সরাইলে দলবদ্ধ ধর্ষণ
খুপরি ঘরে বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে সেই কিশোরী
নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার কিশোরীকে (১৪) হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে গেছেন স্বজনরা। অর্থাভাবে চিকিৎসকের পরামর্শমতো তাকে ওষুধও দিতে পারছেন না হতদরিদ্র মা-বাবা। এ ঘটনায় হওয়া মামলার দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা মামলা করতে দেরি হওয়ার পেছনে স্থানীয় কেউ জড়িত কিনা, সে বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
৭ অক্টোবর রাতে উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের একটি গ্রামে ধর্ষণের শিকার হয় মেয়েটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ঘটনার রাতে একই গ্রামের একটি মাদ্রাসার মাঠে ওয়াজ মাহফিল ছিল। সেখানে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয় ওই মেয়েটি। পথে তাকে মুখ চেপে অটোরিকশায় তুলে নদীতীরের নির্জন জায়গায় নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। সেখানে জাকির, নাঈম ও সোহাগ মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। অন্যরা ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। রাত ১১টার দিকে তারা মেয়েটিকে বাড়ির পাশে রেখে চলে যায়। কাউকে কিছু জানালে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
গত বৃহস্পতিবার মেয়েটিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন স্বজনরা। ওই হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার ঢালী জানিয়েছিলেন, ওই কিশোরীকে ঘটনার বেশ কয়েকদিন পর হাসপাতালে আনা হয়। এ কারণে ধর্ষণের আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। তার পরও নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছেন।
ভুক্তভোগীর চাচার দেওয়া তথ্যমতে, হাসপাতালের ভর্তির কাগজ নিয়ে গত শনিবার তারা সরাইল থানায় যান। পরে মেয়েটির মা বাদী হয়ে মামলা করেন। এতে আসামি করা হয়েছে জাকির মিয়া (৩৩), নাঈম (২৪), সোহাগ মিয়া (২১), মোকলেস (৫২), আলামিন ওরফে জিকির (৪০) ও বাহার মিয়াকে (২২)। পুলিশ রাতেই বাহার মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে। রোববার বিকেলে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় নাঈমকে। তারা সবাই একই ইউনিয়নের বাড়িউড়া গ্রামের বাসিন্দা।
মেয়েটির চাচার ভাষ্য, তাঁর ভাই খুবই দরিদ্র ও সরল-সোজা মানুষ। একটি গরুর খামারে কাজ করে পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিনযাপন করেন।
গতকাল সোমবার বিকেলে দেখা গেছে, শরীরে তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে খুপড়ি ঘরের বিছানায় কাতড়াচ্ছে মেয়েটি। সামান্য কথা বলতে গিয়েও কুঁকড়ে যাচ্ছিল সে। এ সময় স্বজনরা জানান, পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েও ঘটনার রাতে পরিবারের কাউকে সে বিষয়টি জানায়নি। পরদিন থেকেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। মায়ের পীড়াপীড়িতে এক পর্যায়ে তিন দিন পর সে ঘটনার বর্ণনা দেয়। মা বিষয়টি স্থানীয় সর্দার রজব আলী ও হুমায়ূন মিয়াকে জানান।
গতকাল বিকেলে বাড়িতে গিয়ে রজব আলীকে পাওয়া যায়নি। স্বজনরা জানান, তিনি মোবাইল ফোনও সঙ্গে নেননি। তবে হুমায়ূন মিয়াকে বাড়িতে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ঘটনাটি শোনার পর তারা বাড়িঘরে লোকজন বসেছিলেন। ওখানে তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের জন্য আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। সবাই ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে পরামর্শের আলাপও করেন। পরদিনই ব্যবসায়িক কাজে ঢাকায় চলে যান। পরে মুরুব্বিরা চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানান।
নোয়াগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আহমেদ বলেন, ঘটনাটি শোনার পর তিনি ভুক্তভোগীকে চিকিৎসা করানো ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে বিষয়টি তিনি নিজ উদ্যোগে পুলিশকে জানাননি বলে স্বীকার করেন।
মেয়েটির বাবা গতকাল বলেন, ‘আমার একটামাত্র মাইয়্যা। যারা হেরে নষ্ট করছে, আমি তাদের বিচার চাই।’ মেয়েটির মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। এমনিই চলতে পারি না। মাইয়্যার এ অবস্থায় হাসপাতালে ঠিকমতো ওষুধ কিনতে পারি নাই। তাই হাসপাতাল থাইক্যা চইলা আইছি।’ তিনি ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরাইল থানার ওসি মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া বলেন, শনিবার রাতে মেয়েটির মা ছয়জনকে আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ রাতেই বাহারকে গ্রেপ্তার করে। রোববার নাঈমকে গ্রেপ্তার করা হয় ঢাকা থেকে। অন্যদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। মামলা দেরিতে হওয়ার জন্য কেউ দায়ী কিনা, তা জানতে পুলিশ স্থানীয়দের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে।
- বিষয় :
- ধর্ষণ