বিশ্বকাপ
পরিসংখ্যান বনাম বিস্ময়ের ফুটবল
হাসিনুর রহমান খান
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হওয়ার আগেই নানামুখী বিশ্লেষণ আমরা দেখেছি। পরিসংখ্যানেও দিচ্ছি বিভিন্ন বার্তা। বর্তমান র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে থাকা আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ব্রাজিল এবং পর্তুগালের মতো দলগুলো তাই স্বাভাবিকভাবেই শিরোপা দৌড়ে এগিয়ে থাকবে। ইতিহাস বলছে, সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন খুঁজতে হলে প্রথমেই নজর দিতে হবে এই শীর্ষ সারির দলগুলোর দিকে। কারণ গত ১৮টি বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, প্রায় ৮৪ শতাংশ চ্যাম্পিয়ন এসেছে শীর্ষ পাঁচ থেকে এবং প্রায় ৮৯ শতাংশ এসেছে শীর্ষ সাত থেকে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে অন্য কেউ চমক দেখাতে পারবে না। ২০২২ সালে খুব কম মানুষই মরক্কোর সেমিফাইনালে ওঠার কথা ভেবেছিল। ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার ফাইনালে ওঠাও ছিল অনেকের কল্পনার বাইরে। ২০১৪ সালে কোস্টারিকার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা ছিল আরেকটি বড় বিস্ময়। ফুটবল বারবার প্রমাণ করেছে–অসম্ভব বলে কিছু নেই।
ফুটবলকে প্রায়ই বলা হয় ‘অনিশ্চয়তার খেলা’। নব্বই মিনিটে যে কোনো কিছু ঘটতে পারে। দুর্বল দল শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দিতে পারে, অখ্যাত কোনো খেলোয়াড় রাতারাতি হয়ে উঠতে পারেন জাতীয় বীর। বিশ্বকাপের ইতিহাসও এমন অসংখ্য রূপকথা, নাটকীয়তা এবং বিস্ময়ের সাক্ষী। ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইংল্যান্ডের হার, ১৯৫৪ সালের ‘মিরাকল অব বার্ন’, ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিফাইনাল কিংবা ২০২২ সালে মরক্কোর সেমিফাইনালে ওঠা–এসব ঘটনাই ফুটবলকে বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় খেলায় পরিণত করেছে।
বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত ফিফা মেন’স ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিং চালু হয় ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে। ফলে তার আগের বিশ্বকাপগুলো বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ফুটবল গবেষকরা সাধারণত ‘ওয়ার্ল্ড ফুটবল এলো রেটিং’ সিস্টেম ব্যবহার করেন। আন্তর্জাতিক ম্যাচের ফলাফল, প্রতিপক্ষের শক্তি, ম্যাচের গুরুত্ব এবং জয়-পরাজয়ের ব্যবধান বিবেচনায় নেওয়া এই পদ্ধতিকে অনেক বিশেষজ্ঞ অতীতের দলগুলোর প্রকৃত সামর্থ্য পরিমাপের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন।
১৯৩০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যকার চারটি বিশ্বকাপের জন্য নির্ভরযোগ্য র্যাঙ্কিং তথ্য না থাকায় সেগুলো এই বিশ্লেষণের বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে ১৯৫৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ১৮টি বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলগুলোর টুর্নামেন্ট-পূর্ব এলো বা ফিফা র্যাঙ্কিং এই বিশ্লেষণের ভিত্তি। এই ১৮টি বিশ্বকাপের মধ্যে ১৫টি বা ৮৩.৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ন এসেছে টুর্নামেন্ট-পূর্ব শীর্ষ পাঁচ র্যাঙ্কধারী দলের মধ্য থেকে। শীর্ষ সাত দলের হিসাব ধরলে সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮.৮৯ শতাংশে, অর্থাৎ ১৮টির মধ্যে ১৬টি বিশ্বকাপ। বর্তমান ফিফা র্যাঙ্কিং অনুযায়ী শীর্ষ পাঁচটি দেশ হলো আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও ব্রাজিল। ফলে বলা যায়, এদের মধ্যকার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা ৮৩.৩৩ শতাংশ।
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল শুধু সর্বাধিক শিরোপাই জেতেনি, প্রতিটি বিশ্বকাপেও অংশগ্রহণ করেছে। ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালের শিরোপাগুলো হঠাৎ করে পাওয়া কোনো ঘটনা ছিল না; বরং ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগ, প্রতিভা বিকাশ এবং সমৃদ্ধ ফুটবল সংস্কৃতির ফল। ব্রাজিলের সে সময়ে র্যাঙ্কিং ছিল যথাক্রমে ২, ২, ১, ৩, ৩। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের ৮০ ভাগই ঘটেছে দুই এবং তিন র্যাঙ্কিং নিয়ে। তিনের বেশি র্যাঙ্কিং নিয়ে তারা কখনও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। সর্বশেষ ফিফা র্যাঙ্কিং অনুযায়ী ব্রাজিলের বর্তমান র্যাঙ্কিং ৫। বিরাট প্রশ্ন সামনে চলে আসে, এবারের বিশ্বকাপের মুকুট ব্রাজিলের কাছে কি তাহলে অধরাই থেকে যাচ্ছে?
জার্মানি চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ ও ২০১৪ সালে। সে সময়ে র্যাঙ্কিং ছিল যথাক্রমে ৩, ১, ৩, ২। তাদের সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা, যুব উন্নয়ন ব্যবস্থা এবং বড় টুর্নামেন্টে নিজেদের সেরা রূপ দেখানোর অসাধারণ সক্ষমতা। জার্মানির ক্ষেত্রেও ঘটেছে একই রকমের ঘটনা, অর্থাৎ তারাও তিনের বেশি র্যাঙ্কিং নিয়ে কখনও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। জার্মানির বর্তমান র্যাঙ্কিং ১০। র্যাঙ্কিংয়ের ভাগ্য বিশ্বাস করলে জার্মানিরও এবারের বিশ্বকাপ ছোঁয়া হচ্ছে না।
আর্জেন্টিনা ১৯৭৮, ১৯৮৬ এবং ২০২২ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে যথাক্রমে ৪, ৫, ৩ র্যাঙ্কিং নিয়ে। ম্যারাডোনা থেকে মেসি–দুই প্রজন্মের ফুটবলপ্রতিভা আর্জেন্টিনাকে ইতিহাসের অন্যতম সফল দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও একেবারেই শীর্ষ র্যাঙ্কিং এক কিংবা দুই নিয়ে আর্জেন্টিনা কখনও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়নি। সর্বশেষ ফিফা র্যাঙ্কিং অনুযায়ী আর্জেন্টিনা শীর্ষে অবস্থান করছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অতীতের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার র্যাঙ্কিংয়ের প্যাটার্ন অনুসরণ করলে আর্জেন্টিনা ২০২৬-এর বিশ্বকাপ কি নিতে পারবে? প্যাটার্ন বলছে, পারবে না।
ফ্রান্স ১৯৯৮ ও ২০১৮ সালের শিরোপা যখন নিয়েছিল তখন তাদের র্যাঙ্কিং ছিল বেশ নিচে, যথাক্রমে ৭ এবং ১৮। বর্তমানে ফ্রান্সের র্যাঙ্কিং ৩। অতীতে অনেক কম র্যাঙ্কিং নিয়েও ফ্রান্স দুবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছে। ফ্রান্সের শক্তিশালী স্কোয়াডের কথা মাথায় না রাখলেও শুধু র্যাঙ্কিংয়ের ভাগ্য বিশ্বাস করলে বর্তমান র্যাঙ্কিং নিয়ে ফ্রান্সের পক্ষে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া দৃশ্যত বেশ সহজ বলে মনে হবে।
ড. হাসিনুর রহমান খান: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান গবেষণা ও শিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- বিশ্বকাপ ফুটবল
