চারদিক
বাল্যবিয়ের অন্ধকারে কিশোরীর স্বপ্ন
বাল্যবিয়ে রোধ করা কেবল আইনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন দারিদ্র্য বিমোচন ও তৃণমূল পর্যায়ে শিক্ষার বিস্তার।
সালাহ উদ্দিন কাশেম
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ | ১১:১৬ | আপডেট: ২৫ মে ২০২৬ | ১৪:২৬
গাইবান্ধা জেলা তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীবিধৌত এলাকা। জেলার ফুলছড়ি, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ এবং সদর উপজেলার বিশাল অংশ চরাঞ্চল। এ অঞ্চলের মানুষের নদীভাঙন, অতিবৃষ্টি ও বন্যার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। এ ছাড়া যাতায়াত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং চরাঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ কম থাকায় অভিভাবকরা মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দেন। বিশেষ করে নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো পরিবার অনিশ্চয়তার মুখে মেয়ের বিয়েকেই সমাধান মনে করে।
গাইবান্ধার মূল ভূখণ্ডেও বাল্যবিয়ে থেমে নেই। বাল্যবিয়ে রোধ করা কেবল আইনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন দারিদ্র্য বিমোচন ও তৃণমূল পর্যায়ে শিক্ষার বিস্তার। বাল্যবিয়ে বৃদ্ধির প্রধান কারণ চরম দারিদ্র্য।
গাইবান্ধা কৃষিপ্রধান ও দারিদ্র্যপীড়িত জেলা। নদীভাঙন ও বন্যার কারণে প্রতিবছর অনেক পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। অভাবের সংসারে কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করে দ্রুত বিয়ে দিয়ে খরচ কমানোর চেষ্টা করে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও যমুনা নদীর ভাঙনের ফলে হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়। একটি পরিবার বারবার বাস্তুচ্যুত হলে তাদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে তারা মেয়েদের বাল্যবিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও অনেকে মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দিতে চান। মেয়েদের যৌন হয়রানি বা সামাজিক লাঞ্ছনার ভয় অনেক বাবা-মাকে আতঙ্কিত করে তোলে। নিরাপদ সামাজিক পরিবেশের অভাব এবং সম্মান রক্ষার দোহাই দিয়ে অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষার অভাব ও ঝরে পড়া। প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম এবং যাতায়াত ব্যবস্থা দুর্গম। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার পর অনেক মেয়ে স্কুল থেকেই ঝরে পড়ে। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলে বিয়েই তাদের একমাত্র বিকল্প পথ হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক অভিভাবক এখনও মনে করেন, মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দেওয়াই ধর্মীয় বা সামাজিক দায়িত্ব। বাল্যবিয়ের কুফল যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি, মাতৃমৃত্যু ইত্যাদি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে তাদের। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা অসাধু চক্রের সহায়তায় বয়স বাড়িয়ে ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরি করে বাল্যবিয়ে দেওয়া হয়।
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। যখন পাড়া-মহল্লার মানুষ বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে জানবে, নিজেরাই এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
গাইবান্ধার দুর্গম চরাঞ্চলে প্রশাসনের নজরদারি সব সময় পৌঁছানো কঠিন। সেখানে স্থানীয় ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও তরুণদের নিয়ে সামাজিক বলয় তৈরি করলে বাল্যবিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। এই আন্দোলনে শিক্ষক, ইমাম, পুরোহিত, জনপ্রতিনিধি এবং ছাত্রছাত্রীকে সম্পৃক্ত করা হলে এটি এক শক্তিশালী আন্দোলনে রূপ নেবে।
গাইবান্ধার প্রতিটি গ্রামে নিয়মিত উঠান বৈঠক করতে হবে। মায়েদের বোঝাতে হবে– অল্প বয়সে বিয়ে মানে মেয়ের অকাল মৃত্যুঝুঁকি এবং অপুষ্টির শিকার হওয়া। জেলার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ দল’ গঠন করা যেতে পারে। কোথাও বিয়ের খবর পেলে তারা দ্রুত প্রশাসনকে জানাবে এবং বিয়ে বন্ধে ভূমিকা রাখবে। জুমার খুতবা বা মন্দিরের আলোচনায় বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে কথা বলা হলে তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলবে। বিয়ের বয়স যাচাই না করে যাতে কোনো ঘটক, কাজি বা পুরোহিত বিয়ে না পড়ান, সে ব্যাপারে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে কঠোর হতে হবে।
মেয়েদের কারিগরি শিক্ষা ও আত্মনির্ভরশীল করার পথ তৈরি করতে হবে, যাতে বাবা-মা তাদের বোঝা মনে না করেন। চর এলাকায় বেশি করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে চরের মানুষের জন্য বিশেষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন। তা ছাড়া কাজি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি মেয়ে যদি শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হয়, তবে শুধু একটি পরিবার নয়, বদলে যাবে পুরো জেলা।
এ কে এম সালাহ উদ্দিন কাশেম: সভাপতি, নাগরিক উন্নয়ন সংস্থা, গাইবান্ধা
