ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

স্মরণ

ভাষাসংগ্রামী, চিরবিদ্রোহী, আদর্শিক রাজনীতির নক্ষত্র

ভাষাসংগ্রামী, চিরবিদ্রোহী, আদর্শিক রাজনীতির নক্ষত্র
×
×

অলি আহাদ (১৯২৮-২০১২)

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের যুগান্তকারী তিনটি ঘটনা– ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি, ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। তিনটি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গেই সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন চিরবিপ্লবী, চিরবিদ্রোহী রাজনীতিক অলি আহাদ। 

অলি আহাদ বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুরে ১৯২৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আব্দুল ওহাব ছিলেন জেলা রেজিস্ট্রার। বাল্যকাল থেকেই অলি আহাদ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও স্বাধীনচেতা। 

১৯৪৬ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তিনি ওই বছর আইএ পরীক্ষা দিতে পারেননি। ১৯৪৭ সালে আইএ পরীক্ষায় 
প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেই অলি আহাদ ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব তোলেন। ওই প্রস্তাবের সমর্থনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্যোগে ‘তমদ্দুন মজলিস’ এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে অলি আহাদ এতে সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। ১১ মার্চ প্রতিবাদ সভা, ধর্মঘট ও বিক্ষোভ প্রদর্শনে ঢাকা শহর উত্তাল হয়ে ওঠে; অন্য অনেকের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক ও অলি আহাদ গ্রেপ্তার হন এবং কয়েক দিন পর মুক্তিলাভ করেন। এটি অলি আহাদের প্রথম কারাবরণ। ২১ মার্চ কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় বক্তৃতার এক পর্যায়ে রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে বলেন– উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। জনসমুদ্রের এক প্রান্তে যারা পাল্টা ‘শেম শেম’ ধ্বনি উচ্চারণ করেন, সেই দলে ছিলেন অলি আহাদও। 

অলি আহাদের নেতৃত্বে ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ ভাষা আন্দোলনে সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় নুরুল আমিন সরকার ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। তাৎক্ষণিক নওয়াবপুরে আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ১৪৪ ধারা না ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়। রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ছাত্রসভায় এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অলি আহাদ তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাঁকে সমর্থন করেন আবদুল মতিন, শামসুল আলম ও গোলাম মওলা। ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসভায় মোহাম্মদ তোয়াহা, এমনকি সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক কাজী গোলাম মাহবুব ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে বক্তব্য দেন। কিন্তু অটল থাকেন অলি আহাদ। ওই দিন বিকেল ৩টায় ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে দলে দলে প্রাদেশিক পরিষদ ভবনের দিকে মিছিল করে অগ্রসর হলে পুলিশ গুলি চালায়। সেদিন, পরদিনও গুলিতে কয়েকজন ছাত্র ও যুবক নিহত হন। ২২ ফেব্রুয়ারি লক্ষাধিক লোকের অংশগ্রহণে গায়েবানা জানাজার পর অনুষ্ঠিত জনসভায় বক্তব্য দেন অলি আহাদ। তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে প্রথম শহীদ মিনার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন মোহাম্মদ সুলতানসহ ছাত্রলীগের এক দল সদস্য।
ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানের কারণে ২৭ ফেব্রুয়ারি অলি আহাদ গ্রেপ্তার হন।

১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিকম পরীক্ষায় প্রথম হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে এমকম পড়ার সুযোগ না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে। 

মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হলে অলি আহাদের প্রস্তাবে জেলবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক মনোনীত করা হয়। অলি আহাদ ১৯৫৩ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রচার সম্পাদক এবং ১৯৫৫ সালে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালে অলি আহাদ আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন। ওই বছরই মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠিত হলে অলি আহাদ যুগ্ম সম্পাদক মনোনীত হন। ১৯৬৯ সালে জাতীয় লীগ নামে আলাদা দল প্রতিষ্ঠা করে এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম সংগঠকও ছিলেন তিনি।

জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে ১৯৫৮ সাল থেকে অলি আহাদ চার বছর কারাবন্দি থাকেন। স্বাধীনতার পর আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা নিয়ে আন্দোলন করায় আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭৪ সালের ৩০ জুন অলি আহাদকে গ্রেপ্তার করে। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়েও তিনি আটবার কারাবরণ করেন।

স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধা তালিকায় থেকেও অলি আহাদ সরকারি চাকরি কিংবা লাভজনক পেশা বেছে নেননি। সাধারণ ও সৎ জীবনযাপনের মাধ্যমে আজীবন গণমানুষের রাজনীতি করে গেছেন। অলি আহাদের স্ত্রী রাশিদা বেগম ছিলেন ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রিন্সিপাল এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক; তিনি স্ত্রীর জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বাসায় থাকতেন।
অলি আহাদের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এবং গণমানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। ‘জাতীয় রাজনীতি: ১৯৪৫ থেকে ৭৫’ বইয়ে তিনি রাজনীতির নানা দিক, ঘটনা, অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ জাতীয় নেতার অবদানের যেমন প্রশংসা করেছেন, তেমনি তাদের সমালোচনাও করেছেন তিনি। আজীবন সংগ্রামী অলি আহাদকে শেখ মুজিব, জিয়া ও এরশাদ সরকার মন্ত্রিত্ব দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনো সরকারের সঙ্গে আপস করেননি। সব সরকারের আমলেই বরং কারাগারে আটক ছিলেন; সব মিলিয়ে জেলজীবন প্রায় ১৯ বছর।

প্রশ্ন জাগে, অলি আহাদ সফল, না ব্যর্থ রাজনীতিক ছিলেন? তিনি মন্ত্রী, এমপি হননি; কিন্তু আদর্শিক রাজনীতি, সত্যবাদিতা, সৎ জীবন ও গণমানুষের পক্ষে অবস্থানের মাধ্যমে তিনি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে রয়ে গেছেন। 

মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনে অবদানের মূল্যায়ন করে খালেদা জিয়ার সরকার অলি আহাদকে ২০০৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। এই ক্ষণজন্মা রাজনীতিক 
২০১২ সালের ২০ অক্টোবর ৮৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া: সাবেক সিনিয়র সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

আরও পড়ুন

×