ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

অধিকার

মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার ও স্বাধীনতা

মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার ও স্বাধীনতা
×

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ | ১২:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন সংস্কারের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। একটি কার্যকর ও স্বাধীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। ফলে বর্তমান সংস্কার উদ্যোগকে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের মানবাধিকার কাঠামো পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কমিশনকে অধিক কার্যকর করার লক্ষ্যে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। তবে সরকার পরিবর্তনের পর সেটি জাতীয় সংসদে অনুমোদন পায়নি। একই সময়ে বর্তমান সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন সংশোধন অথবা নতুন আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার করেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে–বাংলাদেশ কী ধরনের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চায়?

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার দেড় দশকের বেশি সময় পরও প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার লঙ্ঘন, শ্রম অধিকারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার ইস্যুতে কমিশনের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত ও প্রতিক্রিয়াশীল বলে সমালোচিত হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে অনেক সময় পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা হিসেবে নয়, বরং সীমিত ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পরামর্শমূলক কাঠামো হিসেবে দেখা হয়েছে। এই দুর্বলতা শুধু প্রশাসনিক নয়; বরং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির কাঠামোগত ঘাটতিরও প্রতিফলন।

এই প্রেক্ষাপটে কমিশন আইন সংস্কারের উদ্যোগ শুধু আইনি পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং এটি একটি স্বাধীন, কার্যকর এবং জনআস্থাভিত্তিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বড় সুযোগ।
একটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মৌলিক দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন পর্যবেক্ষণ, নিরপেক্ষভাবে অভিযোগ তদন্ত এবং রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা করা। বাস্তবে বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশন দীর্ঘদিন ধরেই নানা কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করছে। সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকা, সীমিত তদন্ত ক্ষমতা, পর্যাপ্ত জনবল ও আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন–সব মিলিয়ে কমিশনের কার্যকারিতা প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। 

এ কারণে সংস্কার আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। যে প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করবে, সেটিকে অবশ্যই নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত রাখা প্রয়োজন। নিয়োগ, বাজেট, জনবল নিয়ন্ত্রণ কিংবা কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

জাতিসংঘের প্যারিস প্রিন্সিপলস জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। এই নীতিমালার আলোকে স্বাধীনতা, বহুমাত্রিক প্রতিনিধিত্ব, পর্যাপ্ত সম্পদ, বিস্তৃত ম্যান্ডেট এবং কার্যকর তদন্ত ক্ষমতা একটি শক্তিশালী কমিশনের মৌলিক শর্ত। তাই বাংলাদেশের কমিশন সংস্কারের যে কোনো উদ্যোগকে এসব মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি।
আইন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এ বিষয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভা করেছে, যা অনুষ্ঠিত হয় ২০২৬ সালের ১৭ মে। অংশগ্রহণমূলক আইন প্রণয়নের দিক থেকে এই উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে এই প্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা প্রয়োজন বলে মত রয়েছে। বিশেষ করে অভিজ্ঞ নাগরিক সমাজের পাশাপাশি তরুণ মানবাধিকার কর্মীদেরও আলোচনায় যুক্ত করা গেলে সংস্কার প্রক্রিয়া আরও বাস্তবভিত্তিক ও ভবিষ্যৎমুখী হতে পারত। 

মানসম্মত কাঠামো ও প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এখনও জাতিসংঘ স্বীকৃত গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অব ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনসের মূল্যায়নে ‘এ’ স্ট্যাটাস অর্জন করতে পারেনি; বরং ‘বি’ স্ট্যাটাসেই অবস্থান করছে। এটি কেবল একটি শ্রেণিবিন্যাস নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা, কার্যকারিতা এবং জবাবদিহিমূলক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সূচক। একটি শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কমিশন গঠন করা গেলে এই অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব, যা দেশের ভাবমূর্তিকেও আরও সুদৃঢ় করবে। 
এ ক্ষেত্রে কমিশনের তদন্ত ক্ষমতা বৃদ্ধিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে তলব করা, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ, কারাগার ও আটক কেন্দ্র পরিদর্শন এবং স্বাধীন অনুসন্ধান পরিচালনার পূর্ণ ক্ষমতা কমিশনের হাতে থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা না থাকলে কমিশনের প্রভাব সীমিত থেকে যাবে।
কমিশনে নিয়োগ প্রক্রিয়াও সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা এবং বহুমাত্রিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। মানবাধিকার, আইন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, নারী অধিকার, শ্রম অধিকার এবং সংখ্যালঘু অধিকারের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে পারে।

এ ছাড়া মনে রাখা প্রয়োজন, মানবাধিকার কমিশনের কাজ কেবল অভিযোগ তদন্তে সীমাবদ্ধ নয়। মানবাধিকার শিক্ষা, গবেষণা, নীতি পর্যালোচনা, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা উন্নয়নেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আধুনিক একটি কমিশন প্রতিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও কার্যকর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি নাগরিক অধিকার সুরক্ষার একটি অপরিহার্য প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন সংস্কারের উদ্যোগ তাই অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। তবে সংস্কারের লক্ষ্য কেবল কাঠামোগত পরিবর্তন হওয়া উচিত নয়; বরং এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম, জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, যা সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং আইনগত ক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা এবং জনআস্থার ভিত্তিতে মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হতে পারে। 

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকারকর্মী  

আরও পড়ুন

×