ভারত
মহাকাশে বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের কার্যকর মঞ্চ
গুরজিৎ সিং
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
অন্য অনেক মহাকাশ কর্মসূচি স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে উদ্ভূত হলেও, ভারতের মহাকাশ কর্মসূচি পরিকল্পিত হয়েছিল জাতীয় উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে। ড. বিক্রম সারাভাই ভারতের মহাকাশ ভাবনার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এমন সব ব্যবহারিক বিষয়ের ওপর, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে উন্নত করে। তাঁর নেতৃত্বে যোগাযোগব্যবস্থা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও শিক্ষাকে শক্তিশালী করার জন্য স্যাটেলাইট তৈরি করা হয়েছিল। এই উন্নয়নমুখী দর্শন ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও রয়েছে এবং সেটি গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর প্রয়োজনের সঙ্গেও গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
চন্দ্রযান মিশনগুলো, মার্স অরবিটার মিশন, আদিত্য-এল১ সৌর পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ও আসন্ন গগনযান মানব মহাকাশযান কর্মসূচির পর ভারত এখন অত্যাধুনিক ও নির্ভরযোগ্য মহাকাশ অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে চন্দ্রযান ৩-এর সফল সফট ল্যান্ডিং ভারতকে বিশ্বের মহাকাশ শক্তিগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ স্থান দিয়েছে এবং এটিও প্রমাণ করেছে যে, তুলনামূলক স্বল্প খরচেও বিশ্বমানের উদ্ভাবন সম্ভব।
বিশ্বের মহাকাশ অর্থনীতির আকার বর্তমানে ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, তা ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ১.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানোরে পূর্বাভাস আছে। স্যাটেলাইট যোগাযোগ, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, নেভিগেশন, জলবায়ু পরিষেবা, ব্রডব্যান্ড সংযোগ এবং ইন-অরবিট সার্ভিসিং ও চন্দ্র অনুসন্ধানের মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক কার্যক্রম এতে ভূমিকা রাখছে। অনেক দেশই এতে অংশ নিতে চায়, কিন্তু তাদের নিজস্ব সক্ষমতার অভাব রয়েছে। কেবল উৎক্ষেপক নয়, তারা নির্ভরযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার খুঁজছে।
এই চাহিদাগুলো পূরণ করার ক্ষমতা ভারতের আছে। ২০২০ সালে বেসরকারি অংশগ্রহণের জন্য এই খাত উন্মুক্ত হওয়ায় তা সমগ্র মহাকাশ ইকোসিস্টেমকে বদলে দিয়েছে। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল স্পেস প্রমোশন অ্যান্ড অথরাইজেশন সেন্টারের (ইন-স্পেস) প্রতিষ্ঠা, নিউস্পেস ইন্ডিয়া লিমিটেডের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক ভূমিকা এবং বেসরকারি উদ্যোগগুলোর বিকাশ লাভ বিশ্বের অন্যতম গতিশীল উদীয়মান মহাকাশ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে। ভারতীয় স্টার্টআপগুলো উৎক্ষেপণ যান, স্যাটেলাইট প্ল্যাটফর্ম, জিওস্পেশিয়াল অ্যাপ্লিকেশনগুলো ও প্রপালশন প্রযুক্তির উন্নয়ন সাধন করছে, যা বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও গ্রাহকদের আকৃষ্ট করছে। স্কাইরুট অ্যারোস্পেস, পিক্সেল ও অগ্নিকুল কসমসের মতো সংস্থাগুলো প্রমাণ করেছে, উন্নত মহাকাশ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারতীয় বেসরকারি উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম।
সাউথ এশিয়া স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোকে যোগাযোগ ও উন্নয়নমূলক সুবিধা প্রদান করেছে। ভারতীয় উৎক্ষেপণ যানগুলো বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর জন্য শত শত বিদেশি স্যাটেলাইটকে সফলভাবে কক্ষপথে স্থাপন করেছে। আর্টেমিস অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ভারতের সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে চাঁদ অনুসন্ধানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ভারতের আগ্রহের প্রতিফলন ঘটেছে।
এই অংশীদারিত্বগুলো গ্লোবাল সাউথের একটি নেতৃস্থানীয় কণ্ঠস্বর হিসেবে ভারতের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করে। মহাকাশ সহযোগিতা ভারতীয় কূটনীতির একটি ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি বাস্তব ও দৃশ্যমান উন্নয়নমূলক সুবিধাগুলোও প্রদান করছে।
এর পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য সংস্কারের গতিধারা অব্যাহত রাখাকে লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করবে ভারত। দ্রুততর নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, ভেঞ্চার ক্যাপিটালের ক্ষেত্রে বৃহত্তর প্রবেশাধিকার, সুদৃঢ় মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত ও শিক্ষাঙ্গনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতর সহযোগিতা অপরিহার্য হবে। সরকারি ক্রয়নীতিগুলো ভারতীয় স্টার্টআপগুলোকে অব্যাহতভাবে সমর্থন দিয়ে যাবে, যা তাদের কার্যক্রমের পরিসর বৃদ্ধি করতে, উদ্ভাবন করতে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে একীভূত হতে সক্ষম করবে।
মহাকাশ পরিচালনা ও শাসনব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারত আরও বড় ভূমিকা পালনের অবস্থানে রয়েছে। কক্ষপথে ভিড়, মহাকাশে আবর্জনা, সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং উদীয়মান মহাকাশ সুযোগগুলোয় ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার ক্রমেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জরুরি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। মহাকাশ কার্যক্রম বাড়ানোর সঙ্গে সংগতি রেখে দায়িত্বশীল নীতি ও চর্চার বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তুলতে সক্ষম দেশগুলোর প্রয়োজনও বাড়বে। মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের প্রতি ভারতের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার এবং ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একত্রে দেশটিকে স্বচ্ছতা, স্থায়িত্ব ও ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকারকে উৎসাহিত করে এমন বিধি প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে অর্থবহ অবদান রাখার সক্ষমতা প্রদান করেছে।
মহাকাশে কোন দেশগুলো নেতৃত্ব দেবে তার সঙ্গে মহাকাশ কীভাবে পরিচালিত হবে সেটিও আগামী দশকে ঠিক হবে। বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা, উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেম ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার কারণে প্রতিষ্ঠিত ও উদীয়মান মহাকাশ শক্তিগুলোর মধ্যে ব্যবধান দূর করার ক্ষেত্রে ভারত এক অনন্য অবস্থানে রয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলকতা, পারস্পরিক কল্যাণ ও উদ্ভাবনের ভিত্তিতে সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে ভারত তার মহাকাশ কর্মসূচিকে বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার একটি প্রধান স্তম্ভে রূপান্তর করতে পারে। এটিই হয়তো মানবজাতির পরবর্তী অগ্রযাত্রায় ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অবদান হয়ে উঠবে।
গুরজিৎ সিং: ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও লেখক
- বিষয় :
- ভারত