ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শিক্ষা বাণিজ্য

গাইডের হাটবাজারে শিক্ষার্থী পণ্য

গাইডের হাটবাজারে শিক্ষার্থী পণ্য
×

মাহফুজুর রহমান মানিক

মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১৫ | আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৯:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

গাইড বই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভিন্ন কারণে ভালোভাবেই গেড়ে বসেছে। খোদ শিক্ষকরাই পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে নোট-গাইড বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত। আরও ভয়ানক বিষয় মঙ্গলবার সমকালে ‘অকৃতকার্যের ভয় দেখিয়ে গাইড বেচাকেনা’র খবরও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার চিত্র উঠে এলেও পুরো দেশের বাস্তবতা খুব ভিন্ন নয়। অথচ সরকার প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই তুলে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পেছনে সরকারের এই বিশাল ব্যয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য শিক্ষার্থী পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বস্তি দেওয়া। পাশাপাশি নোট-গাইড বন্ধ করাও উদ্দেশ্য। সেখানে বাস্তবে গাইড-সহায়ক বই কিনতে গিয়েই অভিভাবকের ঘাম ছুটে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনমতে, চারঘাট উপজেলায় ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার ও সহায়ক বই মিলিয়ে প্রায় এক হাজার ৮০০ টাকার প্যাকেজ কিনতে হচ্ছে। নবম শ্রেণিতে সেই প্যাকেজের দাম প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। বিনামূল্যের পাঠ্যবই পাওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের কেন এত টাকার নোট-গাইড কিনতে হবে? একজন অভিভাবক বলেছেন, ‘সরকার বই ফ্রি দিচ্ছে। কিন্তু স্কুল আবার কয়েক হাজার টাকার বইয়ের তালিকা ধরিয়ে দিয়েছে। দুই মেয়ের বই কিনতে ঋণ করতে হয়েছে।’ অভিভাবকরাও অনন্যোপায়। অভিযোগ আছে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানোর। নম্বর কমিয়ে দেওয়া কিংবা প্রশ্ন কমন না পাওয়ার ভয় দেখিয়েও নির্দিষ্ট প্রকাশনীর বই বিক্রি করা হচ্ছে। 

শিক্ষার ব্যবসাটা তারা ভালোভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে! সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে, শিক্ষক সমিতি, প্রকাশনী সংস্থা, শিক্ষক, বইয়ের দোকানি সবাই মধু খাচ্ছে। এক উপজেলাতেই পাঁচ কোটি টাকার বেশি গাইড-নোট বই বিক্রি হচ্ছে। এই সিন্ডিকেটে শিক্ষকরা কেন যুক্ত? কেন তারা ফেল করা কিংবা নম্বর কমিয়ে দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছেন– এমন অভিযোগ এই প্রথম নয়। এমন শিক্ষকও আছেন, যারা প্রাইভেট না পড়লে কিংবা কোচিং না করলে অনুরূপ হুমকি দেন। অভিযোগ আছে, কেউ কেউ শ্রেণিকক্ষে ভালোভাবে পড়ান না কিংবা ইচ্ছা করে সিলেবাস শেষ করেন না, যাতে শিক্ষার্থীরা তার কাছে পড়তে বাধ্য হয়। অথচ নোট-গাইডের পুরো সিন্ডিকেট ভেঙে পড়তে পারে, যদি শিক্ষক নৈতিক অবস্থান নেন। যেখানে শিক্ষকই সিন্ডিকেটের অংশ, সেখানে শিক্ষার্থী-অভিভাবক কী করবেন?

নোট-গাইড কিংবা প্রাইভেট-কোচিংয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দোষের কথার সঙ্গে তাদের বেতন-ভাতার বিষয়ও চলে আসে। আমাদের দেশের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো সকল স্তরেই কম। আন্তর্জাতিক পর্যায় তো বটেই, উপমহাদেশের মধ্যে তুলনা করলেও এ চিত্র দেখতে পাই। সে জন্য শিক্ষকদের আলাদা বেতন কাঠামোর দাবি অনেক দিনের। মেধাবী ও যোগ্যদের শিক্ষকতায় আনতে হলে সেটি বিবেচনা করতে হবে। তবে বেতন কাঠামোর দোহাই দিয়ে শিক্ষকরা নীতি-নৈতিকতা হারাবেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি তো রীতিমতো গুরুতর। 

শিক্ষকদের বরং এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, নোট-গাইড না কিনে এনসিটিবি থেকে পাওয়া বই পড়লে ভালো নম্বর পাওয়া যায়। এটি প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে আরেকটি বিষয় জরুরি, শ্রেণিকক্ষে ভালোভাবে পড়ানো। এখন ইন্টারনেটের যুগ। শিক্ষকরা চাইলে এআই, ইউটিউবসহ বিভিন্ন উৎস থেকে বিষয়টি আত্মস্থ করে শ্রেণিকক্ষে এসে পড়ালে শিক্ষার্থীরা সহজেই বুঝতে পারবে। তাদের আর নোট-গাইডের প্রয়োজন পড়বে না। 

এটাও বলা দরকার, পাঠ্যবই প্রণয়নে এনসিটিবিকে সেরা শিক্ষকদের যুক্ত করতে হবে। যেখানে বিষয় বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞ ও প্যাডাগজি বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ও থাকবে। প্রাসঙ্গিকভাবে বলা দরকার, সরকার যেহেতু নতুন শিক্ষাক্রমে হাত দিয়েছে; পর্যাপ্ত গবেষণা করে শিক্ষাক্রম তৈরির পর পাঠ্যবইয়ের ক্ষেত্রে এই সমন্বয় মেনে চলতে হবে। 

সরকারি পাঠ্যবইয়ের পরও যদি অনেক টাকা দিয়ে আরও বই কিনতে হয়; প্রাথমিক থেকে এসএসসি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্যবই দেওয়ার কর্মসূচি অর্থহীন হয়ে যাবে। ইউনেস্কোর ‘ওয়ার্ল্ড এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৫’ বলছে, বাংলাদেশে মাত্র পাঁচ বছরের অবৈতনিক শিক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। এই সূচকে বৈশ্বিক তালিকার একেবারে নিচের দিকে বাংলাদেশের অবস্থান। অর্থাৎ দেশের শিক্ষার যে খরচ, তা প্রধানত পরিবারকেই বহন করতে হয়। প্রাথমিক শিক্ষার পাঁচ বছর অবৈতনিক এবং পাঠ্যপুস্তকও শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে পাচ্ছে। মাধ্যমিক শিক্ষা যেহেতু প্রধানত বেসরকারি, এখানে শিক্ষার্থীদের পরিবারকেই বেতনসহ অন্যান্য খরচ বহন করতে হয়। পাঠ্যপুস্তক শুধু সরকার বিনামূল্যে দিয়ে থাকে। এখানেই যদি অতিরিক্ত নোট-গাইড শিক্ষার্থীদের কিনতে হয়, তাতে শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের সুফল কী? 
বলা বাহুল্য, ২০০৮ সালে উচ্চ আদালত নোট-গাইডনির্ভর বন্ধের নির্দেশনা দেন। শিক্ষা আইনের খসড়াতেও শিক্ষার্থীদের বাণিজ্যিক বই কিনতে বাধ্য করাকে দণ্ডনীয় অপরাধরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তবে সে আইন কার্যকর হচ্ছে না; নোট-গাইডের বিস্তারই তার প্রমাণ। এর মধ্যে সরকার যেভাবে প্রাথমিকেও বৃত্তি পরীক্ষা চালু করেছে এবং প্রথম শ্রেণিতেও ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে, তাতে প্রাথমিকেও এর বিস্তার ঘটবে বৈ কি।

মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল 

আরও পড়ুন

×