ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

রাইট টার্ন

এআই, জাপান এবং বাংলাদেশের নতুন শ্রমবাজার

এআই, জাপান এবং বাংলাদেশের নতুন শ্রমবাজার
×

মোহাম্মদ গোলাম নবী

মোহাম্মদ গোলাম নবী

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাপানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘সফটব্যাংক’ সম্প্রতি ফ্রান্সে প্রায় ৮৭ বিলিয়ন ডলারের এআই অবকাঠামো বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। একই সময়ে বিদেশি দক্ষ কর্মী গ্রহণ কর্মসূচিরও সম্প্রসারণ করছে। দুটি ঘটনা আপাতদৃষ্টিতে আলাদা মনে হলেও আসলে একই বাস্তবতার দুটি দিক। একটি দেখাচ্ছে ভবিষ্যতের অর্থনীতি কোথায় যাচ্ছে। অন্যটি দেখাচ্ছে সেই অর্থনীতি পরিচালনার জন্য কেমন মানবসম্পদ প্রয়োজন। বাংলাদেশের জন্য দুটি ঘটনাই গুরুত্বপূর্ণ।

জাপান বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিল্প অর্থনীতি। কিন্তু দেশটি দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যা সংকটের মুখোমুখি। ২০২৫ সালের আদমশুমারির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দেশটির জনসংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখে। গত পাঁচ বছরে জনসংখ্যা কমেছে প্রায় ৩১ লাখ। জন্মহারও ধারাবাহিকভাবে কমছে। ফলে শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, বিশেষ করে প্রবীণসেবা খাতে কর্মী সংকট তীব্র হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে জাপান একদিকে এআই, রোবটিকস এবং অটোমেশনে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে বিদেশি দক্ষ কর্মী গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। 

প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনকে বাংলাদেশ কীভাবে দেখবে? শুধু শ্রম অভিবাসনের সুযোগ হিসেবে, নাকি জাতীয় সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ হিসেবে? প্রায়ই বলা হয়, আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষ। কিন্তু মানুষ তখনই সম্পদ, যখন তারা দক্ষ, উৎপাদনশীল ও পরিবর্তনশীল অর্থনীতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সক্ষম। অন্যথায় জনসংখ্যা সম্পদ নয়; বরং চাপ হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের উন্নয়ন আলোচনায় একটি প্রশ্ন খুব কমই উঠে আসে– বাংলাদেশ বিশ্বকে কী অফার করবে? গত দুই দশকে দেশের প্রধান শক্তি ছিল তৈরি পোশাকশিল্প এবং স্বল্পমূল্যের শ্রম। এ দুই শক্তি অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু আগামী দুই দশকের বিশ্ব অর্থনীতি হবে ভিন্ন। সেখানে প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতার।

চীন বিশ্বকে দিয়েছে উৎপাদন সক্ষমতা; ভারত দিয়েছে দক্ষ জনশক্তি; ভিয়েতনাম দিয়েছে উৎপাদনশীল শ্রমশক্তি। বাংলাদেশেরও এখন নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে– আমরা কী দিতে চাই?
এ প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে: দক্ষ মানবসম্পদ। এখানেই জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থের মিল; সেখানে দক্ষ মানুষ দরকার। বাংলাদেশেও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে দুটি লাভ হবে: এক. নিজ দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, আধুনিক কৃষি, উৎপাদন শিল্প খাতের দক্ষ প্রযুক্তিবিদের ঘাটতি দূর করা সম্ভব হবে; এবং দুই. জাপানসহ অন্যান্য দেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করা যাবে।
আজকের বিশ্বে শ্রমবাজার দ্রুত বদলাচ্ছে। এআই প্রযুক্তি কিছু কাজের ধরন পরিবর্তন করার পাশাপাশি নতুন কাজও সৃষ্টি করছে। রোবট পরিচালনা, স্মার্ট উৎপাদন, তথ্য ব্যবস্থাপনা, ডেটা সাপোর্ট, ডিজিটাল সেবা, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, স্মার্ট কৃষি এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবায় নতুন দক্ষতার চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে?

দুঃখজনক হলেও সত্য, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় আমরা এখনও পিছিয়ে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষার ধারায় যাচ্ছে। অথচ ভবিষ্যতের বৈশ্বিক শ্রমবাজার ক্রমেই দক্ষতা, প্রযুক্তি ও উৎপাদননির্ভর হয়ে উঠছে।

এদিকে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। এর বাইরে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। আগামী এক দশকে কয়েক কোটি তরুণের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারলে বিদ্যমান জনমিতিক সুবিধা দ্রুত জনমিতিক চাপে পরিণত হতে পারে।

এই বাস্তবতায় জাতীয় প্রশ্নগুলোর একটি হলো, আগামী ১০ বছরে আমরা কীভাবে এক কোটি বা তারও বেশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করব? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকার বা বেসরকারি খাত একা দিতে পারবে না। শিক্ষা ব্যবস্থা, শিল্পনীতি, প্রযুক্তিনীতি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

আমি মনে করি, বাংলাদেশের এখন দক্ষ মানবসম্পদ কৌশল তৈরি করা প্রয়োজন। এটি শুধু প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। শিক্ষা, শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, যুব উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকার– সব মন্ত্রণালয়কে এ উদ্যোগে যুক্ত হতে হবে।

এই কৌশলের পাঁচটি ভিত্তি থাকতে পারে: ইংরেজি, জাপানি, কোরিয়ান, চায়নিজ, আরবিসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষার সম্প্রসারণ; আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ; এআই ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন; বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়নকে যুক্ত করা এবং বিদেশফেরত কর্মীদের উদ্যোক্তা ও প্রশিক্ষকে রূপান্তর।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রায়ই বিদেশে মানুষ পাঠানোর কথা বলি। কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। জাপানি কোম্পানিগুলো যদি বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, উৎপাদন ও সেবা খাতে বিনিয়োগ করে, তাহলে কর্মসংস্থান বাড়বে, উৎপাদনশীলতা উন্নত হবে এবং নতুন দক্ষতার চাহিদা সৃষ্টি হবে।

দেশের কয়েকটি এলাকায় পরীক্ষামূলক ‘জাপানে কর্মসংস্থান প্রকল্প’ চালু করা যেতে পারে। উপকূলীয় কলাপাড়ার মতো এলাকায় জাপানি ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা, এআই সচেতনতা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নকে একসঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। সফল হলে সেই মডেল দেশের অন্য অঞ্চলেও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন জনশক্তি তৈরি, যাদের জন্য দেশে ও বিদেশে সমান চাহিদা থাকবে। কারণ জাপানের জনসংখ্যা কমছে, আর বাংলাদেশ এখনও দক্ষতা ঘাটতির সঙ্গে লড়ছে। এ দুই বাস্তবতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। যদি আমরা সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারি, তাহলে সেই জনশক্তি দেশের শিল্প, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন শ্রমবাজারেও প্রতিযোগিতা করতে পারবে।

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য ছিল তৈরি পোশাক। আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি হতে পারে দক্ষ মানবসম্পদ। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় তার মানুষের সক্ষমতার মাধ্যমে। তাই বাংলাদেশের আগামী দিনগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হওয়া উচিত মানুষের ওপর।

মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন

আরও পড়ুন

×