ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাদা কালো

আইনি অধিকার থেকে আইভী বঞ্চিত কেন

আইনি অধিকার থেকে আইভী বঞ্চিত কেন
×

সাইফুর রহমান তপন

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ০৮:২৫ | আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ | ১২:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী জামিন পেলেও মুক্তি পেলেন না। গত বছরের ৯ মে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর গত ১২ এপ্রিল পর্যন্ত আইভীকে মোট ১২টি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই ১২ মামলাতেই হাইকোর্ট তাঁকে জামিন দিয়েছিলেন। আবার ১২টিতেই জামিন বাতিলের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগের দ্বারস্থ হয়। এর মধ্যে ১০টিতে গত রোববার রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ করে জামিন বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। বাকি দুই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের জামিন স্থগিতের পৃথক আবেদন তখনও চেম্বার আদালতের কার্যতালিকায় আসেনি। সে হিসাবে ১২ মামলাতেই রোববার আইভী জামিনে ছিলেন। তাই সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বরাত দিয়ে ওই দিনের সমকালসহ সব সংবাদমাধ্যমের খবর ছিল, আইভীর কারামুক্তিতে আইনি কোনো বাধা নেই। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর হলো না। 

সর্বশেষ দুই মামলায় যথাক্রমে গত ২ মার্চ ও ১২ এপ্রিল তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন স্থানীয় আদালত। উভয় মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত না হলেও চেম্বার আদালতে এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা ছিল গত সোমবার। সম্ভবত সে কারণেই তাঁর কারামুক্তির প্রক্রিয়া তখনও শুরু হয়নি। কিন্তু কার্যতালিকার নিচের দিকে থাকায় ওই দুই মামলার শুনানি ওই দিন হয়নি। কবে হবে– কেউ বলতে পারছেন না। 

গত ১০ মে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে প্রথম আলো লিখেছে, মামলার ‘চক্করে’ আইভী, তাই জামিন পেয়েও তাঁর মুক্তি মিলছে না। মামলার চক্করটা এমন– প্রথমে গ্রেপ্তার। এরপর একের পর এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো। মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচটি। সেগুলোতে উচ্চ আদালতে জামিন পান। এরপর আরও পাঁচ মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই পাঁচ মামলায়ও জামিন দেন উচ্চ আদালত। তারপর আরও দুই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সেই দুই মামলায়ও জামিন হয়। কিন্তু প্রথম দুই দফার ১০ মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিন চেম্বার আদালতে স্থগিত হয়। আসামিপক্ষ আপিল বিভাগে গেলে ১০ মামলাতেই জামিন পুনর্বহাল হয়। বর্তমানে সর্বশেষ দুই মামলায় চেম্বার আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের জামিন স্থগিতের আবেদন শুনানির অপেক্ষায়। এরপর নিশ্চয়ই তা যাবে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে। অন্য মামলাগুলোর মতো সেখানে যদি আইভী জামিন পান, পুলিশ কি আবারও নতুন মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখাবে? যদিও গত ২৬ এপ্রিল সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া আইভীকে গ্রেপ্তার না দেখাতে ও হয়রানি না করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এরপর নতুন কোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি তাঁকে। তবুও কি বলা যায়, আইভী অচিরেই মুক্তি পাবেন?

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদন বলছে, ১২ মামলার মধ্যে সাতটির এজাহারে আইভীর নাম নেই। আবার এজাহারনামীয় পাঁচ মামলার তিনটির বাদী পত্রিকাটির এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘তারা এজাহারে কারও নাম দেননি। আইভীসহ আসামিদের তারা চেনেন না। তাদের দাবি, বিএনপির কিছু নেতাকর্মী ও থানার পুলিশ মামলার এজাহারে আসামিদের নাম দিয়েছে।’

সন্দেহটা এখানেই দানা বাঁধে– আইভীর মামলাগুলোর সঙ্গে রাজনীতির যোগ স্পষ্ট। এক বছর পার হলেও তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোর তদন্ত পুলিশ এখনও শেষ করতে পারেনি। এর সঙ্গেও ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার যোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শুধু তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্য নয়; আদালতের রুল এবং প্রায় সব মামলায় জামিন মঞ্জুরের ঘটনায়ও মামলাগুলোর দুর্বল ভিত্তি বোঝা যায়। ফলে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হলে এগুলো টেকার কথা নয়।

আইভী আওয়ামী লীগের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সহসভাপতি হলেও কার্যত দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা। সর্বোপরি, স্বচ্ছ ভাবমূর্তির আইভী নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী বলয়ে তো বটেই, ভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরেও ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের যে অংশ নানা প্রকার অপরাধকর্মে যুক্ত বলে মনে করা হয়, তাদের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার ছিলেন তিনি। বলা যায়, তাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই বরাবর রাজনীতি চালিয়ে গেছেন আইভী। ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। ২০১১ সালে সেই পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। তখন থেকে সর্বশেষ নির্বাচন পর্যন্ত টানা তিন দফায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র হন তিনি। ওইসব নির্বাচনে বারবার হেরে বিএনপি নেতারাও নিশ্চয় আইভির গণভিত্তি ও শক্তিমত্তা সম্পর্কে সচেতন।
আইনত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। মাঠে দলটির তৎপরতাও তেমন নেই। এ সুযোগে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা জামায়াতে ইসলামী ভোগ করলেও অস্বীকারের উপায় নেই, কার্যত আওয়ামী লীগই আগের মতো সরকারি দল বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা হিসেবে বিগত সময়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে হত্যাকাণ্ডসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালিয়ে অনেকে যখন রাজনীতি থেকে কার্যত নির্বাসিত, তখন আইভীর মতো নেতারা দলটিকে ভরসা জোগাতে পারেন। ক্ষমতাসীনরা সম্ভবত যতক্ষণ সম্ভব এ চ্যালেঞ্জ ঠেকিয়ে রাখতে চান।

এটাও সত্য, আওয়ামী লীগে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির আরও অনেক নেতা আছেন। বিশেষত সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী তো দলের হাল ধরছেন বলে মাঝে মাঝেই গুঞ্জন ওঠে। আইভীর মতো হত্যা বা হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পরও এ দুজন প্রায় রকেট গতিতে জামিন ও মুক্তি পেয়েছেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, শাসকেরা ওই দুজনকে ছাড় দিলেও আইভীকে দিচ্ছেন না কেন?

নিশ্চিত কোনো উত্তর নেই এ প্রশ্নের। তবে এটা অন্তত বলা যায়, আমাদের সমাজে এলিট বলতে যাদের বোঝানো হয়, দুই চৌধুরী সহজেই তার মধ্যে পড়েন। সেদিক থেকে অন্তর্বর্তী সরকার বা বর্তমান শাসক মহলের ঔদার্য আদায় করা তাদের পক্ষে কঠিন নয়। উপরন্তু আন্তর্জাতিক মহলে যারা আমাদের শাসকদের ওপর বরাবরই প্রভাব রাখেন, তাদেরও সঙ্গে শিরীন শারমিন ও সাবের চৌধুরীর যোগাযোগ কারও অজানা নয়। এ উভয় ক্ষেত্রেই আইভী তাদের সমকক্ষ নন। আবার আওয়ামী রাজনীতিতে ওই দুজনের শিকড় আইভীর মতো গভীরে নেই। ফলে স্থানীয় তো বটেই, জাতীয় পর্যায়েও আওয়ামী নেতাকর্মীদের আইভী যতটা সহজে জাগিয়ে তুলতে পারবেন, অন্য দুজনের জন্য তা তত সহজ না হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি।

তবে মামলার চক্করে ফেলে আইভীকে আটকে রাখা আর যাই হোক, আইনের শাসন নয়; গণতন্ত্রসম্মত তো নয়ই। বিশেষত যে রাজনৈতিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা জাতীয় অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি, তা– ইতিহাস সাক্ষী, এ প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত করা অসম্ভব। শুধু আইভী নন, আরও বহু বিরোধী রাজনীতিক এবং সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে নিছক আওয়ামী সমর্থক হওয়ার কারণে বিনা বিচারে মাসের পর মাস কারারুদ্ধ রাখা হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, এসব এমন সময়ে করা হচ্ছে যখন খোদ সরকারপ্রধান পুলিশকে বলছেন দলনিরপেক্ষ আচরণ করতে এবং দলীয় ইশতেহারে আদালতের কাজে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ বন্ধের লিখিত অঙ্গীকার করেছেন। যে কোনো উপায়ে প্রতিপক্ষ দমনের অসুস্থ রাজনীতির অবসান যে দলের ঘোষিত লক্ষ্য, সেই দলের কাছে আইভীর মতো নেতাদের ঘিরে জামিন আর শোন অ্যারেস্টের খেলায় মত্ত হওয়া একেবারেই অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×