জাতীয় সংসদ
নারীরা কেবল সংরক্ষিত আসনেই সীমিত থাকবে?
খুশী কবির
খুশী কবির
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৭ | আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ৩০০টি সাধারণ আসনের বিপরীতে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রয়েছে ৫০টি। এই বাস্তবতা দেশের জনসংখ্যাগত গঠনের সঙ্গে স্পষ্ট অসামঞ্জস্যপূর্ণ। যখন মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী, তখন তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এত সীমিত থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটি শুধু সংখ্যার বৈষম্য নয়; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীর কণ্ঠস্বর প্রান্তিক করে রাখার একটি কাঠামোগত সমস্যা।
ইতোমধ্যে বিএনপি সংরক্ষিত আসনের ৩৬ জনের নাম ঘোষণা করেছে। জামায়াত, এনসিপি জোট ও অন্যান্য দলও বাকি আসনগুলোতে নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে। সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর একটি প্রাথমিক উদ্যোগ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান সংখ্যা ও পদ্ধতি যথেষ্ট নয়। এই সীমিত উপস্থিতির কারণে নারীরা জাতীয় নীতিনির্ধারণে যথাযথ প্রভাব রাখতে পারেন না। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা সহিংসতা প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নারীর দৃষ্টিভঙ্গি পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত হয় না।
এ অবস্থার পরিবর্তনে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কাঠামোগত সংস্কার। সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নারীকে সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। সমান প্রতিনিধিত্ব কেবল ন্যায্যতার প্রশ্ন নয়; এটি একটি কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র গঠনের অপরিহার্য শর্ত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারীর অংশগ্রহণ এখনও আশানুরূপ নয়, এর একটি স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় সাম্প্রতিক নির্বাচনী চিত্রে। মাত্র সাতজন নারী সরাসরি নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, যা মোট আসনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। আরও উদ্বেগজনক হলো, বড় রাজনৈতিক দলগুলোও নারীদের পর্যাপ্ত মনোনয়ন দিতে আগ্রহী নয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরাসরি নির্বাচনে মাত্র ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে, আর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি, যা তাদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এই পরিসংখ্যান কেবল নির্বাচনী দুর্বলতা নয়; বরং এটি নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতি দলগুলোর সীমিত প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। যখন দলগুলো নিজেরাই নারীদের নেতৃত্বে আনার ক্ষেত্রে অনাগ্রহী, তখন জাতীয় পর্যায়ে সমান প্রতিনিধিত্বের আশা করা কঠিন। নারীদের শুধু সংরক্ষিত আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তাদের রাজনৈতিক বিকাশ ও নেতৃত্বের সুযোগ সংকুচিত হয়।
বর্তমানে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা মূলত রাজনৈতিক দলের মনোনয়নের মাধ্যমে সংসদে আসেন। ফলে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও কার্যক্রম অনেকাংশে দলের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় তারা স্থানীয় জনগণের সমস্যা, চাহিদা বা প্রত্যাশার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকার সুযোগ কম পান। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার প্রতিনিধি না হওয়ায়, তারা সেই এলাকার উন্নয়ন, অবকাঠামো বা সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধানে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধ থাকেন।
এখানেই সরাসরি নির্বাচনের গুরুত্ব সামনে আসে। যদি নারী প্রার্থীরা সাধারণ আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তাহলে তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসবেন। এতে একদিকে যেমন তাদের রাজনৈতিক বৈধতা বাড়বে, অন্যদিকে জনগণের কাছে জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে। ভোটাররা তাদের কাজের মূল্যায়ন করতে পারবেন এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তী নির্বাচনে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এই প্রক্রিয়া নারী নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করে তুলবে।
সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথও সহজ নয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা বাধা এখনও নারীর সামনে রয়েছে। রাজনৈতিক অর্থায়ন, নিরাপত্তা, দলীয় মনোনয়ন–সব ক্ষেত্রেই নারীরা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। তাই কেবল সংরক্ষিত আসন বাতিল বা পরিবর্তন করলেই সমাধান হবে না; বরং একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যেখানে নারীরা সমান সুযোগ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
এই প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত পদ্ধতি বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে, তবে একই সঙ্গে ধীরে ধীরে সরাসরি নির্বাচনের দিকে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে সাধারণ আসনে নির্দিষ্ট সংখ্যক নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে উৎসাহিত বা আইনগতভাবে বাধ্য করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, নারীর রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও বেসরকারি উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

নারীর অভিজ্ঞতা, বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষের অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন। পরিবার, কর্মক্ষেত্র, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক মর্যাদার মতো বিষয়গুলোতে নারীরা যে ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন, তা প্রত্যক্ষভাবে না বুঝলে নীতি নির্ধারণে সেই সংবেদনশীলতা প্রতিফলিত হওয়া কঠিন। এই কারণেই জাতীয় সংসদে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী প্রতিনিধিত্ব থাকা জরুরি– এটি কেবল সমতার প্রশ্ন নয়, বরং কার্যকর ও মানবিক নীতি নির্ধারণের পূর্বশর্ত।
সংসদে নারীর উপস্থিতি বাড়লে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, মাতৃস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান বৈষম্য কিংবা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পায়। নারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এসব ইস্যু উত্থাপন করতে পারেন, যা আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণকে আরও বাস্তবসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে। ফলে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয়।
কেবল সংখ্যাগত উপস্থিতি যথেষ্ট নয়; সংসদের পরিবেশও হতে হবে সম্মানজনক ও পেশাদার। প্রায়ই দেখা যায়, স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সংসদে অসংযত ভাষা বা আচরণ পরিলক্ষিত হয়, যা শুধু বিতর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ কারণে সংসদ সদস্যদের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর আচরণবিধি প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি।
এই আচরণবিধিতে পারস্পরিক সম্মান, লিঙ্গসংবেদনশীল ভাষার ব্যবহার, ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে বিরত থাকা এবং গঠনমূলক আলোচনার ওপর জোর দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে এর বাস্তবায়নে কঠোরতা থাকতে হবে, যাতে কোনো ধরনের অবমাননাকর আচরণ সহ্য না করা হয়। একটি দায়িত্বশীল ও সম্মানজনক সংসদই পারে জনগণের আস্থা অর্জন করতে এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে।
সব শেষে, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল একটি নীতিগত অঙ্গীকার নয়; এটি একটি কার্যকর গণতন্ত্র গঠনের পূর্বশর্ত। সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা একটি সূচনা হতে পারে, কিন্তু টেকসই সমাধান হলো নারীদের সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্বে নিয়ে আসা। এতে করে সংসদ হবে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের প্রকৃত প্রতিফলন।
খুশী কবির: মানবাধিকারকর্মী;
সমন্বয়ক, নিজেরা করি
- বিষয় :
- খুশী কবির
