মহান মে দিবস
শ্রমিক সুরক্ষার শাশ্বত সওয়াল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ০৭:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বঞ্চনা হইতে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা লইয়া বিশ্বের শ্রমিকেরা প্রতি বৎসর আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস তথা মে দিবস পালন করিয়া থাকে। আজ সকল শ্রমজীবী মানুষের জন্য মর্যাদাকর জীবন নিশ্চিতকরণের সংগ্রামের কথা পুনরায় স্মরণ করাইয়া দিবার দিবস।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সহিত শ্রম খাতের ধরন বদলাইতেছে। ইহার সহিত নূতন নূতন পরিস্থিতির মুখোমুখি হইতেছে শ্রমিক। কাজের নিরাপত্তার অভাব ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হইবার সংখ্যা বাড়িয়াছে। উন্নয়নের চাকা সচল রাখিতে শ্রমিকেরা দিবস-রজনী পরিশ্রম করিলেও অনেক ক্ষেত্রে তাহারা আজও শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হইতেছে। বিশেষ করিয়া অসংগঠিত খাতের শ্রমিক, নারী শ্রমিক এবং অস্থায়ী কর্মীরা এখনও ন্যায্য মজুরি হইতে বঞ্চিত। এই কথা বলিবার অপেক্ষা থাকে না, অর্থনীতির আলোচনায় বিনিয়োগের পরিবেশ যতখানি গুরুত্ব পাইয়া থাকে, কর্মপরিবেশ তাহা পায় না। অথচ টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষের যথাযথ কর্মপরিবেশ অর্থাৎ ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মস্থল, সংগঠিত হইবার অধিকারসহ সব ধরনের আইনি স্বীকৃতি ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ অত্যাবশ্যক।
দেশের শ্রম খাতের এই সকল বিষয় পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈয়ার হইয়া থাকে মহান মে দিবসকে উপলক্ষ করিয়া। মে দিবসের মূল শিক্ষা– মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব নহে, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ন্যায্য অধিকারের ভিত্তিতে একটা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন। ১৮৮৬ সালের এই দিবসে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে দিবসে আট ঘণ্টা কার্যকাল নির্দিষ্টকরণের দাবিতে শিল্প শ্রমিকদের আন্দোলন তুঙ্গে উঠিয়াছিল। উক্ত মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন কয়েকজন শ্রমিক। শ্রমিকদের সেই ত্যাগের বিনিময়ে এক পর্যায়ে নির্দিষ্ট হয়– কোনো শ্রমিককে দিনে আট ঘণ্টার অতিরিক্ত শ্রমদানে বাধ্য করা যাইবে না, যাহা বর্তমানে জাতিসংঘের বদৌলতে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। উহারই প্রতিফলনরূপে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৮০টির অধিক দেশে ১ মে সরকারি ছুটি নিয়মে পরিণত।
মে দিবস বিশ্বের শ্রমিকদের সংহতি যদ্রূপ বৃদ্ধি করিয়াছে, তদ্রূপ তাহাদিগকে অধিকার সচেতনও করিয়াছে। প্রেরণা জোগাইয়া চলিয়াছে শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাইতে। মে দিবস বাংলাদেশসহ বিশ্বের উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়া স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশসমূহের জন্য বিপুল প্রেরণার উৎসরূপে কাজ করিয়াছে। তাহারই প্রতিফলনস্বরূপ এই সকল দেশে ছুটিসহকারে জাতীয়ভাবে দিবসটি পালিত হয়। উন্নত দেশসমূহ এই দিবসে পৃথক ছুটির ব্যবস্থা না করিলেও উহার প্রভাব উপেক্ষা করিতে পারে নাই। তাই ভিন্ন প্রকারে সেই সকল দেশেও দিবসটি পালিত হয়।
আন্তর্জাতিকভাবে আজিকে শ্রমমান লইয়া যেই আলোচনা হয়; জাতীয় ন্যূনতম মজুরিসহ শ্রমিকের বহু অধিকার যে ইউরোপ-আমেরিকাসহ বহু দেশে কার্যকর হইয়াছে, উহারও পশ্চাতে রহিয়াছে মে দিবসের চেতনা। তবে ইহা সত্য, বাংলাদেশে ঘটা করিয়া দিবসটি পালিত হইলেও মজুরি ও কর্মপরিবেশ প্রশ্নে কমতি সীমাহীন। প্রাতিষ্ঠানিক খাতসমূহে শ্রমিকদের জন্য এক প্রকার আইনি আশ্রয় থাকিলেও বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে উহার লেশমাত্র নাই। এই প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের দেওয়া কয়েকটি সুপারিশ আবারও তুলিয়া ধরা সমীচীন বোধ করি। কমিশন বলিয়াছিল, বিভিন্ন খাতের শ্রমিকের মজুরি তিন বৎসর অন্তর মূল্যায়ন ও পুনর্নির্ধারণ, মূল্যস্ফীতির ভিত্তিতে বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের জন্য আপৎকালীন তহবিল, ট্রেড ইউনিয়ন করিবার শর্ত শিথিল, স্থায়ী কাজের জন্য আউটসোর্সিং নিয়োগ বন্ধ, নারী শ্রমিকের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস এবং স্থায়ী শ্রম কমিশন প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।
এই বৎসর শ্রমিক দিবস এমন সময়ে উপস্থিত, যখন দেশে গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত নূতন সরকার কিছুদিন পূর্বেই দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছে। সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসাবে শ্রম খাতের সংস্কারেও উদ্যোগী হইবে বলিয়া আমাদের প্রত্যয়। আমরা সমকালের পক্ষ হইতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল শ্রমজীবী মানুষকে মে দিবসের অভিনন্দন জানাই।
