লোডশেডিং
বিদ্যুতের আলোতেও বৈষম্যের অন্ধকার গ্রামে
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ১০ জুন ২০২৬ | ০৯:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
শহরে থেকে বোঝার উপায় নেই, বিদ্যুৎ নিয়ে গ্রামে কী চলছে। গ্রামে গেলেই সেখানকার করুণ বাস্তবতা বোঝা যায়। সম্প্রতি ঈদুল আজহায় বাড়িতে গিয়ে আমার মতো অনেকেই বিদ্যুতের ভোগান্তির কথা সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন। এর মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির যে উন্নতি হয়নি– জাতীয় সংসদের আলোচনাই তার প্রমাণ। রোববার বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনই জেরার মুখে পড়েন বিদ্যুৎমন্ত্রী। সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেন, গ্রামাঞ্চলে ১০-১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে; মন্ত্রী তা নাকচ করে দিয়েছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের বক্তব্য, দেশে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই। যা হচ্ছে তা মূলত সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট। অথচ মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনও বলছে– সরকারি হিসাবে লোডশেডিং কম; গ্রামে ভোগান্তির জীবন। সরকার যদি স্বীকারই না করে, তবে সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে? তীব্র গরমে দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার পরও কেন সরকার তা স্বীকার করছে না?
সমকালের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বিভিন্ন এলাকার পরিস্থিতি উল্লেখ করা হয়েছে। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় গ্রাহকরা অভিযোগ করেছেন, সেখানে দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে রোববার রাত ১০টা থেকে সোমবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত ১৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৩ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ ছিল না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। জয়পুরহাটের কালাই পৌর শহর ও আশপাশ এলাকায় গত রোববার রাত ৮টা ৯ মিনিটে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে টানা ৭ ঘণ্টা ৮ মিনিট পর পুনরায় চালু হয়। গত সপ্তাহেই বিদ্যুৎ বিতরণে শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করার দাবি জানিয়েছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব।
বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, অনেক জায়গায় ঝড়বৃষ্টিতে গাছ পড়ে লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, রক্ষণাবেক্ষণে কত সময় প্রয়োজন হয়? ২৩ মার্চ ঈদুল ফিতরে গ্রামের বিদ্যুতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সমকাল অনলাইনে লিখেছিলাম: অবহেলিত গ্রাম, বিদ্যুৎ তথৈবচ। সেখানে বিদ্যুৎহীন ২০ ঘণ্টার কথা উল্লেখ করেছি। শহরে যেখানে বিদ্যুৎ লাইনে কোনো সমস্যা হলে ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে ঠিক করা হয়; গ্রামে সে সমস্যা মেরামতে এত সময় লাগার কারণ কী?
এবারের ঈদুল আজহায় বাড়িতে গিয়ে প্রায় একই ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেখানে ঝড়বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ২৬ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ এসেছে। ঈদের আগের দিন দুপুরে বিদ্যুৎ গিয়ে এসেছে ঈদের দিন বেলা ৩টার পর। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ছাড়াই আমাদের ঈদের রাত, ঈদের নামাজ এবং পশু কোরবানি সম্পন্ন করতে হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ মানুষেরই মোবাইলের চার্জ শেষ হওয়াসহ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য ইলেকট্রিক ডিভাইস বা যন্ত্রও বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় ইন্টারনেট তো দূরস্থ। কোরবানির গোশত সংরক্ষণে সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন। কেউ কেউ শহরে গোশত পাঠানোর ব্যবস্থাও করছিলেন; এরপরই বিদ্যুৎ আসে।
বিদ্যুতের দিক থেকে গ্রামের মানুষ কতটা বৈষম্যের শিকার, এটি তার একটা উদাহরণ। ঈদেই যেখানে এই অবস্থা, সেখানে গ্রামের মানুষের কোন উপলক্ষকে গুরুত্ব দেবে বিদ্যুৎ বিভাগ? ঈদের সময়ে শহরে প্রায় সব সরকারি-বেসরকারি অফিস ও আদালত যখন বন্ধ থাকে, তখন শহরে তো বটেই, বিদ্যুতের সামগ্রিক চাহিদা অনেক কমে যায়। তাই গ্রামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা কঠিন হওয়ার কথা নয়। এই সময়ে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সেবার জন্য সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কোম্পানির যথেষ্ট লোকবলও থাকার কথা। গ্রামে ঝড়তুফানে বিদ্যুতের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কেন মেরামত করা হবে না? গ্রামের মানুষের সঙ্গে কেন বিমাতাসুলভ আচরণ করা হবে? সামান্য ঝড়বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ফিরতে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগার বিষয়টি কি বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চলবে? গ্রামে মানসম্মত ও আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। পল্লী বিদ্যুতের জনবল কিন্তু কম নয়। পল্লী বিদ্যুৎ দেশের অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব পালন করলেও অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জনবল সংকট, ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা এবং নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে গ্রামীণ গ্রাহকরা বিদ্যুতায়নের সুফল পাচ্ছেন না। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চরম অব্যবস্থাপনার কথা কি বিদ্যুৎমন্ত্রী জানেন না?
এ বছর তীব্র তাপদাহের আশঙ্কা করা হচ্ছে, এমন গরমে শহরের মানুষের স্বস্তির জন্য যখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে, সেখানে গ্রাম কেন বাদ পড়বে? শহরে এসিসহ স্বস্তিদায়ক আধুনিক সব সরঞ্জাম থাকে। অথচ শহরের মানুষের সাধারণ ফ্যান চালানোর পরিস্থিতিও থাকে না। প্রচণ্ড গরমে গ্রামের মানুষ কীভাবে ৬/৭ ঘণ্টা কিংবা আরও বেশি বিদ্যুৎ ছাড়া থাকছে? সরকারের উচিত হবে লোডশেডিং দিলে গ্রাম-শহর উভয় এলাকায় সমানভাগে ভাগ করে দেওয়া। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একবার প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে সরকারের এমন সিদ্ধান্তের কথা বলেও ছিলেন। কিন্তু বাস্তবায়নের বেলায় সব লবডঙ্কা। শহরে সরকারি নীতিনির্ধারক ও কর্মকর্তারা যখন দু-এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মধ্যে থাকবে তখনই গ্রামের মানুষের বেদনা বুঝতে পারবে।
গ্রাম-শহরের উন্নয়ন বৈষম্যের জ্বলন্ত উদাহরণ হলো বিদ্যুৎ। গত কয়েক দশকে গ্রামে অসংখ্য গবাদি পশু ও মুরগির খামার গড়ে উঠেছে, জিডিপিতে যাদের অবদান কম নয়। ঘন ঘন লোডশেডিং, ভোল্টেজের ওঠানামা এবং সেবার অনিশ্চয়তা চলতে থাকলে সেসব শিল্পই বা বাঁচবে কী করে? দেশের মোট জনসংখ্যার অধিকাংশই যেখানে গ্রামে বাস করেন, সেখানে তাদের চিন্তা সরকারকে করতেই হবে। টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যুৎ সরবরাহে এই বৈষম্য দূর করা জরুরি। উন্নয়নের আলো কেবল শহরকেন্দ্রিক না হয়ে গ্রাম পর্যন্ত সমানভাবে পৌঁছালেই উন্নয়নের সুফল সবাই পাবে।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল [email protected]
- বিষয় :
- লোডশেডিং
- মাহফুজুর রহমান মানিক
- বিদ্যুৎ