ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

দিবস

প্রাণী সুরক্ষার অঙ্গীকার

প্রাণী সুরক্ষার অঙ্গীকার
×
×

মো. মামুন হাসান

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাণীরা মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে না। কিন্তু ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ভয়, ব্যথা, নিরাপত্তা ও স্বস্তির প্রয়োজন তাদেরও আছে। মানুষের সঙ্গে তাদের পার্থক্য থাকলেও অনুভূতির জগতে অনেক মিল রয়েছে। সেই উপলব্ধি থেকেই ৪ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব প্রাণী দিবস।

বিশ্ব প্রাণী দিবসের ইতিহাস শতাব্দীপ্রাচীন। ১৯২৫ সালের ২৪ মার্চ জার্মানির বার্লিনে প্রথমবার এ দিবস পালিত হয়। জার্মান লেখক ও প্রাণী রক্ষাকর্মী হেইনরিখ জিমারম্যান ছিলেন এর অন্যতম উদ্যোক্তা। পরে ১৯৩১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ৪ অক্টোবরকে বিশ্ব প্রাণী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
প্রকৃতিতে কোনো প্রাণীই অপ্রয়োজনীয় নয়। ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ থেকে হাতি– সবাই কোনো না কোনোভাবে খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। একটি প্রজাতি হারিয়ে গেলে শুধু একটি প্রাণী কমে যায় না; এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো পরিবেশ ব্যবস্থায়।

বাংলাদেশের বন ও বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্যও কম নয়।
বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১২১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৬৯০ প্রজাতির পাখি, ১৫৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৫৩ প্রজাতির উভচর রয়েছে। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে পাঁচটি ও সরীসৃপের মধ্যে ১৯টি সামুদ্রিক প্রজাতি। পাখির ৩৮০টি আবাসিক, ২০৯টি শীতকালীন পরিযায়ী, ১১টি গ্রীষ্মকালীন পরিযায়ী এবং ৮৮টি ভ্রাম্যমাণ। কিন্তু প্রজাতির সংখ্যা থাকলেই তাদের নিরাপদ বলা যায় না। আবাসস্থল ধ্বংস, বন উজাড়, দূষণ, অবৈধ শিকার ও বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী-জলাভূমির পরিবর্তন, মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত– সব মিলিয়ে অনেক প্রজাতির টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)-এর ২০১৫ সালের রেড লিস্ট অনুযায়ী, মূল্যায়ন করা এক হাজার ৬১৯টি প্রাণী প্রজাতির মধ্যে ৩৯০টি বা ২৪ শতাংশ বিপন্ন। এর মধ্যে ৫৬টি মহাবিপন্ন, ১৮১টি বিপন্ন এবং ১৫৩টি ঝুঁকিপূর্ণ। ৩১টি প্রজাতি আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হিসেবে চিহ্নিত। একসময় বাংলাদেশে পাওয়া একশৃঙ্গ গণ্ডার ও জাভা গণ্ডারের মতো প্রাণীও এখন দেশের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেছে।

তবে সংরক্ষণে আশার জায়গাও আছে। কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যানে সাম্প্রতিক গবেষণায় মহাবিপন্ন মেঘলা চিতা ও এশীয় হাতির উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার তথ্য এসেছে। এসব উপস্থিতি দেখায়, উপযুক্ত আবাসস্থল ও কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকলে বিপন্ন প্রাণীর টিকে থাকার সুযোগ রয়েছে।
প্রাণীর কল্যাণের সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যও গভীরভাবে যুক্ত। মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ– তিনটি আলাদা জগৎ নয়; তারা পরস্পর সম্পর্কিত। জলাতঙ্ক এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। একইভাবে প্রাণিসম্পদ খাতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ২০২৬ সালে ‘ভেটেরিনারি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ গাইডলাইন’ প্রকাশ করেছে।

তাই প্রাণীর প্রতি দায়িত্ব শুধু বন বা চিড়িয়াখানার নয়। নগর পরিকল্পনায় পথপ্রাণীর নিরাপত্তা, সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণে বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ, জলাভূমি ও বন রক্ষা এবং খামারে প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণের সুযোগ– এসব বিষয়ও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
পথপ্রাণীকে অযথা আঘাত না করা; পোষা প্রাণীর যথাযথ যত্ন নেওয়া; বন্যপ্রাণী কেনাবেচা ও অবৈধভাবে আটকে রাখা থেকে বিরত থাকা; প্লাস্টিক ও বর্জ্য যেখানে সেখানে না ফেলা এবং বন-জলাভূমির আবাসস্থল রক্ষায় সচেতন হওয়া– ছোট ছোট এসব আচরণই বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে।
পৃথিবী শুধু মানুষের নয়। বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ টিকে থাকলে টিকে থাকবে বন, নদী, জলাভূমি ও জীবনের স্বাভাবিক ভারসাম্য। বিশ্ব প্রাণী দিবস তাই শুধু একটি দিবস পালনের উপলক্ষ নয়। এটি নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে দেখার সুযোগ। অন্তত একবার প্রাণীর চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখার চেষ্টা করা যাক। তখন হয়তো আরও স্পষ্ট হবে প্রকৃতিকে বাঁচানো মানে শুধু প্রাণীকে রক্ষা নয়; নিজেদের ভবিষ্যৎকেও নিরাপদ করা।

মো. মামুন হাসান: সিনিয়র তথ্য অফিসার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়
 

আরও পড়ুন

×