ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ধোঁয়াবিহীন মরণফাঁদ তামাক

ধোঁয়াবিহীন মরণফাঁদ তামাক
×

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে তামাকের আসক্তি

সীমা দাস সীমু

প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ | ১৫:৩০

বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি তামাক। তবে আমরা যখন তামাকের ক্ষতির কথা বলি, তখন আমাদের আলোচনা কেবল ধূমপানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। ২০১৭ সালের ‘গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে’-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ধুমপায়ীদের হারের চেয়েও বেশি। জর্দা, গুল ও সাদাপাতার মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকগুলো এখন সমাজের প্রতিটি স্তরে ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশেষত শ্রমজীবীরা মুখে পান দিয়ে সারাদিন না খেয়ে কাটিয়ে দেন। তারা এই দ্রব্য কেনেন এবং ক্ষুধার যন্ত্রণা ভুলে যান। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ধোঁয়াবিহীন জর্দা, গুল, সাদা পাতার মতো তামাকগুলো কেবল নিকোটিন নয়, বরং এটি একটি রাসায়নিক ককটেল। ২০১৯ সালের বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের বাজারে বহুল প্রচলিত ২২টি ব্র্যান্ডের জর্দা, গুল ও খয়েরে মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকর ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। যেমন–  লেড, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, পিরিওডোন্টাইটিস। এগুলো মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি, হাড়, ফুসফুস, লিভার, দাঁতসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় মুখের ক্যান্সারের প্রধান কারণ এই ধোঁয়াবিহীন তামাক। জর্দা ও গুলের সরাসরি স্পর্শ মুখের ভেতরের কোষগুলোকে মিউটেশনে বাধ্য করে, যা ধীরে ধীরে ক্যান্সারে রূপ নেয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই আসক্তি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যেখানে কিশোরদের মধ্যে ধূমপানের হার ২.৯ শতাংশ, সেখানে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের হার ৪.৫ শতাংশ। এর বড় কারণ হলো সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। অনেক পরিবারে মুরুব্বিদের জর্দা কিনে দেওয়া বা গুল ব্যবহার করাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না। বিশেষ করে গ্রাম এবং গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। ফলে কিশোররা অজান্তেই এক মরণঘাতী আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে।
বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন (সংশোধিত ২০১৩)-এর ১০ (১) ধারা অনুযায়ী প্যাকেটের ৫০ শতাংশ স্থানে সচিত্র সতর্কবাণী থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু জর্দা ও গুলের ছোট মোড়ককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে তামাক কোম্পানিগুলো। বড় সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার ফলে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে তামাক পণ্য ব্যবহার কমাতে সাহায্য করেছে।

এছাড়া তামাক কোম্পানিগুলো নানা রকম কৌশল অবলম্বন করে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনীতে বাধার সৃষ্টি করে। তারা বলে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব কমে যাবে। কিন্তু জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তামাক থেকে সরকারের আয় ছিল ৪০ হাজার কোটি টাকা; কিন্তু স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার কোটি টাকা, যা আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট ক্যান্সার ও দীর্ঘমেয়াদী রোগের চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বর্তমানে নিকোটিন পাউচ তামাকেরই এক নতুন মুখ। বিভিন্ন সুগন্ধি ও রাসায়নিকের সংমিশ্রণে এটি তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থাসহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সতর্ক করেছে যে, নিকোটিন পাউচও প্রচলিত ধোঁয়াবিহীন তামাকের মতোই গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। 

ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)-তে প্রথম সাক্ষরকারী দেশ বাংলাদেশ। এফসিটিসি এর আর্টিকেল ৫.৩ অনুসারে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ, যাতে জনস্বাস্থ্য নীতিতে তামাক শিল্পের হস্তক্ষেপ রোধ করা যায়। কিন্তু আমরা প্রতিবার দেখি যে, যখন জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী প্রয়োজন হয় তখন তামাক কোম্পানিগুলো নানাভাবে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে যা এফসিটিসি আর্টিকেল ৫.৩ -এর লঙ্ঘণ। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। তামাকজাত দ্রব্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের কিছু পদক্ষেপ জরুরি। যেমন– সকল প্রকার উন্মুক্ত স্থান এবং গণপরিবহনে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান বিলুপ্ত করা, তামাক কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা, বিক্রয় কেন্দ্রে তামাক দ্রব্যের প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করা, ই-সিগারেট বা ইমার্জিং হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্ট আমদানি, উৎপাদন, ব্যবহার ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা। তামাক পণ্যের সকল প্রকার খুচরা শলাকা বিক্রয় বন্ধ করা, বিড়ি ও সিগারেটের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার ৫০% থেকে বাড়িয়ে ৯০% করা।

বর্তমানে বাংলাদেশে ১ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন তামাকজানিত কারণে। প্রায় ১৫ লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত (টোব্যাকো এটলাস, ২০২২)। এই বিশাল সংখ্যার জনগোষ্ঠীকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরাতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

সীমা দাস সীমু: সীমা দাস সীমু: পরিচালক, উবিনীগ
 

আরও পড়ুন

×