শ্রদ্ধাঞ্জলি
তোফায়েল আহমেদের বিদায়ের রাজনৈতিক বার্তা
সাইফুর রহমান তপন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:২৩ | আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
চলে গেলেন কিংবদন্তি ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগে রাজধানীর এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ জুন সোমবার চিরবিদায় নিলেন তিনি। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মেছিলেন তিনি। সে হিসাবে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৮৩ বছর। এই ছাত্রনেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, মন্ত্রী, ৯ বারের এমপি, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী ও উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন দীর্ঘকাল।
তোফায়েল আহমেদ মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স ‘বিএলএফ’ বাহিনীর চার প্রধানের একজন ছিলেন। তবে ছাত্রনেতা হিসেবে যে খ্যাতি তিনি পেয়েছিলেন, সেটাই যেন আর সব পরিচয়কে ছাপিয়ে জনমনে জ্বলজ্বল করছে।
১৯৬৮-৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি হিসেবে তিনি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন। সে সুবাদে পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সংঘটিত ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান মুখে পরিণত হন। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমান কারামুক্ত হওয়ার পর তাঁকে পরদিন পল্টন ময়দানে ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে বিপুল সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সে জনসভায় তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এ ঘটনাকে তিনি বরাবরই তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা বলে মনে করতেন।
আমার জীবনের সিকি শতাব্দী রাজনীতিতে কেটেছে। স্কুলজীবন থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিবাদ-বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করলেও ১৯৮০-এর দশকের মধ্যভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হই। রাষ্ট্র-সমাজের আমূল রূপান্তরে বিশ্বাসী বাম রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, যেসব ছাত্রনেতার অনন্য কীর্তিগাথা শুনে আমরা ছাত্র রাজনীতিতে আগ্রহী হয়েছিলাম, তাদের অন্যতম তোফায়েল আহমেদ। ২০২৩ সালে মারা গেছেন আরেক কিংবদন্তি ছাত্রনেতা এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রধান বিরোধী দল জাসদের প্রতিষ্ঠাতা ও তাত্ত্বিক গুরু সিরাজুল আলম খান। ষাটের দশকে তাঁকে বলা হতো ছাত্রনেতাদের নেতা।
আমার সাবেক নেতাদের কাছে শুনেছি, সিরাজুল আলম খান কীভাবে বিশেষত তোফায়েল আহমেদকে তৎকালীন ইকবাল হল, আজকের জহুরুল হক হলের কোনো এক কক্ষে দরজা বন্ধ করে বক্তৃতার প্র্যাকটিস করাতেন। সেই গল্প শুনতে গিয়ে পুরো ঘটনা যেন আমাদের চোখের সামনে পুনঃমঞ্চস্থ হতো। আমরাও যেন সেই ষাটের দশকের শেষভাগের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে চলে যেতাম।
আমার বাবার বয়স এখন ৮৬। ষাটের দশকের গোড়ায় চাকরির সুবাদে ঢাকায় এসে থিতু হন তিনি। তখনকার ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল তাঁর। পল্টন ময়দানের অসংখ্য জনসভার স্মৃতি জমা তাঁর মস্তিষ্কে। তিনি বলেছেন, তোফায়েল আহমেদ যখন বক্তব্য রাখতেন তখন যেন শব্দ নয়, আগুনের ফুলকি বের হতো মুখ দিয়ে। সেই আগুনের আঁচ আমিও কিছুটা পেয়েছি আশির দশকজুড়ে চলা সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে। নব্বই-পরবর্তী জাতীয় সংসদের অধিবেশনও জমে উঠত তোফায়েল আহমেদের অলংকার মেশানো সুসংবদ্ধ ভাষণে।
বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের জন্য কারাগার হলো ‘শ্বশুরবাড়ি’। মাঝেমধ্যেই যেখানে যেতে হয় তাদের। তোফায়েল আহমেদও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ৩৩ মাস তিনি কারাবন্দি থাকেন। রাজনৈতিক কারণে তিনি আরও অন্তত সাতবার কারাবরণ করেন।
প্রশ্ন জাগে, স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধিকার; স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে এত যার অবদান; স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রায় প্রতিটা গণতান্ত্রিক সংগ্রামে যার ভূমিকা অন্য কারও চেয়ে কম ছিল না, সেই তোফায়েল আহমেদ কি যথেষ্ট প্রতিদান পেয়েছিলেন?
প্রথমেই আসা যাক দলের কথায়। বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় দলের সংস্কার চাওয়ার ‘অপরাধে’ ২০০৯ সালে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদ হারান তিনি। বলা যায়, তখন থেকেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে নানা টানাপোড়েনের কারণে আওয়ামী লীগের মধ্যে কোণঠাসা হয়ে পড়েন তিনি।

সত্য– তোফায়েল আহমেদ প্রতিটা নির্বাচনেই মনোনয়ন পেয়েছেন। এমনকি পরিবারের লোকদেরও মনোনয়ন নিশ্চিত করতে পেরেছেন। তবে দলের নীতি নির্ধারণে দীর্ঘ সময় যে জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি; সে সুযোগ জীবনের অন্তত শেষ এক দশক তিনি পাননি। তোফায়েল আহমেদের মতো অভিজ্ঞ নেতাদের কোণঠাসা করার ফল ভালোও হয়নি ৭৭ বছর বয়সী দলটির জন্য।
আমরা দেখেছি, কীভাবে প্রধানত পারিবারিক ও আত্মীয় কোটায় অভিষিক্ত নতুন নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দল ও সরকারে দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের ভিড় বাড়ে। অন্যদিকে, দূরে সরে যায় দলের মূল ভিত্তি তৃণমূলের খেটে খাওয়া নেতাকর্মী। জুলাই গণঅভ্যুত্থান যার চূড়ান্ত পরিণতি। দলটির নেতাকর্মীর একাংশ নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব আওড়ালেও এর পরিস্থিতি যে দলের মধ্য থেকেই তৈরি হয়েছে– সেটা স্বীকারও করেন।
তোফায়েল আহমেদরা যে প্রজন্মের রাজনীতিক, সে প্রজন্ম প্রধানত জনগণের ওপর নির্ভর করেই বেড়ে উঠেছিল। এমনকি জীবন ধারণের জন্য রাজনীতির বাইরে যেতে হয়নি তাদের। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগে তাদের উত্তরসূরি প্রায় সবাই হয় পেশাদার ব্যবসায়ী, নয় কমিশনভোগী। বিশেষত রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে যা মারাত্মক স্বার্থের দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। গোটা বিষয়কে একবাক্যে বলা যায়– তোফায়েল আহমেদরা করেছেন ত্যাগের রাজনীতি, আর এখন চলছে ভোগের রাজনীতি। এ কারণেই ২০২১ সালে তোফায়েল আহমেদ ঘোষণা দিতে পেরেছিলেন, তিনি তাঁর সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি তোফায়েল আহমেদ ফাউন্ডেশনে দান করবেন। প্রতিষ্ঠানটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম ও বৃত্তির ব্যবস্থা করে (ডেইলি স্টার, ১ জুন ২০২৬)।
রাষ্ট্রও কি এ জাতির এই সূর্যসন্তানকে প্রাপ্য সম্মান দিয়ে বিদায় দিতে পেরেছে? দীর্ঘদিনের রেওয়াজ ভেঙে সাম্প্রতিক সময়ে মৃত্যুবরণকারী আওয়ামী লীগের অন্যসব সংসদ সদস্যের মতো তোফায়েল আহমেদের জানাজাও সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় হতে দেওয়া হলো না। পরিবারকে চাপ দিয়ে ১ জুনই ধানমন্ডির এক মসজিদে তড়িঘড়ি এক জানাজার ব্যবস্থা করা হলো, যে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছিল আরেক আওয়ামী লীগ নেতা ষাটের দশকের অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর মৃত্যুর পর। এ কারণে এ আজন্ম রাজনীতিকদের অসংখ্য সুহৃদ প্রিয় নেতাদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধাও জানাতে পারেননি। উপরন্তু ধানমন্ডির ওই জানাজা শেষে মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি জয় বাংলা স্লোগান দেওয়ায় লাঠিপেটা চলল।
ভোলার জানাজায়ও সরকারি দল বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল। শেষ পর্যন্ত বিএনপিরই একটা অংশ সুবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে নির্বিঘ্নে তা হতে দিয়ে প্রশংসার প্রাপ্য হয়েছে, বলতে হবে। সেখানে তোফায়েল আহমেদের প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মানের ব্যবস্থা করায় সরকারও ধন্যবাদ পেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, যখনই সুযোগ পাচ্ছে, অনেকটা বিনা প্রচারেই হাজার হাজার মানুষ আওয়ামী লীগ নেতাদের জানাজায় শরিক হচ্ছেন। ড. ইউনূসের জনবিচ্ছিন্ন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে এ জনবার্তা বোঝা সম্ভব ছিল না। তাই ফ্যাসিবাদী বা ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে একের পর এক আওয়ামী লীগ নেতাকে মৃত্যুর পরও তারা অসম্মান করেছে। কিন্তু একটা জনসম্পৃক্ত দল হিসেবে বিএনপিকে তা বুঝতে হবে। নয়তো একসময় তাদের এর জন্য বড় বেশি মূল্য চুকাতে হতে পারে।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- সাইফুর রহমান তপন
