সংস্কার
সর্বজনীন শিক্ষার জন্য রাষ্ট্রের ভাবনা অত্যন্ত জরুরি
মামুনুর রশীদ
মামুনুর রশীদ
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৩ | আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ | ১২:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমি যে স্কুলে পড়েছি, সেখানে শ্রেণিকক্ষের বেষ্টনীটা ভাঙা ছিল, বাতাস ঢুকত। রাতের বেলায় সেখানে শিয়াল থাকত। ব্ল্যাকবোর্ডটা কোনো রকমে ঝুলিয়ে রাখা হতো। কিন্তু শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে ছিল পড়ালেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। মফস্বলের কোনো কোনো স্কুল থেকে তখন মেট্রিকে প্রথম থেকে দশম স্থান অধিকার করত। গ্রামের স্কুল থেকে ঢাকায় এসে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার কোনো সংকট ছিল না। পড়ালেখায় তেমন তারতম্যও লক্ষ্য করা যায়নি। ষাটের দশকের শেষের দিকে আংশিকভাবে এই ব্যবস্থায় চিড় ধরে। বিভিন্ন জাতীয় পরীক্ষায় দেখা যায় নকলের প্রকোপ। আবার শিক্ষক ও প্রশাসনকে এর বিরুদ্ধে খুব দৃঢ় অবস্থান নিতেও দেখা যায়।
এই সময়ের ছাত্র রাজনীতিতেও মেধাবী ছাত্রদের অংশগ্রহণ লক্ষণীয়। বিশ শতকের প্রথম থেকেই ছাত্রদের যদি জিজ্ঞাসা করা হতো, কেন পড়ালেখা করছ, উত্তর ছিল একটাই–দেশের কাজ করতে। এটিও দেখা গেছে যে, দেশের কাজ করতে গিয়ে ছাত্ররা বিভিন্ন লড়াই-সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে। জেল-জুলুম উপেক্ষা করে কখনও জেলখানায় বসেই পরীক্ষা দিয়ে কৃতী শিক্ষার্থী হিসেবে বেরিয়েছে। লেখাপড়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল অনাবিল আনন্দ এবং স্বপ্ন দেখার সুযোগ। সেই স্বপ্নের তাড়নায় এক সময় স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে স্বাধীন দেশের সংগ্রাম রচিত হয়। একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটা স্বাধীন ভূখণ্ড হিসেবে বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যায়। নতুন দেশের উপযোগী একটি শিক্ষাব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষাও তৈরি হয়। মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগের পাশাপাশি ড. কুদরাত-এ-খুদা কমিশন আত্মপ্রকাশ করে। দুঃখজনক হলো, এরপরে শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সবাই একেকটা শিক্ষা কমিশন ব্যবস্থা করে, সংবিধান পরিবর্তনের মতোই শিক্ষাব্যবস্থারও পরিবর্তন আনার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাক্রমকে হজম করতে না পেরে চিন্তায়, কর্মে এবং স্বপ্নে খণ্ডিত হয়ে পড়ে। সেই পুরোনো নকলের রোগ আবার ফিরে আসে। নকল প্রতিরোধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ে।
শুধু তাই নয়, এর পরেই আসে প্রশ্নপত্র ফাঁস। মেধাবী ছাত্রদের অক্লান্ত পরিশ্রম উপেক্ষিত হয়। ফাঁস করা প্রশ্নপত্রের জোরে খারাপ ছাত্ররা ভালো নম্বর পেয়ে ডিগ্রি পায় বটে; কার্যক্ষেত্রে তাদের অসারতা প্রমাণিত হয়। স্বাধীনতার পরে গজিয়ে ওঠে অসংখ্য স্কুল-কলেজ এবং পরবর্তীকালে শিক্ষা যখন বাণিজ্যে পরিণত হয়, তখন সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরে যায় দেশ। অর্থ দিয়ে ডিগ্রি কেনার প্রবণতাও দেখা যায়। এসব অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রয়োজন হয়। শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় থাকা প্রশাসনিক আমলা এবং শিক্ষা আমলাদের যোগসাজশে একটি চক্র নিয়োগ বাণিজ্য শুরু করে। এই ভয়াবহ নিয়োগ বাণিজ্যে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে শিক্ষকদের নিয়োগকর্ম অব্যাহত থাকে। বিষয়টি তলিয়ে না দেখে ওপর থেকে রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করে নানা ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়।
একটি দেশের সিলেবাস বা পাঠ্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর পেছনে শুধু বিশেষজ্ঞ বা শিক্ষকরাই নন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত থাকা প্রয়োজন। শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ দ্বারা এসব নিয়ন্ত্রিত হওয়া একেবারে উচিত নয়। শিক্ষাব্যবস্থা শুধু অধ্যাপক শাসিত হওয়াও উচিত নয়। অধ্যাপকরা সবাই একটা নিজস্ব গণ্ডির মধ্যে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। দেশের পূর্বাপর ইতিহাস, সমাজ গবেষণা এবং জীবনের কার্যকর ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রয়োজন মেটাবার প্রয়োজনেই সিলেবাস তৈরি হওয়া উচিত।

শিক্ষার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মন্ত্রণালয়টি দিনে দিনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিছু শিক্ষা আমলা এবং প্রশাসনিক আমলা বিষয়টির নিয়ন্ত্রক হয়ে পড়ছেন, যেখানে চিন্তাশীল ভাবনায় থাকা শিক্ষকরা একেবারে কোণঠাসা। যারা মন্ত্রণালয়ের কাছাকাছি যেতে পারেন এবং রাজনৈতিক নেতার আশীর্বাদপুষ্ট তারাই সর্বত্র ক্ষমতাসীন হয়ে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে যাওয়া দক্ষ ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরাই শিক্ষার প্রয়োজনকে অনুভব করেন এবং সেইভাবে সরকার নয়, রাষ্ট্রের কাছে কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করে থাকেন। শিক্ষা এখন পর্যন্ত নাগরিকের অধিকার হয়ে দাঁড়ায়নি, রয়ে গেছে সুযোগের কাতারে। একটি হলিউডের সিনেমায় দেখেছিলাম দরিদ্র ছাত্ররা পরিবহনের ব্যবস্থা না থাকায় স্কুলে যেতে পারছে না। বিষয়টা সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়, যার রায়ে ছাত্রদের পরিবহনের অভাব একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হয়। আমাদের দেশে টয়লেটের অভাবে বহু ছাত্রী স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে। পরে টয়লেটের ব্যবস্থা হলেও সেটির স্থান নির্বাচনে স্কুল কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ স্থানে কোনো কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দেয়নি।
স্কুলে খেলার মাঠ থাকবে, আমরা ছোটবেলায়ও দেখেছি সেটি এক অবারিত ভালোবাসার জায়গা। কিন্তু বাণিজ্যপ্রেমী স্কুল কর্তৃপক্ষদের অধীনে ঢাকা শহরে খেলার মাঠটি সংকুচিত, সেসব জায়গায় গড়ে উঠেছে বহুমুখী দালানকোঠা। দালান ও দোকানের চাপে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অধিকাংশই থাকেন কোচিং নিয়ে ব্যস্ত। অভিভাবকরা ব্যস্ত শুধু নিজেদের সন্তান নিয়ে আর রাজনীতিক, আমলা, মন্ত্রী তাদের সন্তানরা এ দেশে শিক্ষা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। অভিভাবকদের মধ্যে যারা একটু সচ্ছল তারা সন্তানদের বিদেশে পাঠানোর স্বপ্নে মগ্ন। আর যাদের সচ্ছলতা নেই, তারা ঘরবাড়ি বিক্রি করে সন্তানদের বিদেশে পাঠানোর চেষ্টায় দিনরাত কাটাচ্ছেন।
আমার বিশ্বাস এ দেশে অনেক চিন্তাশীল মানুষ আছেন, যাদের শিক্ষা সম্পর্কে বহু সুনির্দিষ্ট ভাবনাচিন্তা আছে। তাদের সেই ভাবনাকে মূল স্রোতে নিয়ে আসার কোনো উদ্যোগ নেই। আমলারা যেমন সব কিছুই বেশি বোঝেন, তেমনি রাজনীতিবিদরাও নিজের দলীয় চিন্তার বাইরে কিছু ভাবতে অক্ষম। কিন্তু শিক্ষা সর্বজনীন, এ জন্য রাষ্ট্রের ভাবনাটা অত্যন্ত জরুরি। দুঃখজনক হলেও রাষ্ট্র সবসময়ই সরকারের অধীন। রাষ্ট্রকে আমরা মানবিকও করতে পারিনি। তাই শিক্ষাব্যবস্থাটাও মানবিক হয়ে ওঠেনি। সব কিছুতেই ঢুকে পড়েছে অর্থ উপার্জন। প্রশ্নপত্র নির্মাণ-যাচাই থেকে শুরু করে খাতা দেখা পর্যন্ত শিক্ষকদের অর্থ আয় হয়। উচ্চতর পর্যায়ের শিক্ষকরা তদারকির জন্যও প্রচুর অর্থ পেয়ে থাকেন। অর্থ উপার্জন দোষের কিছু না। কিন্তু অর্থ উপার্জনের পথ বেয়ে চলে আসে দুর্নীতি। তাই শিক্ষাব্যবস্থা একটা দুর্নীতির ঘেরাটোপের মধ্যে আটকে আছে। এই ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। সংশ্লিষ্ট উচ্চতর ব্যক্তিবর্গ বিষয়গুলোকে তাড়াহুড়ো না করে ঠান্ডা মাথায় সমাধান করবেন বলে আশা করি।
মামুনুর রশীদ: নাট্য ব্যক্তিত্ব
- বিষয় :
- মামুনুর রশীদ
- শিক্ষা
