ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার : ড. সেলিম রায়হান

রাজস্ব সংগ্রহের মূল বাধা অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক

রাজস্ব সংগ্রহের মূল বাধা অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক
×

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান। তিনি গবেষণা সংস্থা সানেম বা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালকেরও দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর শেষে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। বর্তমানে তিনি ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অনারারি সিনিয়র রিসার্চ ফেলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের সহকারী সম্পাদক সাইফুর রহমান তপন।

সমকাল: বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় সব সূচক যখন নিম্নগামী তখন ঘোষিত হলো নতুন বাজেট। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

সেলিম রায়হান: আমার পর্যবেক্ষণ হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি চক্রাকার (সাইক্লিক্যাল) সংকটের চেয়ে অনেক বেশি একটি কাঠামোগত (স্ট্রাকচারাল) সংকটের মুখোমুখি। বিভিন্ন গবেষণা, আলোচনা ও প্রতিবেদনে যে চিত্রগুলো উঠে আসছে–উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন বিনিয়োগ, রাজস্ব ঘাটতি, মুদ্রার বিনিময় মূল্যের চাপ, বেসরকারি খাতে 
ঋণপ্রবাহের স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের দুর্বলতা–এসবকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
গত এক দশকে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। সেই প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ এসেছে একক পণ্যনির্ভর রপ্তানি, রেমিট্যান্স, ভোগ ব্যয়, সরকারি অবকাঠামো ব্যয় এবং সহজলভ্য ঋণের ওপর নির্ভর করে। একই সময়ে কর-জিডিপি অনুপাত, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা প্রত্যাশিত মাত্রায় উন্নত হয়নি। ফলে বৈশ্বিক ধাক্কা, যেমন–কভিড-পরবর্তী সরবরাহ সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধজনিত জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, বৈশ্বিক সুদহার বৃদ্ধি, সাম্প্রতিক মধপ্রাচ্য যুদ্ধ– এসবের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়েছে।
আমার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, অর্থনীতির বিভিন্ন অংশে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বিনিয়োগকারী ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত, ভোক্তা মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন, ব্যাংক আমানতকারীদের মধ্যেও অনেক প্রশ্ন রয়েছে। অর্থনীতিতে আস্থা ক্ষয়ে গেলে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে পরিস্থিতি উন্নত করা যায় না। আমি এটিও বলব, বাংলাদেশ কোনো ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি নয়। আমাদের রপ্তানি খাত আছে, কৃষির ভিত্তি আছে, প্রবাসী আয় আছে, উদ্যোক্তা শ্রেণি আছে, উন্নয়নের অংশীদার হতে আগ্রহী শ্রমজীবী মানুষ আছে। প্রশ্ন হলো, এই শক্তিগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আমরা করতে পারব কিনা।

সমকাল: ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বাজেট এটি। আপনার অভিমত কী এ বিষয়ে?

সেলিম রায়হান: আমি মনে করি, বাজেটকে ‘পুনরুদ্ধারের বাজেট’ বলা হবে কিনা, তা বাজেটের আকার দিয়ে নয়; বরং তার বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে একটি প্রবণতা দেখা গেছে–বাজেটের আকার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাস্তবায়নের হার সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বাজেট একটি নীতিগত আকাঙ্ক্ষার দলিল হয়ে থাকে, বাস্তব কর্মপরিকল্পনার দলিল হয়ে ওঠে না।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের অর্থ কী? আমার মতে, এর অর্থ তিনটি বিষয়। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পুনরুজ্জীবিত করা। তৃতীয়ত, আর্থিক খাত ও রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনা। যদি বাজেটে এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকে, তাহলে একে পুনরুদ্ধারের বাজেট বলা যেতে পারে। তবে আমার উদ্বেগ হচ্ছে অর্থায়ন নিয়ে। যদি রাজস্ব সংগ্রহ প্রত্যাশামতো না হয় এবং বৈদেশিক অর্থায়নও সীমিত থাকে, তাহলে বড় বাজেট বাস্তবে বড় ঘাটতিতে পরিণত হতে পারে।
অনেক সময় বড় বাজেট অর্থনীতির শক্তির নয়, বরং অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপেরও প্রতীক হতে পারে। তাই আমি বাজেটের আকারের চেয়ে এর বিশ্বাসযোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দেব।

সমকাল: রাজস্ব আহরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রায় সর্বত্র। চলতি অর্থবছরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার পরও রাজস্ব ঘাটতি বিশাল। এরই মধ্যে এনবিআরকে সাত লাখ কোটি টাকা তোলার দায়িত্ব দেওয়া বিষয়ে আপনি কী মনে করেন? 

সেলিম রায়হান: আমি মনে করি, সাত লাখ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যকে শুধু সংখ্যার দিক থেকে বিচার করলে ভুল হবে। প্রথমে দেখতে হবে, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে কিনা। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা হলো, আমরা প্রায় প্রতিবছর উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করি। বাস্তব সংগ্রহ তার অনেক নিচে থাকে। ফলে বাজেট প্রণয়ন এবং বাজেট বাস্তবায়নের মধ্যে একটি বড় ফাঁক তৈরি হয়। এতে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও বিশ্বের নিম্নতমগুলোর মধ্যে একটি। অথচ সরকারের ব্যয় প্রয়োজন ক্রমাগত বাড়ছে। সুতরাং রাজস্ব বাড়ানোর বিকল্প নেই। প্রশ্ন হচ্ছে–কীভাবে?
আমি আশঙ্কা করি, যদি কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধু লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়, তাহলে প্রশাসন সহজ পথ বেছে নেবে। অর্থাৎ নতুন করদাতা খোঁজার পরিবর্তে যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের ওপর আরও চাপ বাড়বে। এতে ব্যবসার ব্যয় বাড়বে এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে।
আমার মতে, রাজস্ব সংগ্রহের মূল বাধা অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক অর্থনীতির। বহু উচ্চ আয়ের ব্যক্তি, বহু সম্পদশালী গোষ্ঠী এবং অর্থনীতির বড় অংশ এখনও কার্যকর কর ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। যতদিন পর্যন্ত এই বাস্তবতা পরিবর্তন না হবে, ততদিন শুধু লক্ষ্য বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
সমাধানের জন্য প্রয়োজন আয়কর জাল ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ, সম্পদভিত্তিক কর ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর অব্যাহতির যৌক্তিক পুনর্মূল্যায়ন, এনবিআরের আধুনিকায়ন ও স্বায়ত্তশাসন, তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসন এবং সর্বোপরি কর ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারের ধারণা প্রতিষ্ঠা।

সমকাল: বলা হয়, কামান চাইলে বন্দুক পাওয়া যায়; তাই বড় লক্ষ্যমাত্রা না নিলে রাজস্ব সংগ্রহ যতটা হয় ততটা সম্ভব হতো না। আপনি এ কৌশলকে কতটা বাস্তব মনে করেন? 

সেলিম রায়হান: এই যুক্তির মধ্যে কিছু সত্যতা রয়েছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় উচ্চ লক্ষ্য অনেক সময় কর্মদক্ষতা বাড়ায়। কারণ নিম্ন লক্ষ্য নির্ধারণ করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও ন্যূনতম প্রচেষ্টায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। এখানে লক্ষ্য শুধু অনুপ্রেরণার বিষয় নয়; এটি নীতিনির্ধারণ, ব্যয় পরিকল্পনা, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। যদি বারবার অবাস্তব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, তাহলে বাজেটের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক অংশীদার, বিনিয়োগকারী এবং বাজার–সবার কাছেই সরকারের পূর্বাভাস কম নির্ভরযোগ্য বলে মনে হতে পারে।
আরেকটি ঝুঁকি হলো, লক্ষ্য পূরণের চাপে প্রশাসন কখনও কখনও সহজে আদায়যোগ্য খাতগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে। এতে করব্যবস্থায় বৈষম্য তৈরি হয়। আমি বলব, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য প্রয়োজন। তা অবশ্যই তথ্যভিত্তিক এবং অর্জনযোগ্য হতে হবে। লক্ষ্য এমন হতে হবে, যা প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করবে, কিন্তু বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না।

সমকাল: বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের মতো বৈদেশিক ঋণ-অনুদান সংগ্রহও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। আপনি কি তার সঙ্গে একমত? 

সেলিম রায়হান: আমি একমত এবং আমার মতে, আগামী কয়েক বছরে এটি আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। অতীতে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ পেয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিবেশ এখন অনেক পরিবর্তিত। উন্নত দেশগুলো নিজেরাও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে উন্নয়ন সহায়তার প্রবাহ আগের মতো সহজ নয়।
এর পাশাপাশি একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদাররা এখন শুধু প্রকল্প নয়, প্রতিষ্ঠানও মূল্যায়ন করছে। তারা জানতে চায়–অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, কী ফলাফল আসছে, কী ধরনের জবাবদিহি রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ফলে নতুন ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো ঋণ ব্যবস্থাপনাও বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে।
আমি মনে করি, ভবিষ্যতের উন্নয়ন কৌশলে বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণকে প্রধান ভিত্তি করতে হবে। অন্যথায় ঋণনির্ভর উন্নয়ন দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সমকাল: মূল্যস্ফীতি কমার বদলে বাড়ছে। বিভিন্ন পরিষেবার দাম বাড়ার প্রভাব তার ওপর কী হতে পারে? আবার সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেলের দাবিও উপেক্ষা করতে পারছে না সরকার, জনগণের বিপুল অংশ এর বাইরে থাকায় তাদের ওপর এ পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রভাব নেতিবাচক হতে পারে। সরকার এ উভয় সংকট কীভাবে সামাল দিতে পারে?

সেলিম রায়হান: বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে উঠেছে। যখন বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অন্যান্য পরিষেবার মূল্য বাড়ে, তখন তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এগুলো উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়, পরিবহন ব্যয় বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় সব পণ্য ও সেবার মূল্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীদের দাবি পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এখানেই নীতিগত দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। যদি সরকার বড় আকারে বেতন বাড়ায়, তাহলে সরকারি ব্যয় বাড়বে। যদি সেই ব্যয় ঋণ বা ঘাটতি অর্থায়নের মাধ্যমে মেটানো হয়, তাহলে তা আবার মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
আমার মতে, সরকারকে এখানে লক্ষ্যভিত্তিক কৌশল নিতে হবে। সবার জন্য সমান হারে বেতন না বাড়িয়ে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সমন্বয় বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। মূলত সরকারকে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং আয়ের ক্ষয়পূরণের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।

সমকাল: মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য ব্যাংকঋণের সুদহার বাড়ল। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ অনেক কমে গেল। নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থানও স্থবির। কেউ কেউ এটিকে একটি দুষ্টচক্রের সঙ্গে তুলনা করছেন। আপনি কী মনে করেন? এ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?

সেলিম রায়হান: আমি মনে করি, বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকাংশে দুষ্টচক্র বলা যায়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সুদহার বাড়ানো হয়েছে। এতে ঋণের খরচ বেড়েছে। ঋণের খরচ বাড়ায় নতুন বিনিয়োগ কমেছে। বিনিয়োগ কমায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ধীর হয়েছে। কর্মসংস্থান দুর্বল হওয়ায় মানুষের আয় ও ভোগব্যয়ও চাপে পড়েছে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির একটি বড় অংশ শুধু অতিরিক্ত চাহিদার কারণে নয়। এর কারণ হলো সরবরাহ সংকট, ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয়, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতা। সুতরাং শুধু সুদহার বাড়িয়ে পুরো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আমি বলব, মুদ্রানীতি প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তা একা যথেষ্ট নয়। এখন প্রয়োজন ব্যাংক খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন নিশ্চিত করা, ব্যবসা পরিবেশ উন্নত করা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো। অন্যথায় আমরা এমন অবস্থায় পৌঁছাতে পারি, যেখানে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি কমবে না, আবার প্রবৃদ্ধিও দুর্বল থাকবে; যাকে অর্থনীতির ভাষায় ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বলা হয়।

সমকাল: বিশেষত ব্যাংক ও রাজস্ব খাত সংস্কার নিয়ে আলোচনা এখন সর্বত্র। বাজেটে এ নিয়ে কিছু প্রতিশ্রুতি আছে। ইতোমধ্যে নতুন সরকার তার ১০০ দিন পার করেছে। ওই সংস্কার করতে সরকার কতটা সক্ষম ও ইচ্ছুক বলে মনে করেন আপনি?

সেলিম রায়হান: আমার মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে এই দুটি খাত–ব্যাংক ও রাজস্ব–সংস্কারের ওপর। কারণ বাস্তবতা হলো, অর্থনীতির অনেক সমস্যা শেষ পর্যন্ত এসে এই দুই জায়গায় মিলিত হয়। রাজস্ব কম হলে সরকার ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়। ব্যাংক দুর্বল হলে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং মূল্যস্ফীতি সবকিছুই প্রভাবিত হয়।
প্রথম ১০০ দিনে কোনো সরকার থেকে মৌলিক পরিবর্তন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে এই সময়ের মধ্যে সংস্কারের দিকনির্দেশনা পরিষ্কার হওয়ার কথা। আমি মনে করি, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যা জ্ঞানের অভাব নয়। কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, তা বহু গবেষণা, কমিশন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে বহুবার উঠে এসেছে। আসল প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত সংস্কার করতে হলে বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে হবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। রাজস্ব খাতে সংস্কার করতে হলে কর অব্যাহতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে, প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোকে কর জালের আওতায় আনতে হবে এবং এনবিআরকে আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে।
এসব পদক্ষেপ প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন নয়; রাজনৈতিকভাবে কঠিন। তাই আমি বলব, সরকারের সক্ষমতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সরকারের সংস্কার বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সাহস। এই বাজেটে সরকারের নীতি, দর্শন, বরাদ্দ ও অর্থনীতির বিভিন্ন খাত নিয়ে তার পরিকল্পনা দেখে বোঝা যাবে সরকার কাঠামোগত পরিবর্তন চায়, নাকি শুধু সংকট ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায়।

সমকাল: আপনাকে ধন্যবাদ।

সেলিম রায়হান: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা। 

আরও পড়ুন

×