আন্তর্জাতিক
লন্ডনের ‘কেবল স্ট্রিট’ লড়াই: বাংলাদেশ যা শিখতে পারে
আখতার সোবহান মাসরুর
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:১৩
প্রতিবছরের মতো এবারও লন্ডনে কেবল স্ট্রিটের ঐতিহাসিক লড়াই স্মরণে ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হলো এক মহামিছিল। যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বজুড়ে যখন চরম ডানপন্থার উত্থান দেখা যাচ্ছে, তখন হাজার হাজার মানুষের এ মিছিল নিছক স্মরণ নয়; ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ারও উপলক্ষ।
৯০ বছর আগে, ১৯৩৬ সালের ৪ অক্টোবর লন্ডনে অসওয়াল্ড মোসলির নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ ইউনিয়ন অব ফ্যাসিস্টসের (বিইউএফ) প্রায় তিন হাজার সদস্যের এক মিছিল হয়। কালো ইউনিফর্ম পরে মিছিলকারীরা টাওয়ার অব লন্ডনের কাছে জড়ো হয়েছিল ইস্ট এন্ডের মধ্য দিয়ে বিপুলসংখ্যক ইহুদি অধ্যুষিত হোয়াইটচ্যাপেলে যাওয়ার লক্ষ্যে। কিন্তু কয়েক লাখ ইহুদি, আইরিশ, শ্রমিক, কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী ও ট্রেড ইউনিয়নকর্মীর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ মোসলির সেই মিছিলকে ইস্ট এন্ডে আটকে দিয়েছিল।
গত শতকের ত্রিশের দশকে ব্রিটেন বিশ্ব পুঁজিবাদের মহামন্দার অভিঘাতে জর্জরিত ছিল। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, নিম্ন মজুরি ও সামাজিক অনিশ্চয়তা শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। অর্থনৈতিক সংকটের কাঠামোগত কারণের পরিবর্তে একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা ছিল ফ্যাসিবাদী রাজনীতির কৌশল। লন্ডনের সে ফ্যাসিবাদী আন্দোলন ছিল ইতালির মুসেলিনির ফ্যাসিবাদ প্রভাবিত।
মোসলির সেই হিংসাত্মক মিছিল ঠেকাতে লোহালক্কড়, পাথর, আসবাব কেবল স্ট্রিটে ফেলে তৈরি করা হয় শক্ত ব্যারিকেড। অদ্ভুতভাবে পুলিশ ফ্যাসিস্টদের মিছিল না ঠেকিয়ে বরং তার পথ পরিষ্কার করতে লেগে যায়। বিক্ষোভকারীদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত পুলিশ মোসলির মিছিলের নির্ধারিত পথ বাতিল করায় ফ্যাসিস্টদের আর হোঢাইটচ্যাপেলে যাওয়া হয়নি। সেদিনের প্রতিরোধের প্রধান স্লোগান ছিল– ‘তাদের যেতে দেওয়া হবে না’ (দে শ্যাল নট পাস)।
এ ঘটনাই ইতিহাসে পরিচিত হয় ‘ব্যাটল অব কেবল স্ট্রিট’ নামে। তবে ‘যুদ্ধ’ শব্দটি ঘটনার জটিলতাকে পুরোপুরি প্রকাশ করে না। সংঘর্ষের বড় অংশই হয়েছিল পুলিশ ও প্রতিরোধকারীদের মধ্যে। পুলিশ সেদিন ৮৫ জনকে গ্রেপ্তার করে; যার মধ্যে ছয়জন ছিল ফ্যাসিস্ট, বাকিরা প্রতিরোধকারী। ছয়-সাত হাজার অশ্বারোহী ও পদাতিক পুলিশ নিয়োজিত ছিল; যাদের প্রধান প্রচেষ্টা ছিল ব্ল্যাক শার্টের মিছিলের পথ পরিষ্কার করা। কেবল স্ট্রিটের ইতিহাসে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে তাই প্রশ্ন থেকে যায়– আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে পুলিশ কাদের অধিকার রক্ষা করছিল? মোসলির মিছিলের কর্মসূচি ঘোষিত হওয়ার পর জিউস পিপলস কাউন্সিল প্রায় এক লাখ স্বাক্ষর সংগ্রহ করে সরকারের কাছে মিছিল নিষিদ্ধ করার দাবি করলেও সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। কেবল স্ট্রিটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো বহুজাতিক ও বহুসামাজিক ঐক্য ও প্রতিরোধ। ফ্যাসিবাদ মানুষকে ধর্ম, জাতি ও পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত করতে চেয়েছিল, আর প্রতিরোধকারীরা তার বিপরীতে অভিন্ন অধিকার, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থের ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন।
তবে একটি মিছিল রুখে দেওয়া গেলেও ফ্যাসিবাদের সামাজিক ভিত্তি বিলীন হয়নি। দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক হতাশা থেকে গেলে ফ্যাসিবাদ নতুন ভাষা ও নতুন শত্রু নির্মাণ করে ফিরে আসে। ৯০ বছর পর তাই ব্রিটেন, ইউরোপ ও আমেরিকায় বর্ণবাদ, অভিবাসন, পরিচয়, সীমান্ত, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে হাজির হচ্ছে।
১৯৩৬-এর ব্রিটেন ও আজকের ব্রিটেন এক নয়। কিন্তু সেই বিপজ্জনক ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক কৌশল এখনও ব্যবহার করা হচ্ছে। মানুষের বাস্তব ক্ষোভকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার কাঠামোগত কারণ থেকে সরিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পরিচালিত করা হচ্ছে। মানুষ যখন বাসস্থান, কাজ, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্ন মজুরি ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন প্রশ্ন হওয়া উচিত, এই সংকটের কারণ কী? সেই প্রশ্নের পরিবর্তে যদি বলা হয়– অভিবাসী, কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী বা কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সমস্যার কারণ, তাহলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষোভ ও বঞ্চনা সহজেই ঘৃণার রাজনীতিতে পরিণত হয়।
এ প্রশ্নে কেবল স্ট্রিটের উত্তর ছিল ভিন্ন। বিভাজনের বদলে ঐক্য, ঘৃণার বদলে জনগণের সংহতি। কিন্তু সেই ঐক্য শুধু নৈতিক আহ্বানে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সামাজিক ন্যায় এবং বিদ্যমান বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। তাই কেবল স্ট্রিটের ৯০ বছর পর ‘ফ্যাসিস্ট কারা’– শুধু এ প্রশ্ন করলেই চলবে না; বরং বুঝতে হবে কেন ও কী করে মানুষের ক্ষোভকে তারা ঘৃণার রাজনীতির দিকে নিয়ে যায়। সেই ক্ষোভকে বিভাজনের বদলে সমতা ও সংহতির পথে পরিচালিত করে আমাদের বৈষম্যমূলক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসানের পথে নিতে হবে।
সাধারণ মানুষ যখন বিভাজনের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে অভিন্ন স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন তারাই ইতিহাসের গতিপথ বদলাতে পারে। এ অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করা যেতে পারে। কী করে জাতি ও ধর্মের পরিচয়বাদী রাজনীতি বাস্তব অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাকে আড়াল করে পরিচয়ের রাজনীতির বিভেদের কানাগলিতে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এ অমানিশা থেকে বের হতে কেবল স্ট্রিটের বিজয় প্রেরণা হতে পারে।
ড. আখতার সোবহান মাসরুর: লেখক ও গবেষক
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক