পশ্চিমবঙ্গ
মমতার হার: জনরায় নাকি অন্য খেলা?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
বদরুল হাসান
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ১৭:০০
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনকে কেবল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তৃণমূলের সাধারণ পরাজয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। অন্যদিকে, বিজেপির এই ভূমিধ্বস জয়ও কিন্তু কেবল প্রচার-প্রোপাগান্ডার জোরে আসেনি। তারা ভোটার তালিকা সংশোধন, ধর্মীয় মেরুকরণ, কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার, বিরোধী দলের দুর্বলতা এবং ‘ডাবল-ইঞ্জিন’ সরকারের প্রতিশ্রুতি—সব মিলিয়ে এমন এক ছক তৈরি করেছিল, যা ভোটের আগেই পুরো খেলার মাঠ বদলে দেয়।
নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে বিজেপি ঐতিহাসিক জয় পায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফলাফল মানতে চাননি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন, যদিও এর পক্ষে তিনি সরাসরি কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি।
তাই এই জয়কে কেবল জনগণের সমর্থন বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রমাণ ছাড়া একে স্রেফ চক্রান্ত বলাও ভুল হবে। তবে এই নির্বাচন দেখাল, আধুনিক ভারতে নিয়ম মেনে ভোট হলেও কীভাবে ভেতর থেকে পুরো আয়োজনটিকে একতরফা করে ফেলা যায়। ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন, দলগুলো প্রচার করেছে এবং ফলাফলও প্রকাশ হয়েছে—কিন্তু প্রশ্ন রয়েই যায়: লড়াইয়ের মাঠটা কি সবার জন্য সমান ছিল?
নির্বাচন তো নয় যেন জাতীয় যুদ্ধক্ষেত্রে!
বিজেপি বাংলাকে সাধারণ রাজ্য নির্বাচন হিসেবে নেয়নি। এটি ছিল দলটির কাছে পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় অ-বিজেপি দুর্গ দখলের রাজনৈতিক অভিযান। একই সময়ে আসাম, তামিলনাড়ু, কেরালা ও পণ্ডিচেরিতে নির্বাচন হলেও পশ্চিমবঙ্গ পেয়েছিল বিশেষ মনোযোগ। কারণ বাংলার প্রতীকী গুরুত্ব ছিল বড়: এটি ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্ত ঘাঁটি, বিজেপির দীর্ঘদিনের অপ্রাপ্ত রাজ্য, এবং জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিরোধের কেন্দ্র।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, জনা বিশেক মুখ্যমন্ত্রী এবং দলের শীর্ষ নেতারা পশ্চিমবঙ্গে লাগাতার প্রচার চালান। এখানেই বিজেপির ‘ডাবল-ইঞ্জিন’ স্লোগানের রাজনৈতিক তাৎপর্য। শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নয়; তারা কথা বলছিলেন ক্ষমতার ভাষায়। ভোটারদের বলা হলো, দিল্লি ও কলকাতায় একই দল থাকলে প্রকল্প, অর্থায়ন, প্রশাসনিক সহযোগিতা ও কল্যাণ কর্মসূচি দ্রুত এগোবে। বার্তা আরও স্পষ্ট, বিরোধী-শাসিত রাজ্য যেন স্বভাবতই পিছিয়ে থাকার ঝুঁকিতে থাকে। একটি ফেডারেল গণতন্ত্রে এই বার্তা রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হলেও নীতিগতভাবে অস্বস্তিকর।
এসআইআইরের রাজনৈতিক অভিঘাত
এই নির্বাচনের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিতর্ক ছিল ভোটার তালিকা হালনাগাদের বিশেষ প্রক্রিয়া— এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন)। প্রশাসনিক ভাষায় এর উদ্দেশ্য ছিল মৃত, স্থানান্তরিত, পুনরাবৃত্ত বা অযোগ্য ভোটার বাদ দেওয়া। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া শুধু প্রশাসনিক ছিল না; এর রাজনৈতিক অভিঘাত ছিল গভীর।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, এসআইআর পরবর্তী ভোটার বাদ পড়া বা বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা বহু আসনে ফলাফলের ব্যবধানের চেয়ে বেশি ছিল। নির্বাচন কমিশনের ফল অনুযায়ী বিজেপি পেয়েছে ৪৫.৮৪ শতাংশ ভোট, আর তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৪০.৭৭ শতাংশ। অর্থাৎ দুই দলের ভোট-শেয়ারের ব্যবধান প্রায় পাঁচ শতাংশ। ভারতের প্রখ্যাত সেফোলজিস্ট তথা ভোট শাস্ত্রবিশারদ যোগেন্দ্র যাদবসহ সমালোচকরা মনে করেন, ২৭ লাখ ভোটার কার্যত ভোটাধিকার হারান বা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি, যা মোট ভোটারের প্রায় ৪.২৫ শতাংশের কাছাকাছি। এ দুই পরিসংখ্যান পাশাপাশি রাখলে প্রশ্নটি আরও গুরুতর হয়: যে ভোটের ব্যবধানে তৃণমূল পিছিয়ে পড়েছে, তার কাছাকাছি পরিমাণ ভোটার কি ভোটের আগেই প্রক্রিয়ার বাইরে চলে গিয়েছিলেন?
এই প্রশ্নকে আরও জটিল করেছে বাদ পড়া ভোটারদের ভৌগোলিক ও ধর্মীয় প্রোফাইল। পশ্চিমবঙ্গে ১১২ বা বেশি আসন রয়েছে, যেখানে মুসলিম ভোটার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বা তারও বেশি। বস্তুত, এই ৪.২৫ শতাংশ ভোটারের অধিকাংশ এসব আসনের। বিশ্লেষকদের অভিযোগ— এসআইআর-এ যারা বাদ পড়েছেন বা যাদের ভোটাধিকার ঝুলে গেছে, তাদের বড় অংশ মালদা, মুর্শিদাবাদসহ মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকার।
মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের বয়ান এই উদ্বেগকে আরও মানবিক মাত্রা দেয়। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অনেক পরিবারের কাছে পাসপোর্ট, পরিচয়পত্র বা পারিবারিক নথি থাকা সত্ত্বেও সামান্য বানান, স্থানান্তর বা কাগজপত্রের ত্রুটির কারণে তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ গেছে বা আপিলের অপেক্ষায় রয়ে গেছে। অনেকের সরল প্রশ্ন ছিল: মা-বাবার নাম তালিকায় থাকলে সন্তানদের নাম কেন বাদ যাবে? বৈধ পরিচয়পত্র থাকলে ভোটাধিকার কেন স্থগিত থাকবে? এই প্রশ্নগুলো কেবল কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়; এগুলো গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার, ভোটাধিকার নিয়ে।
সুপ্রিম কোর্টের অবস্থানও তাই রাজনৈতিক বিতর্কের নিয়ামক হয়ে আছে। আদালত আইনি প্রক্রিয়ার সীমার মধ্যে বিষয়টি দেখেছে, কিন্তু নির্বাচনের আগে এত বড় সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত না হওয়া গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে অস্বস্তিকর। গণতন্ত্রে ভোট দেওয়ার অধিকার “পরের নির্বাচনে” অপেক্ষা করার বিষয় নয়; এটি বর্তমান রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অধিকার। একজন নাগরিকের ভোট যদি একটি নির্বাচনে হারিয়ে যায়, সেটি পাঁচ বছরের জন্য তার রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হারানোর সমান।
এটি ছোটখাটো কারিগরি ত্রুটি নয়। ভোটাধিকার গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় অধিকার। যদি বিপুল সংখ্যক নাগরিকের নাম বাদ পড়ে, অথবা তাঁদের আপিল নিষ্পত্তির আগেই নির্বাচন হয়ে যায়, তাহলে তা কেবল প্রশাসনিক সমস্যা থাকে না; তা রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নে পরিণত হয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ভোট শেষে বাদ পড়া ২৭.১০ লাখ ভোটারের মধ্যে মাত্র ১,৬০৭ জনের নাম পুনরায় যুক্ত হয়েছে এবং ১৫টি আপিল খারিজ হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশনের সূত্র জানিয়েছে।
হিন্দু ভোট সংহতি ও মুসলিম ভোটের অপ্রাসঙ্গিকীকরণ
বিজেপির প্রচার কৌশল ছিল পরিষ্কার। দলটি মুসলিম ভোটকে প্রধান লক্ষ্য বানায়নি। বিজেপি নেতারা খোলামেলাভাবে ’বাংলাদেশী মুসলমানদের’ আক্রমণ করেছেন। তারা অনুপ্রবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু তোষণ, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং হিন্দু স্বার্থরক্ষার ভাষা ব্যবহার করে হিন্দু ভোটারদের একত্র করার চেষ্টা করেছে। এই কৌশলে মুসলিম ভোট হারানোর ভয় ছিল না; বরং মুসলিম ভোটকে তৃণমূলের সঙ্গে স্থির ধরে নিয়ে বৃহত্তর হিন্দু সংহতি গড়ে তোলাই ছিল লক্ষ্য। অন্যদিকে কংগ্রেস, কমিউনস্টি পার্টি ও মুসলিম দলগুলোও তৃণমূলের ভোটে ভাগ বসায়।
এটি নতুন কৌশল নয়, কিন্তু বাংলায় এর প্রয়োগ ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু, নারী, দরিদ্র ও প্রান্তিক ভোটের ওপর শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। বিজেপি সেই ভিত্তিকে সরাসরি ভাঙতে না পেরে তার বিপরীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচয়ের রাজনীতি দাঁড় করায়। ফলে নির্বাচনটি কেবল সরকার পরিবর্তনের প্রশ্ন ছিল না; এটি হয়ে ওঠে পরিচয়, নাগরিকত্ব, ধর্মীয় নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের লড়াই।
মমতার নারীভিত্তি ভাঙার চেষ্টা
মমতার রাজনীতির অন্যতম শক্তি ছিল নারী ভোটার। লক্ষ্মীর ভান্ডারসহ নানা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি তাঁকে নারী ভোটারদের কাছে শক্ত অবস্থান দিয়েছে। বিজেপি তা বুঝেছিল। তাই নারী নিরাপত্তা, নারীশক্তি, কল্যাণ এবং নারী সংরক্ষণের ভাষা ব্যবহার করে তারা মমতার একচেটিয়া প্রভাব ভাঙার চেষ্টা করে।
তবে নারী সংরক্ষণ বিলকে সরাসরি বাংলার ফলাফলের নির্ধারক বলা অতিরঞ্জন হবে। বরং বলা যায়, বিজেপি নারী ভোটারদের কাছে মমতার আবেগী ও কল্যাণমূলক রাজনীতির পাল্টা প্রতীকী ভাষা তৈরি করার চেষ্টা করেছে। বিজেপির নিজস্ব নেতারাও পশ্চিমবঙ্গসহ সাম্প্রতিক রাজ্যগুলোর জয়ের ক্ষেত্রে নারী ভোট ও ‘নারী শক্তি’কে গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরেছেন। এটি ছিল বৃহত্তর কৌশলের অংশ: মমতার প্রতিটি শক্ত ভিত্তির বিপরীতে আলাদা রাজনৈতিক বার্তা দাঁড় করানো।
বিরোধী শূন্যতা ও আঞ্চলিক রাজনীতির সংকট
বিজেপির সাফল্যের আরেকটি কারণ ছিল বাম ও কংগ্রেসের দীর্ঘ পতন। পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী রাজনীতির পুরোনো পরিসর প্রায় শূন্য হয়ে যায়। সেই শূন্যতা বিজেপি দ্রুত দখল করে। তৃণমূলবিরোধী ভোটারদের সামনে কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিজেপি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। ফলে লড়াইটি ধীরে ধীরে তৃণমূল বনাম বিজেপি—এই দুই মেরুতে আটকে যায়।
এই প্রবণতা ভারতের আঞ্চলিক দলগুলোর জন্য বড় সতর্কবার্তা। বিজেপি শুধু নির্বাচনে লড়ে না; তারা বিরোধী শিবিরের জায়গা দখল করে, আঞ্চলিক নেতৃত্বকে চাপে রাখে, ভাঙন তৈরি করে এবং প্রতিটি রাজ্য নির্বাচনকে জাতীয় ক্ষমতার সম্প্রসারণে পরিণত করে। বাংলাও সেই বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ।
বর্তমানে বিজেপি ২২টি রাজ্যের ক্ষমতায় আছে। ধারণা করো হচ্ছে, ২০২৯-এর মধ্যে তিনটি রাজ্য বাদ সকল রাজ্যই তাদের করায়ত্ব হয়ে যাবে। পরিশেষে, একক রাজনৈতিক দলের সকল রাজ্যে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ ভারতীয় ফেডারেল কাঠামোর জন্য মন্দ না ভালো তা জানতে বোধ করি বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে হবে না।
বদরুল হাসান: উন্নয়ন ও মানবিক নীতিবিশেষজ্ঞ
[email protected]
