ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উচ্চশিক্ষা

নতুন উপাচার্য নিয়োগে পুরোনো প্রশ্ন

নতুন উপাচার্য নিয়োগে পুরোনো প্রশ্ন
×

মাহফুজুর রহমান মানিক

মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ২০ মে ২০২৬ | ১২:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১২ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত এক কর্মশালায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে পড়ার কারণ রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ। তাঁর এই বক্তব্য অনেককেই আশাবাদী করেছিল– এই সরকার হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দলীয়করণ থেকে রেহাই দেবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বলছে, সরকার সেই পুরোনো পথেই এগোচ্ছে। সাম্প্রতিক ২০ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ বিশ্লেষণ করে মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন বলছে, ‘উপাচার্য নিয়োগে দলীয় পরিচয়ই গুরুত্ব পাচ্ছে’। উপাচার্য নিয়োগের এ ধারার প্রভাব থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ যে রক্ষা পাবে না– তা বুঝতে কারও বিশেষজ্ঞ হতে হবে না।

উপাচার্য নিয়োগে দলীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার কারণে দক্ষতা, মান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রও অনেক ক্ষেত্রে ম্লান হয়। অতীতে বহুবার তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। সম্ভবত সে আশঙ্কা থেকেই ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) শিক্ষার্থীরা কয়েক দিন ধরে নতুন উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। তারা নতুন উপচার্যকে ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন। তাদের দাবি– ‘ডুয়েটের শিক্ষকদের মধ্য থেকেই যেন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।’ আগের উপাচার্য যেখানে ডুয়েটের শিক্ষক ছিলেন, সেখানে নতুন উপাচার্য এসেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। 
১৩ মে ডুয়েট শিক্ষক সমিতি দাবি করেছে, পুরোনো উপাচার্যকে তাঁর মেয়াদ পূর্ণ করতে দিতে হবে। এটাও ন্যায্য দাবি। কারণ পুরোনো উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়ম বা নিয়োগের কোনো শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ ওঠেনি। 

সমস্যা শুধু ডুয়েটে নয়। দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ায় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও অসন্তোষ কম নয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্বিবদ্যালয়-বুয়েটে ১৯ জনকে ডিঙিয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও অভিযোগ, এর আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি কখনও বিভাগীয় প্রধান, অনুষদের ডিন কিংবা অন্য কোনো প্রশাসনিক পদে ছিলেন না। জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে যিনি নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে নারী শিক্ষার্থী নিপীড়ন, মানসিক নির্যাতন, গবেষণাপত্রে জালিয়াতিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তদন্ত শেষ হয়নি। দুটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বিবদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সমাজকল্যাণ ও মার্কেটিংয়ের অধ্যাপককে, যদিও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইনে ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ’ ব্যক্তিকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা আছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের মুখে কোষাধ্যক্ষের পদ হারানো অধ্যাপককে এখন উপাচার্য করা হয়েছে।

গত মার্চের মাঝামাঝি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও কুয়েটে ভিসি নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মক্ষেত্রে বিএনপিদলীয় শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা আছেন। দলীয় বিবেচনার ভিত্তিতে উপাচার্য নিয়োগ বিষয়ে প্রশ্ন করলে শিক্ষামন্ত্রী উত্তর দিয়েছেন, ‘রাজনীতি করা কি অপরাধ? এটি কি তাদের অযোগ্যতা?’ 
শিক্ষকদের রাজনীতি করা নিশ্চয় অপরাধ কিংবা অযোগ্যতা নয়। কিন্তু রাজনীতি করা শিক্ষকরাই যখন উপাচার্য হচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা নিয়েও যখন প্রশ্ন উঠছে তখন সরকারের সদিচ্ছা প্রশ্নবিদ্ধ। সমকালের প্রতিবেদনে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক এমনটাই বলেছেন, ‘বাংলাদেশে অতীতে যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিজেদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদেরই নিয়োগ দিয়েছে। সরকার বদলেছে, দল বদলেছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের সংস্কৃতি বদলায়নি।’

সরকার সম্প্রতি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি পুনর্গঠন করেছে। সার্চ কমিটি গঠনকে এক ধরনের সদিচ্ছা হিসেবে দেখা যায় বটে। কিন্তু তাদের সুপারিশই যদি এমন হয়, তবে কমিটির গঠন প্রশ্নবিদ্ধ। কিংবা তাদের সুপারিশ কতটা আমলে নেওয়া হয়েছে, তাও আমরা জানি না।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অর্ধশতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিতে হয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগের সময়ে দলীয় পরিচয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চব্বিশের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর পদত্যাগ করেছিলেন। নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় আমি লিখেছিলাম, ‘ভিসি খোঁজার মিশন’ (২৯ আগস্ট ২০২৪)। তখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য যোগ্য উপাচার্য খুঁজে পেতে সরকারকে বেশ বেগ পেতে হয়। তবে সেসব নিয়োগ নিয়েও পরবর্তী সময়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা তো প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে এমনও বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদগুলো বিএনপি ও জামায়াত কার্যত ভাগাভাগি করে নিয়েছে। 

এখন কিন্তু সেই পরিস্থিতি নেই যে বিশ্ববিদ্যালয় অভিভাবকহীন। এ সরকারের উচিত ছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য কেমন করছেন, তা আগে দেখা। কোথাও জরুরি প্রয়োজন হলে পরিবর্তন করাই যায়। তা না করে যেভাবে ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হলো এবং সেখানে দলীয় বিবেচনাকেই প্রাধান্য দেওয়া হলো, তাতে প্রশ্ন উঠছে: সরকার কি তাহলে শিক্ষাঙ্গন দলীয়করণের মিশনে নেমেছে? 

সেটি কোনো ভালো বার্তা নয়। ইতোমধ্যে ডুয়েটের শিক্ষার্থীরা নতুন উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন। অন্যত্রও উপাচার্যবিরোধী অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এমনটা হলে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হবে। দলীয়করণের কবলে পড়লে সাধারণ শিক্ষার্থীরা জিম্মি হবে। ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষের বিস্তার ঘটবে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপির অন্তত এটি অনুধাবন করা উচিত ছিল– উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণমুক্ত রাখতে হবে। এখনও সময় আছে। বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যাপারে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। বরং উচ্চশিক্ষার মান বাড়ানো, গবেষণা ও শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে মনোযোগ দিতে হবে।

মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×