চারদিক
দুর্ভাগা নাগরিক
আতাতুর্ক কামাল পাশা
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
এত ছোট বিষয় নিয়ে লিখতে হবে ভাবতেই বিস্ময় লাগছে। বহুদিন আগে আমার এক সাংবাদিক বন্ধুর উত্তর শাজাহানপুরের বাসায় যাচ্ছিলাম। হঠাৎ রাস্তার পাশের চারতলা একটি বাড়ি থেকে দেখলাম প্লাস্টিকের একটি পোঁটলা এসে পড়ল আমার গায়ে। পোঁটলাটি ফেটে তার ভেতর থেকে বাড়ির আবর্জনা আমার শার্ট ময়লা করে দিল, দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। ওপরে তাকালাম। গ্রিলের ওপর পর্দা টেনে দিয়ে দ্রুত একজনকে সরে যেতে দেখলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেড়ে আসা বন্ধুটির বাসায় সেদিনই প্রথম যাচ্ছিলাম ঢাকায়। কী রকম ক্রোধ যে লাগছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বন্ধুটি আজ নেই, আল্লাহর কাছে চলে গেছে।
তবে ইদানীং এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। সেদিন আমার ভাতিজার মোটরসাইকেলের পেছনে বসে ছিলাম। চলতে চলতে হঠাৎ সে ওপরের দিকে তাকাল–বলল, আমের খোসা ওপর থেকে ফেলেছে, তার হাতে শার্টের ওপর পড়েছে। বললাম, বাদ দাও, চলো। কয়েক দিন আগে বাসার কাছাকাছি একটি গলি দিয়ে মেইন রোডে উঠছিলাম, হঠাৎ সামনে দুজন মেয়ের ভেতর একজন দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলছিল, এগুলো বাড়িতে কীভাবে থাকতে হয় জানেন না তো এসব বাড়িতে থাকেন কেন? যারা ওপর থেকে তরকারির ময়লা ফেলেছিল, তারা নিঃসন্দেহে শুনছিল, কথা বলছিল না।
সম্প্রতি আমার সামনে দিয়ে যাওয়া এক অটোরিকশাচালক হঠাৎ থেমে পাশের খোলা দরজায় কাঠের কাজ করা দুটি মিস্ত্রিকে বলে উঠল, দেখেন, এই টাইলসের টুকরাটি আমার পায়ে লেগে ভেঙে গেছে, এটা যদি আমার মাথায় পড়ত, তাহলে কী অবস্থা হতো!
ওপর তলায় থাকলে গ্রিল দিয়ে বাইরে বা সড়কে, নিচে কিছু ফেলা যথেষ্ট অন্যায়, ভদ্রতার বাইরে, নিয়ম নেই। এটি কে কাকে শেখাবে! আজকের দিনে মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত মানুষের ব্যবধান প্রায় ঘুচেই গেছে। নগরে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে বা আবাসন কোম্পানিগুলোর দ্বারা নগরের সামান্য স্থানেও বহুতল বাড়ি লকলকিয়ে মাথা তুলছে। ওপর থেকে বাইরে রাস্তার ওপর কিছু ফেলা যাবে না, এমন কথাটুকুও নতুন ভাড়াটেদের বলে, সাবধান করে দেওয়ার আগ্রহ দেখায় না। যারা ওপরে গিয়ে ওঠে, তারাও ড্যাম কেয়ার ভাব দেখায়। এটি যে আদৌ নাগরিক দায়িত্ববোধের মধ্যে পড়ে না, তা ওদের কে বোঝাবে? অনেক সময় এটি দুর্ঘটনাও ঘটাতে পারে, তাও অনেকে ভেবে দেখার অবকাশ পায় না। আমরা কি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, নাকি পেছনের দিকে হাঁটছি? আমাদের নাগরিক অধিকার যেমন ভোগ করছি, তেমনটি নাগরিক দায়িত্ব পালন করছি কি?
কিছুদিন সাংবাদিকতা সূত্রে দেশের বাইরে থাকতে হয়েছিল। একদিন আমাদের দেশের মতো করে পাটায় নোড়া নিয়ে গোশত রান্নার জন্য শুকনো মরিচ গুঁড়া করছি। কী কারণে যেন বস আমাদের ওই ভাড়া বাসায় এসেছিলেন। তিনি আমাদের ওইভাবে মরিচ পেষা দেখে তাড়াতাড়ি তার ঘর থেকে একটি মোটা পাটের বস্তা (ছালা) আমাদের এনে দিয়ে পাটাটি তার ওপর বিছিয়ে মরিচ বাটতে বললেন। পরদিন কারখানায় এক সময় আমাদের সবাইকে ডাক দিয়ে বললেন, তোমরা যদি তোমাদের মতো করেই কোনো কিছু না বিছিয়ে কাজ করতে তাহলে নিচের তলায় প্রচুর শব্দ হতো। এ দেশের মানুষরা সহজে কাউকে কিছু বলে না। তারা থানায় বলে দেয়। মালয়েশিয়ায় সিভিল পুলিশ দেখেছি। জনপদে বা আবাসিক এলাকায় কেউ বাড়ির আবর্জনা ফেলে তাতে আগুন ধরিয়ে দিলে কোথা থেকে যেন, কীভাবে খবর পায় বুঝতে পারি না, সিভিল পুলিশ এসে হাজির।
আমাদের দেশে এসব ভাবা যায় না। আইন আছে। প্রয়োগ নেই। দেখার কেউ নেই। মানুষও অভিযোগের জন্য থানায় যায় না। কারণ তারাও জানে, খাজনার চেয়ে অধিকাংশ সময় বাজনা বেশি হয়।
আতাতুর্ক কামাল পাশা: সাংবাদিক
- বিষয় :
- চারদিক