ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ফ্রান্সে বিক্ষোভের গোড়ার কারণ

ফ্রান্সে বিক্ষোভের গোড়ার কারণ
×
×

নিকোলাস বেকুলিন

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্যারিসের শহরতলি ক্রিতেইয়ের লিসে সাঁ-এক্সুপেরি নামে একটি সুবিধাবঞ্চিত উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। কারণ ছিল তাদের প্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ অবস্থা। শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অভাব, জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং শিক্ষার গুণগত মানের ক্রমাগত পতন। দুই সপ্তাহের মধ্যে সেই আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে। অভিভাবক, শিক্ষক ও শ্রমিক ইউনিয়নের সমর্থনে শত শত স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এ আন্দোলনে যোগ দেন। মঙ্গলবার এই আন্দোলনের তৃতীয় সপ্তাহে পা দিয়ে ফ্রান্সজুড়ে এক লাখ ৬০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ও ইউনিয়নকর্মী বিক্ষোভ করেছেন।

প্রধানত হাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত কোনো আন্দোলনে ফ্রান্স আগে কখনও এত বেশি সহিংস ঘটনা দেখেনি। এ পর্যন্ত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া সংঘর্ষে ২০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী, ৮৫ জন স্কুলকর্মী এবং ৭০০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্কুলে ঢুকে পড়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ঘেরাও করা বা দখলে থাকা ভবনে আগুনও ধরিয়ে দিয়েছে। ৫ অক্টোবর উত্তর ফ্রান্সের লেন্স শহরে বিক্ষোভকালে পুলিশের ছোড়া গ্রেনেডে ১৫ বছরের এক কিশোরের হাত উড়ে যায়। এ ঘটনা কর্তৃপক্ষের সেই চরম কঠোর মনোভাব স্পষ্ট করে, যা তারা আন্দোলন শুরুর দিনগুলো থেকে গ্রহণ করেছিল। আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছয় হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। অবশ্য পরবর্তী সময়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ যে ডানঘেঁষা, ওপর থেকে নিচে চাপিয়ে দেওয়া শাসননীতির প্রতিনিধিত্ব করেন; সেই মাখোঁবাদের প্রায় এক দশক পর এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটল। আন্দোলনটি মূলত গভীর অসন্তোষের প্রকাশ। স্কুলের গুণগত মানের বৈষম্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সিদ্ধান্ত এবং প্রচ্ছন্ন বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে কাজ করছে এমন এক অনুভূতি– ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা তাদের কথা শুনছেন না এবং এই দেশ তাদের ভবিষ্যতের জন্য খুব সামান্য আশা জোগাতে পারছে।

দেশটিতে রাজনৈতিক আস্থার যে ব্যাপক সংকট তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই এ বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে। ২০২৭ সালের এপ্রিলে ফ্রান্সে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জনমত জরিপগুলোতে সুদূর-ডান ও সুদূর-বামপন্থি দলগুলো এগিয়ে রয়েছে। এই দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন মারিন ল্য পেন। তিনি বছরের পর বছর তাঁর সুদূর-ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র‍্যালিকে ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে কাজ করছেন; যেখানে তাঁর প্রচারণার মূল হাতিয়ার অভিবাসন, অপরাধ এবং গণবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির তীব্র সমালোচনা। তাঁর দল এরই মধ্যে পার্লামেন্টের বৃহত্তম বিরোধী দল এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর আগাম সংসদীয় নির্বাচন তাদের অবস্থান আরও শক্ত ভিত দিতে পারে।

অন্যদিকে রয়েছেন সুদূর-বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবোডের নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ, যিনি মেহনতি মানুষের কাছে ক্ষমতা ও সম্পদের ব্যাপক পুনর্বণ্টনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। উভয়েই মূলত বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরোধিতা, বাজেট সংকটকে সহজেই উধাও করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি গভীর বিদ্বেষের ওপর ভর করে তাদের জনপ্রিয়তা তৈরি করেছেন। ফ্রান্সকে আজ যদি কোনো চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় মনে হয়, তবে সেটি সত্যি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একটি বিশাল কল্যাণকামী ও নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রের যে এক মডেল গড়ে উঠেছিল, যা পরিচালিত হতো অর্থনীতিকে আধুনিকায়ন, বাজার শক্তিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সর্বজনীন কল্যাণ নির্ধারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক দল সরকারি কর্মচারী দিয়ে, তা এখন তার মেয়াদ শেষ করেছে।

১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের মূল কথাই ছিল অভিজাত ও যাজক শ্রেণির বিশেষ সুযোগ-সুবিধার বিলোপ সাধন। প্রায় আড়াই শতাব্দী পর, ফরাসি সমাজে সেই বিশেষ সুবিধা এখনও গভীরভাবে প্রোথিত। তবে তা এখন প্রায় জাতপ্রথার মতো বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাগত গোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে—সাংবাদিক, আইনজীবী ও বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারী ও ইউনিয়নভুক্ত শ্রমিক পর্যন্ত, যাদের প্রত্যেকের নিজস্ব সুবিধা, সুরক্ষা, পেনশন ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর দাবি রয়েছে। এর ফলে এমন এক রাজনীতির জন্ম হয়েছে, যেখানে সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন– সংস্কার জরুরি, তবে শর্ত থাকে যে, তার মাশুল অন্য কেউ দেবে এবং তাদের নিজেদের সুবিধাগুলো থাকবে অক্ষত।
সম্ভবত যে জিনিসটির অভাব ছিল, তা নীতি নির্ধারণের চেয়ে বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির বৈপ্লবিক পরিবর্তনে।

নিকোলাস বেকুলিন: ইয়েল ল স্কুলের সিনিয়র ফেলো; টাইম ম্যাগাজিন থেকে সংক্ষেপিত
ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×