অধ্যাদেশ বাতিল
কী পেল গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার?
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৪ | আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
গুম হওয়া মাজহারুল ইসলামের বাবা মো. আমিনুল হকের আকুতিতে উত্ত্যক্ত হয়ে এক পর্যায়ে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিলেন সে সময়ের ঊর্ধ্বতন এক সেনা কর্মকর্তা। গুমের মামলায় এখন তাঁর বিচার চলছে আদালতে। বৃদ্ধের থুতনিতে লেগেছিল সেই সেনা কর্মকর্তার হাঁটু। তবে আমিনুল হক মেনে নিয়েছিলেন– গুম হওয়া সন্তানের সন্ধান চাইতে গেলে এমন অপমান সহ্য করতে হয়। আমিনুল হকের সঙ্গে কথা হয় ১৯ এপ্রিল, মোবাইল ফোনে। ২০১৪ সালের এই ঘটনার পর তিনি নতুন করে বিস্মিত হয়েছেন নির্বাচিত সরকারের সময়ে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায়। আমিনুল হক বলেন, ‘এই সরকারের ক্ষমতা প্রয়োজন ছিল, ক্ষমতা পেয়েছে। নিখোঁজ মানুষদের নিয়ে তাদের কিছু আসে যায় বলে মনে হয় না। না হলে এই অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার কথা না।’
অধ্যাদেশ বাতিল প্রসঙ্গে ঘুরেফিরে আসছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের ঘটনার সঙ্গে র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের নাম। আছে কমিশনকে আমলাতন্ত্রের অধীন করার চেষ্টার অভিযোগ।
দেশে গত কয়েক দশকে ‘গুম’ বা বলপূর্বক অন্তর্ধান বিষয়টি গভীর মানবাধিকার সংকটে পরিণত হয়েছে। এর ওপর আরও প্রহসন হলো কমিশন গঠন, অধ্যাদেশ জারি এবং তা বাতিল বা আপাতত স্থগিত হওয়ার ঘটনায়।
অন্তর্বর্তী সরকার গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে ‘গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল। তবে তা আপাতত কার্যকারিতা হারানোয় সামনে এসেছে একটি প্রশ্ন। আয়নাঘর থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের পরিবার এতদিন পরে হলেও তাদের পেয়েছে। কিন্তু যারা গুম হয়েছেন এবং তাদের বিষয়ে আর কিছুই জানা গেল না, সেই মানুষদের পরিবার কী পেল?
পরিবারগুলো বলছে, অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ায় গুমের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা হারাচ্ছে। এতে একক কোনো গুমের ঘটনাকে সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে বিচারের আইনি ভিত্তি দুর্বল হবে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়া অনিশ্চিত হবে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কেউ পাঁচ বছর নিখোঁজ থাকলে তাঁকে ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গুম’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারত এবং তাঁর পরিবার সম্পত্তি ও অন্যান্য আইনগত বিষয়ে সুরক্ষা পেত। এটি বাতিল হওয়ায় পরিবারগুলো পুনরায় দীর্ঘ আইনি জটিলতায় পড়বে এবং তদন্ত আবারও স্বাধীনতা হারিয়ে সরকারের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিলের পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্যরা পদত্যাগ করে যৌথ খোলা চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে দাবি করা হয়েছিল– এমন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের পেছনে একটাই নীতি: মানবাধিকার কমিশনের আইনগত স্বাধীনতা খর্ব করা। এ ছাড়াও তিন পৃষ্ঠার সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা মানবাধিকার কমিশনের ছিল না। অধ্যাদেশে সেই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল বা স্থগিতের সুপারিশের প্রেক্ষিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) হতাশা প্রকাশ করে জানিয়েছিল, এটি ‘আত্মঘাতী’ সিদ্ধান্ত।

গুম কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুম হওয়া ২৫১ জন এখনও নিখোঁজ। সেই তালিকারই একজন মো. আমিনুল হকের সন্তান মাজহারুল ইসলাম। এ তালিকার আরেকজন হলেন কুমিল্লার লাকসামের হুমায়ুন কবীর পারভেজ। তিনি গুম হন ২০১৩ সালে। তাঁর স্ত্রী বাংলাদেশ নাগরিক অধিকার ফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহনাজ আক্তারের সঙ্গেও কথা হয় ২০ এপ্রিল মোবাইল ফোনে।
শাহনাজ আক্তার বলেন, তাঁর স্বামী গুম হওয়ার পর মামলা হয়েছে ২০১৪ সালে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) গুমের শিকার পরিবারগুলোর সদস্যের নিয়ে গঠিত সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ শতাধিক মানুষকে গুমের ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করে। তাঁর স্বামীর গুম হওয়া বিষয়ে পৃথকভাবে অভিযোগ জানানো হয়।
তবে চলতি বছর মার্চের শেষে তারা আইসিটিতে গিয়ে দেখেছেন, শতাধিক ব্যক্তি গুম হওয়ার অভিযোগের ফাইল একইভাবে পড়ে আছে। তিনি বলেন, (আইসিটি) জোরপূর্বক গুমের মামলাগুলোতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘বাছাই করে’ বা পক্ষপাতমূলক তদন্ত করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আয়নাঘর থেকে যাদের উদ্ধার করা হয়েছে, তাদের মামলা নিয়েই তারা ব্যস্ত থেকেছে। কিন্তু এক যুগ ধরে যাদের কোনো হদিসই নেই, তাদের ব্যাপারে মাথাব্যথা ছিল না। তবে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ আপাতত আইনে পরিণত না হওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো মতামত দেননি; শুধু ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে গুম সংক্রান্ত আইনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংসদে বলেছেন, গুম সংক্রান্ত আইনের সঙ্গে যেন মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ও মানবাধিকার কমিশন আইনের কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি না হয়, সে জন্য আইনটি যাচাই-বাছাই করা হবে। অন্যদিকে গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি নিয়েও ভিন্নমত রয়েছে। কেউ বলছেন, সবার সঙ্গে আলোচনা করে করা হয়নি। আবার কেউ বলছেন, মানবাধিকার কমিশন এবং গুম অধ্যাদেশ প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ছয় শতাধিক দেশি-বিদেশি অংশীজনের মত নেওয়া হয়েছে, যা উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
গত ৪ জানুয়ারি কমিশনের জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গুম হওয়া রাজনৈতিক নেতাকর্মীর ৭৫ শতাংশই জামায়াত-শিবিরের। তবে গুমের পর যারা এখনও নিখোঁজ, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গুমের ঘটনাগুলোয় র্যাব, পুলিশ, ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা আছে। বছরভিত্তিক ও বাহিনীভিত্তিক অভিযোগ বিশ্লেষণ করে কমিশন জানিয়েছিল মোট অভিযোগের প্রায় এক-চতুর্থাংশে র্যাবের সংশ্লিষ্টতার কথা। কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস তখন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, গুমের সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার। গুমের এ ঘটনাগুলো ধরা হয়েছে জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে।
গুম হওয়া আরও একটি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কথা বললেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। বললেন, ২০১৩ সালে তাদের পরিবারের সদস্য গুম হয়েছেন রাজধানীর পুরান ঢাকা থেকে। তিনি ছিলেন বিএনপির কর্মী। গুম হওয়া ব্যক্তির ছোট ভাই জানালেন, তারা আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের মা সন্তানের কোনো খবর না পেয়েই মারা গেছেন। এখন এসব বিষয়ে আলোচনা বেশি হলে বরং বাড়ির অন্য সদস্যরা বিব্রত হন।
গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ বর্তমান নির্বাচিত সরকার আইনে পরিণত করলে তারা আশা করতে পারতেন, স্বজনের গুম হওয়ার ঘটনার একদিন সুরাহা হবে। যেমন শেরপুরের মাজহারুল ইসলামের বাবা আশা করছেন, তাঁর সন্তান এখনও বেঁচে আছে। তিনি শুনেছেন, ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুম করা কয়েকজনকে ভারতে কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমিনুল হক বললেন, আইন হলে সন্তান বেঁচে থাকলে ফিরে পাওয়ার সুযোগ হতো। বেঁচে না থাকলে অন্তত মামলার একটি ফলাফল আসত। অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় আবার শুরু হলো সেই অনিশ্চয়তা। আক্ষেপ করে বললেন, তাঁর নিজের বয়স হয়েছে। এক যুগের বেশি সময় ধরে ছেলের জন্য দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন। তিনি মারা গেলে এ মামলারও আর কোনো হদিস থাকবে না। এক সরকারের আমলে গুম হয়েছে। এরপর কমিশন হয়েছে, অধ্যাদেশ হয়েছে, আবার তা বাতিলও হয়েছে। কিন্তু কী পেলেন গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজন?
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম:
সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- অধ্যাদেশ বাতিল
