টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড
বিচার ও জবাবদিহি জরুরি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:২০
কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু ও ছয়জন আহত হওয়ার ঘটনা পুনরায় স্মরণ করাইয়া দিল– এই দেশে সর্বত্রই মৃত্যু ওত পাতিয়া রহিয়াছে। এখানে মানুষ ঘরের বাহিরে তো নিরাপদ নহেই, ঘরেও অনিরাপদ। তাহা না হইলে সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণে গিয়া তুলনামূলক ‘নিরাপদ’ রিসোর্টে মানুষ বেঘোরে প্রাণ হারাইবে কেন? ইতোপূর্বে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার হোটেল-রেস্তোরাঁ, এমনকি আবাসিক ভবনেও অগ্নিকাণ্ডে মানুষকে অঙ্গার হইতে দেখা গিয়াছে। কিন্তু কক্সবাজারের ন্যায় সমুদ্রসৈকতে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা থাকায় যেখানে সকল প্রকার নিরাপত্তাবিধি কঠোরভাবে মান্যতা পাওয়ার কথা, সেখানে নিছক আনন্দ করিতে গিয়া মানুষকে অগ্নিকুণ্ডে অসহায় আত্মসমর্পণ করিতে হইতেছে।
রবিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, শনিবার সকালে কাষ্ঠ নির্মিত ত্রিতল ভবন টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত। উহাতে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়; দগ্ধ হন ছয়জন। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের বরাত দিয়া প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন পুড়িয়া অঙ্গার হইয়া গিয়াছেন; তাই ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মৃতদেহগুলির পরিচয় নিশ্চিত করিতে হইবে। তদুপরি আহতদের মধ্যে চারজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শনিবার অপরাহ্ণে উড়োজাহাজে ঢাকায় প্রেরণ করা হইয়াছে। অধিকতর বেদনার বিষয়, নিহতদের মধ্যে ছয়জন একই পরিবারের সদস্য। এই বিয়োগ-বেদনা সহ্য করা ন্যূনতম অনুভূতিসম্পন্ন যে কোনো মানুষের পক্ষেই কঠিন।
আসলে যেখানে অগ্নি নিরাপত্তার বিধান মান্য করা হয় না, সেখানে মৃত্যুর ন্যায় অঘটন অস্বাভাবিক নহে। বরং বলা যায়, অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করিয়া মৃত্যুকে এক প্রকার আহ্বানই করা হইয়াছে। এই কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতোপূর্বে সংঘটিত অন্য সকল অগ্নিকাণ্ডে নিহতের ঘটনার ন্যায় আলোচ্য অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনাকেও কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বলিলে অত্যুক্তি হইবে না।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহানকে উদ্ধৃত করিয়া বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হইয়াছে, টুপটুপ রিসোর্টের ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কোনো অনুমোদন ছিল না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করিয়াই নাকি মাসের পর মাস রিসোর্টটি কার্যক্রম চালাইয়া গিয়াছে। প্রশ্ন হইল, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যতীত কোনো রিসোর্ট পরিচালিত হইলে তাহার দায় কি কেবল সংশ্লিষ্ট মালিক বা রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের? যাহাদের দায়িত্ব ছিল তদারকি, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও আইন প্রয়োগের, তাহাদের জবাবদিহিই তো আজিকে প্রশ্নের মুখে। খোদ জেলা প্রশাসনই কি উহার দায় উপেক্ষা করিতে পারে?
ঢাকা কিংবা দেশের যে কোনো এলাকায় অতীতে বিভিন্ন সময়ে যখন বৃহৎ কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়াছে, তখনই এই অভিযোগগুলি শোনা গিয়াছে। গত কয়েক দশকে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডসমূহের মধ্যে সম্ভবত একটিও পাওয়া যাইবে না, যেখানে সংশ্লিষ্ট ভবনের উপযুক্ত অগ্নি নিরাপত্তা বা অন্য কোনো সনদ ছিল। এতৎসত্ত্বেও অদ্যাবধি বিষয়গুলির সুরাহা করা হইল না। স্মরণ করা যাইতে পারে, কয়েক বৎসর পূর্বে ঢাকার বেইলি রোডের ব্যস্ত তবে সকল প্রকার সনদবিহীন রেস্তোরাঁ গ্রিন কোজি কটেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বহু মানুষ হতাহত হইবার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনহীন রেস্তোরাঁয় বিভিন্ন সরকারি সংস্থা সাঁড়াশি অভিযান চালাইয়াছিল। কিন্তু উহাতে পরিস্থিতির কোনো ইতরবিশেষ হয় নাই। ধারণা করা যায়, কক্সবাজারেও অনুরূপ অভিযান অচিরেই শুরু হইবে। কিন্তু জনপ্রদর্শনমূলক এহেন অভিযান অর্থহীন– তাহা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে উপলব্ধি করিতে হইবে। আর সেই উপলব্ধি তখনই সম্ভবপর হইতে পারে, যখন আলোচ্য অগ্নিকাণ্ডের দায়ে কেবল সংশ্লিষ্ট মালিকদিগের নহে; অগ্নি নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নজরদারির দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলার সরকারি কর্মকর্তাদিগকেও আইনি বেষ্টনীতে আনয়ন করা হইবে। দুর্ভাগ্যবশত অতীতে কোনো ঘটনায় সরকার এহেন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই। অন্তত এইবার আলোচ্য ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হইবে– ইহাই আমাদের প্রত্যাশা।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়