নিরাপত্তা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা ও নিরাপত্তাবোধ
খুশী কবির
খুশী কবির
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:২৫ | আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ | ১০:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রীকে গভীর রাতে সড়ক থেকে টেনেহিঁচড়ে ঝোপে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও নিরাপদ নাগরিক তৈরির স্থান হওয়ার কথা। অথচ শিক্ষার্থী, বিশেষ করে নারীশিক্ষার্থীদের নিজেদের ক্যাম্পাসেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হচ্ছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যখন একজন শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেও নিরাপদ থাকেন না, তখন তা একদিকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতা নির্দেশ করে, অন্যদিকে সরকারের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রশ্নও তোলে। শুধু ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন বা দায়সারা বিবৃতি দিলে চলবে না; প্রয়োজন কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, নিয়মিত টহল, সিসিটিভি নজরদারি ইত্যাদি যেমন জরুরি, তেমনি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফিলতির প্রশ্নটির সন্তোষজনক উত্তরও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
নারীর প্রতি সহিংসতা কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি সামাজিক মানসিকতারও সংকট। তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা এখন আর কেবল দাবি নয়, এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের চোখে সবাই সমান, এটিই হওয়া উচিত মূল নীতি। বাস্তবে দেখা যায়, দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অনেক অপরাধী সহজেই পার পেয়ে যায়। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়া থাকলে তদন্ত ধীর হয়ে যায়, মামলা দুর্বল হয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরাই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। এতে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায়।
শুধু অতীত সরকার নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এ ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। বিভিন্ন এলাকায় নারীকে হয়রানি করেও পার পেয়ে গেছে–এমন খবর প্রায়ই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, সমস্যাটি কেবল ব্যক্তি বা দলের নয়; বরং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার গভীরে এর শিকড় রয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধটাই বিচার্য হতে হবে। প্রশাসন ও আইশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও আত্মসমালোচনা করে অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
নির্বাচিত সরকার গঠনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল–রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং জনজীবনে নিরাপত্তাবোধ বাড়বে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন স্থানে মব সৃষ্টি, গণপিটুনি ও উচ্ছৃঙ্খল জনতার তৎপরতা এখনও উদ্বেগজনকভাবে বিদ্যমান।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে ছোটখাটো অভিযোগ বা গুজবকে কেন্দ্র করে জনতাকে মুহূর্তেই সহিংস করে তোলা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিরপরাধ মানুষও মবের শিকার হচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা কিংবা দ্রুত হস্তক্ষেপের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। নির্বাচিত সরকার যদি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে মানুষের আস্থায় স্বাভাবিকভাবেই ভাঙন তৈরি হবে।
শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি। গুজব প্রতিরোধ, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। কারণ মব সংস্কৃতি দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। সরকারের উচিত এখনই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, যাতে জনগণ আইনের প্রতি আস্থা ফিরে পায়।

নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল–আইনের শাসন শক্তিশালী হবে, অপরাধ কমবে এবং নারী ও শিশু নিরাপদ পরিবেশ পাবে। বাস্তবতা উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক সময়ে হত্যা, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং সহিংসতা, নারী নিপীড়ন ও শিশু ধর্ষণের মতো অপরাধ বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রে এমন নির্মম ঘটনার খবর প্রকাশিত হচ্ছে, যা সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকে সামনে এনে দেয়।
বিশেষ করে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখন ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতন, অনলাইন হয়রানি এবং যৌন সহিংসতার ঘটনায় মানুষ আতঙ্কিত। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থ বা সামাজিক ক্ষমতার কারণে শাস্তি এড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে অন্তত ১৬৫ শিশু। আরেক মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৭৪৯ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালে সংখ্যাটা ছিল ৪০১। এ বছরের প্রথম তিন মাসে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৮ (বাংলা ট্রিবিউন, ১১ মে)। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বছর শেষে সংখ্যাটা ২০২৫ সালকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল, আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় নারীর নিরাপত্তা এখনও কতটা অনিশ্চিত। সেখানে অতীতের মতোই শিক্ষার্থীরা এ নৃশংস অপরাধের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালাচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, ক্যাম্পাসে সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেশ কয়েকটি যৌন নিপীড়ন ও হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে, প্রতিবাদ হলেও প্রতিকার মেলেনি। অভিজ্ঞতা বলে, প্রতিবারই কিছুদিন আলোচনা হয়, তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, তারপর ধীরে ধীরে সব চাপা পড়ে যায়। ফলে অপরাধীরা শাস্তির বদলে এক ধরনের নীরব প্রশ্রয় পেয়ে যায়।
একটি রাষ্ট্র কতটা নারীবান্ধব, তা বোঝা যায় নারীর নিরাপত্তা, বিচারপ্রাপ্তি ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে। বাস্তবতা হলো, ভুক্তভোগীরা প্রায়ই সামাজিক লজ্জা, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক উদাসীনতার শিকার হন। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ও কার্যকর উদ্যোগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও হতাশাজনক করে তুলছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞানচর্চার স্থান নয়; এটি নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশেরও প্রতীক হওয়া উচিত। তাই দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন দ্রুত বিচার, স্বচ্ছ তদন্ত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিমূলক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। অন্যথায় এমন ঘটনা বারবার ঘটবে, আর রাষ্ট্রের নারীবান্ধবতার দাবিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েই থাকবে।
খুশী কবির: মানবাধিকারকর্মী; সমন্বয়ক, নিজেরা করি
