বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
অপসারণের ব্যর্থ অপপ্রয়াস
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কতিপয় সেনা কর্মকর্তার হস্তে তিনি পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। শোকাবহ এই দিবসে আমরা তিনিসহ নিহত সকলকে শ্রদ্ধাসহকারে স্মরণ করি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দিবসটি তৃতীয়বারের ন্যায় পালিত হইতেছে ভিন্ন আবহে। আমরা গভীর উদ্বেগের সহিত দেখিয়াছি, অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের নির্লিপ্ততা, উস্কানি, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পৃষ্ঠপোষকতায় বঙ্গবন্ধুর বাসগৃহ ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ভবনটিসহ তাঁহার সকল স্মৃতি ও স্মারক ধ্বংস করিয়া ফেলা হইয়াছে। কিন্তু ইতিমধ্যে ইহা স্পষ্ট হইয়াছে যে, বাংলাদেশের ইতিহাস হইতে বঙ্গবন্ধুকে অপসারণের অপপ্রয়াস ব্যর্থই হইতে থাকিবে। বরঞ্চ, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর যত দিন যাইতেছে দলের পরিবর্তে দেশের নেতা হিসাবেই বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হইয়া উঠিতেছে।
বিস্ময় ও বেদনার বিষয়, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকালে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য ও বাণী ব্যাপকভাবে ব্যবহার করিয়া, গণঅভ্যুত্থানের পর তাঁহারই স্মৃতি ও স্মারকে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হইয়াছে! এইরূপ অবিমৃষ্যকারিতা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে নিঃসন্দেহে বিক্ষুব্ধ করিয়াছে। বস্তুত প্রবল সমালোচকদেরও স্বীকার করিতে হইবে যে, ব্রিটিশ উপনিবেশ হইতে মুক্তিপ্রাপ্ত হইলেও পাকিস্তানি প্রায়-ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলে আটকা এই ভূখণ্ডের মানুষকে মুক্তি দিয়াছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ইহাও সত্য, তাঁহাকে হত্যা করিয়াছে তাঁহারই প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশেরই কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্য। তবে এই নৃশংসতার হোতারা যে শেষাবধি ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হইয়াছে, উহাতে সন্দেহ নাই। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পরও বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস হইতে মুছিয়া ফেলিবার অপপ্রয়াস চালানো হইয়াছে; কিন্তু সকলই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইয়াছে। আমরা মনে করি, ইহার কারণ জনগণের অধিকার আদায়ে তাঁহার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন। শৈশবেই তিনি নিজেকে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যুক্ত করেন, এক দিনেরও জন্য সেই ব্রত হইতে বিচ্যুত হন নাই। তাঁহার নেতৃত্বে এই জাতির স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন প্রথমে স্বাধিকার এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপান্তরিত হইয়াছিল। এই কারণেই দেশের সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রামেই তিনি অন্যতম প্রেরণাস্বরূপ থাকিয়া গিয়াছেন।
ইহা সত্য, নিজেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক হিসাবে দাবি করিলেও আওয়ামী লীগ বিশেষত বিগত দেড় দশক যাবৎ উক্ত আদর্শ ও চেতনাবিরোধী নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করিয়াছে। মানুষের ভোটাধিকার হরণসহ বহু রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার সংকুচিত করিয়াছিল। বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের দলীয়করণের পাশাপাশি দুর্নীতি-অনিয়মের বিস্তার ঘটাইয়াছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেও এই সকল অপশাসন-দুঃশাসন আড়াল করিবার কর্মে ব্যবহার করিয়াছে। ইহাও স্বীকার্য, ক্ষমতাচ্যুতির পূর্ব পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে এমনভাবে কুক্ষিগত করিয়া রাখিয়াছিল যে, লুটেরা ও চাটুকারদের ভিড় ঠেলিয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে শ্রদ্ধা জানানো কঠিন ছিল। এমনকি ১৫ আগস্ট শোক প্রকাশের নামে জবরদস্তির সংস্কৃতিও দেখা গিয়াছিল। কিন্তু এই সকল কিছুর দায় কোনোক্রমেই এই মহান নেতার উপর বর্তায় না।
আমরা মনে করি, শেখ হাসিনার সরকারের অপকর্মের দায় বঙ্গবন্ধুর উপর চাপাইয়া দিবার অভিসন্ধি এই দেশে সফল হইবে না। বিশেষত, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ছয় মাস পর যেইভাবে বুলডোজার চালাইয়া ভবনটি গুঁড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে, উহার কারণ ও কর্তাদের বাংলাদেশের মানুষ শনাক্ত করিতে সক্ষম হইয়াছে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রযোজিত অপপ্রয়াসও পূর্বেরগুলির ন্যায় ব্যর্থ হইতে বাধ্য। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিয়া মানুষের শোক ও শ্রদ্ধা আটকাইয়া রাখিবার অপচেষ্টা কেবল বাংলাদেশে নহে, বিশ্বজুড়িয়াই ব্যর্থ হইয়াছে। আজকে যাহারা বঙ্গবন্ধুর প্রতি জনসাধারণের শোক প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করিতে চাহেন, তাহাদেরও ইতিহাসের অমোঘ সত্যটি স্মরণে রাখা কর্তব্য।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়