ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

অধিকার

স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের আকাঙ্ক্ষা অপূরিতই থাকবে?

স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের আকাঙ্ক্ষা অপূরিতই থাকবে?
×

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অনেক প্রত্যাশার মধ্যে এটিও ছিল যে, বাংলাদেশে এমন একটি মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠিত হবে, যা সরকারের প্রভাবমুক্ত থেকে রাষ্ট্রের যে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারবে। বিগত সময়ে সংঘটিত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর এ প্রত্যাশা জোরালো হয়েছিল। এই বাস্তবতায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬-এর নতুন খসড়া গত ১০ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদে পাস হয়েছে। কিন্তু বিলটি পর্যালোচনা করলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে; কমিশনকে কি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও কার্যকর করা হচ্ছে, নাকি পুরোনো কাঠামোর কিছু সীমাবদ্ধতাকেই নতুন আইনের মধ্যে পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে?  

খসড়ার একটি ইতিবাচক দিক হলো, বিলটির ১৩, ১৫ ও ৩২ ধারার থেকে বোঝা যায়, কমিশন নিজস্ব ব্যবস্থায় অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে। কিন্তু অভিযোগটি যদি কোনো আইনশৃঙ্খলা বা শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর বিরুদ্ধে হয়, তখন কমিশনের সেই স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা কার্যত থেমে যাচ্ছে। খসড়ার ১৯(১) ধারা অনুযায়ী, এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশনকে প্রথমে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছেই প্রতিবেদন চাইতে হবে। অর্থাৎ যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রাথমিকভাবে সেই প্রতিষ্ঠানকেই অভিযোগের বিষয়ে নিজের বক্তব্য ও তদন্তের ফল জানাতে বলা হচ্ছে।

মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি করে। অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দায়িত্ব কি কখনও অভিযোগের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করা যায়?
ধরা যাক, সেই বাহিনী একটি প্রতিবেদন দিল, যা কমিশনের কাছে সন্তোষজনক নয়। তাহলেও সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন তদন্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং ১৯(৩)(খ) অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ করতে হবে। এখানেই আইনের কাঠামোটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিস্ময়করভাবে, ১৯(২) ধারায় অভিযুক্ত বাহিনীকে প্রথম প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। অথচ সময় এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি, নথিপত্র, আলামত, ভিডিও ফুটেজ কিংবা অন্যান্য প্রমাণ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে। একটি অভিযোগের বিষয়ে মাসের পর মাস প্রতিবেদন না এলে ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের সম্ভাবনাও দুর্বল হতে থাকে।

বলা হয়েছে, কমিশন সেই প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট না হলে তাকে প্রথমে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ করতে হবে। এরপর ৪৫ দিনের মধ্যে বাহিনী কী ব্যবস্থা নিয়েছে তা জানাবে। সেই ব্যবস্থা সন্তোষজনক না হলে কমিশন পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারবে। কিন্তু কমিশন অসন্তুষ্ট হবে কীসের ভিত্তিতে? স্বাধীন তদন্তের সুযোগ যদি শুরুতেই না থাকে, তাহলে কমিশনের হাতে এমন স্বাধীনভাবে সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ থাকবে কীভাবে, যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর দেওয়া প্রতিবেদন মিলিয়ে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব? 

এখানে আইনের একটি মৌলিক দুর্বলতা স্পষ্ট। একটি কার্যকর মানবাধিকার কমিশনের কাজ শুধু অভিযোগ গ্রহণ করা বা সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া নয়। তার কাজ হলো অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা, প্রমাণ সংগ্রহ করা, সাক্ষীদের বক্তব্য নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রীয় সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা।

বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে এই স্বাধীনতার প্রয়োজন আরও বেশি। কারণ অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছে ঘটনাস্থল, নথি, সদস্যদের পরিচয়, দায়িত্বসংক্রান্ত তথ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংরক্ষিত থাকে। সেই প্রতিষ্ঠানকেই যদি প্রাথমিক তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীর অবস্থান কোথায়? তিনি কি স্বাধীন তদন্তের দাবি করতে পারবেন? কমিশন কি নিজস্ব উদ্যোগে সাক্ষী হাজির করতে, নথি সংগ্রহ করতে বা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে পারবে? অভিযোগকারী যদি সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত না হন, তাহলে তার কার্যকর প্রতিকার কী?

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা শুধু তদন্তের ক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কমিশনের সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক কাঠামো, আর্থিক স্বাধীনতা এবং সরকারের সঙ্গে এর প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক–সবকিছু মিলেই একটি কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তাই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত নতুন আইন প্রণয়ন শুধু একটি প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের মানবাধিকার সুরক্ষার ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণের প্রশ্ন। 

সুতরাং সংসদে আইনটি চূড়ান্তভাবে পাস করার আগে ১৯ ধারাসহ সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা ও শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশনের নিজস্ব স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। যদি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানই প্রথমে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করে, আর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন শুধু সেই তদন্তের প্রতিবেদন দেখে সুপারিশ করে; তাহলে আমরা একটি স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গড়ে তুলছি না।  

এমন কমিশন প্রয়োজন, যে কমিশন রাষ্ট্রের অনুমতির অপেক্ষায় নয়, আইনের ক্ষমতাবলে মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে পারে। নতুন আইন সেই নিশ্চয়তা দিতে না পারলে, এটি সংস্কারের সুযোগের চেয়ে আরেকটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। 

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকার কর্মী 
 

আরও পড়ুন

×