ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

উচ্চশিক্ষা

এত ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ লইয়া আমরা কী করিব

এত ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ লইয়া আমরা কী করিব
×

মাহফুজুর রহমান মানিক

মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ | ১০:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত খবর সংগত কারণেই ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরে খবরটির ব্যাখ্যা দিয়েছে। খবর যা-ই হোক, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের সতর্কতার বিকল্প নেই। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কম নয়; সেগুলো প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হয়েছে– সেই প্রশ্নও উঠছে। সেই অর্থে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ই যেখানে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হয়ে উঠতে পারেনি এবং এগুলো লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে, তখন যত্রতত্র নতুন বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি উচ্চশিক্ষার সংকট আরও বাড়াবে।
খবরে এসেছিল, দেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, শিক্ষামন্ত্রী সরাসরি এমন বক্তব্য দেননি। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ীই, সংবাদটি বিভ্রান্তিকর হলেও ভিত্তিহীন নয়। 

সম্প্রতি ইউনিসেফের কর্মশালায় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন প্রায় আট মিনিটের বক্তব্য দিয়েছেন। বক্তব্যের মধ্যে ছয় মিনিটের ঠিক আগে আসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গ। আরেকজনের বক্তব্য ছিল, আমরা সকল সংসদীয় আসনেই ইউনিভার্সিটি চাইছি। তার প্রেক্ষিতে মন্ত্রী বলেছেন ‘হ্যাঁ, সেটাও সত্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় দরকার, আবার আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ও দরকার।’ মন্ত্রীর এই 
বক্তব্যকে অবশ্য সরকারের পরিকল্পনা হিসেবে হাজির করা যায় না। 

তবে শিক্ষামন্ত্রীর ব্যাখ্যা নিয়ে কথা আছে। সেখানে তিনি বলেছেন– ‘মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ তাদের এলাকায় হাই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ নিয়ে আসেন। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুপারিশ করেন না।’ আমাদের বক্তব্য হলো, এমপিদের সুপারিশ আমলে নিয়েই যেন অপরিকল্পিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা না হয়। দেশে ইতোমধ্যে যত বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সেগুলোতে মানসম্পন্ন পড়াশোনা নিয়ে উদ্বেগের কমতি নেই। বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পড়াশোনার মান, অবকাঠামো, শিক্ষকসহ যেসব প্রয়োজন রয়েছে, তা নতুন সৃষ্টি হওয়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই নেই। এরই মধ্যে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করার ক্ষেত্রে ভেবেচিন্তেই সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ– শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান। এখনই প্রতিবছর ছয়-সাত লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। অথচ তাদের তেমন কর্মসংস্থান নেই। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হলে শিক্ষিত বেকারের মিছিল আরও দীর্ঘ হবে।

এমপিরা সুপারিশ করলেই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হবে কেন? বরং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সব পূর্বশর্ত পূরণ করতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞান বিতরণ করে না; নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে। তার জন্য চাহিদানুযায়ী অবকাঠামো ও জনবল প্রয়োজন। জনবল মানে কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়; মানসম্পন্ন গবেষক, যা বর্তমানে দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই নেই। নামকাওয়াস্তে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী থাকায় কোনো উপকারিতা নেই, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় মাত্র। 

এর আগে জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের নামে অনেক অপরিকল্পিত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। গত বছরের জানুয়ারিতে ‘জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়: উচ্চশিক্ষার আত্মাহুতি’ শীর্ষক বক্তৃতায় ইউজিসির তৎকালীন সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেছিলেন, ২১টি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় ভাড়া বাড়িতে। একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে অবকাঠামো নেই; শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৬০০; কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় ৩০০; শিক্ষক ১০৪ জন; ২৪টি বিভাগ। অথচ শিক্ষকদের বসার পর্যাপ্ত জায়গা নেই, গ্রন্থাগার নেই। এমনকি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। 

এখন নতুন করে যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আলোচনা উঠেছে, তখন অনেকেই আশঙ্কা করেছেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে দলীয়করণ, অনিয়ম, দুর্নীতি সবই হবে, কিন্তু ‘শিক্ষা’ থাকবে অধরা। গত ৬ জুন ‘পাবলিক বনাম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্কের উদ্দেশ্য কী?’ শিরোনামে সমকালে প্রকাশিত নিবন্ধে মাহবুবুর রাজ্জাক লিখেছেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনকে ‘রাজনীতিকরা বলেন উন্নয়ন। অথচ শিক্ষক নেই, গবেষণাগার নেই, লাইব্রেরি নেই। তবে পলিটিকস আছে। মারামারি আছে। এই সুযোগে শিক্ষক হিসেবে চাকরি বাগিয়ে নিচ্ছেন ক্ষমতাসীনদের আত্মীয়স্বজন ও দলীয় লোকজন।’ একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান তৈরির প্রতিষ্ঠান না হয়ে গড়ে উঠেছে সনদ বিতরণের কেন্দ্র হিসেবে।

সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে– ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ লইয়া আমরা কী করিব। বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই যেখানে ঠিকমতো চলছে না, সেখানে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ভেবেচিন্তেই করতে হবে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে শিক্ষার্থীরা তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন করছিলেন। তখন আমি লিখেছি– ভাবিয়া করিও বিশ্ববিদ্যালয় (সমকাল, ২০ নভেম্বর ২০২৪)। সংসদ সদস্য, আমলা কিংবা শিক্ষার্থীরা চাইলেই সরকার নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে পারে না। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের চাইতে সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মানসম্মত করা। সেগুলোর স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি, গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দলীয়করণ থেকেও রেহাই দিতে হবে। যদিও আগের সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকার সেই সদিচ্ছা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের অন্যান্য সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে, যেখানে পরিকল্পতিভাবে নতুন বিষয়গুলো যুক্ত না করে হুটহাট সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর আগে পাঠক্রম উন্নয়ন ও সংস্কারের নামে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম হয়নি। সেই ধারা বাদ দিয়ে এখন জরুরি পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে কিংবা চটকদার সিদ্ধান্ত দিয়ে আর যা-ই হোক; শিক্ষার কতটা উপকার হবে? 
বস্তুত বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণ ও সংখ্যাগত বিষয়ে বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তের বদলে এখন জরুরি পরিকল্পিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ। সে জন্য দাবি উঠেছে, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সংস্কারে কমিশন গঠন করা হোক। সেটা শিক্ষার বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বাতলে দেবে। এরপর সে অনুযায়ী শিক্ষার সর্বস্তরে সংস্কার হবে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাও তার বাইরে থাকবে না।

মাহফুজুর রহমান মানিক: 
জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×