আনা জরুরি। এর মানে, যেসব দেশ ইতোমধ্যে গুরুতর অভ্যন্তরীণ সংস্কার করেছে, যেমন– বাংলাদেশ, তাদের জন্য আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর অনুমানযোগ্য আর্থিক এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা পরিকল্পনাকে দাতব্য ভাবনার পরিবর্তে ‘পারস্পরিক বাধ্যবাধকতা’ হিসেবে বিবেচনা করা।
রেজিলিয়েন্স বা সহনশীলতার পরিকাঠামো
বাংলাদেশের যাত্রা প্রমাণ করে– রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি থাকলে পাহাড়কেও ঠেলে নেওয়া যায়। কিন্তু এটি এও প্রকাশ করে, আমরা আদতে একটি বৈশ্বিক বিন্যাসেরই অংশ। একটি ভাটি ব-দ্বীপের রেজিলিয়েন্স নির্ভর করে উজানের সহযোগিতার ওপর। যেমন একটি শহরের নিরাপত্তা নির্ভর করে ক্ষমতায়িত স্থানীয় সরকারের ওপর; আর দুর্যোগ মোকাবিলায় জাতীয় সংস্কারের স্থায়িত্ব নির্ভর করে বৈশ্বিক ব্যবস্থার নিরবচ্ছিন্ন সহায়তার ওপর।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পরবর্তী ধাপে পৌঁছানোর জন্য আমাদের সামনে দুটো পথ খোলা। প্রথমটি হলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জাতীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আন্তঃসংযুক্ত বৈশ্বিক কাঠামোর মধ্যকার যে ব্যবধান তা পূরণ করা। দ্বিতীয়ত, বাধ্যবাধকতাবিহীন বৈশ্বিক নির্দেশিকাগুলোকে (যেমন সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক) আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং সমঅংশীদারিত্বের প্রকৃত কাঠামোতে রূপান্তর করার জন্য দুর্যোগ মোকাবিলার সর্বোচ্চ ফোরামে নেতৃত্ব দেওয়া।
ভিত্তি স্থাপন হয়ে গেছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো এটি নিশ্চিত করা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং ন্যায়সংগত বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব দুর্যোগ মোকাবিলায় জাতীয় রেজিলিয়েন্স তৈরির কাঠামো সম্পূর্ণ করতে সহায়তা করছে। তাহলেই বাংলার ব-দ্বীপে দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অর্জনগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে অনিশ্চিত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার চ্যালেঞ্জের সঙ্গে টিকে থাকতে বাংলাদেশের জনগণকে আরও বেশি সক্ষম করবে।
শশাঙ্ক সাদী: লেখক ও উন্নয়ন বিশ্লেষক
- বিষয় :
- দুর্যোগ
