পাকিস্তানের করাচিতে তীব্র তাপপ্রবাহ, জনজীবন বিপর্যস্ত
আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, সামনে আরও তাপমাত্রা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
দ্য গার্ডিয়ান
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ১২:০৩
পাকিস্তান ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী ও অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে এই ধরনের চরম গরম এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এটি একটি নতুন ও স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।
পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চল বিশেষ করে সিন্ধ প্রদেশে এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিক মৌসুমি মানের চেয়ে অনেক বেশি রয়েছে। সেখানে দিনের বেলায় তাপমাত্রা প্রায়ই ৪৪ থেকে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যাচ্ছে। এতে করে দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে মানুষ ঘরবন্দি থাকতে বাধ্য হচ্ছে এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও কৃষিজীবীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ভারতেও একই ধরনের তাপপ্রবাহ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। রাজস্থান, গুজরাট, মহারাষ্ট্রসহ উত্তর ও মধ্য ভারতের একাধিক রাজ্যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন রাজ্য সরকার হিটওয়েভ সতর্কতা জারি করেছে। অতিরিক্ত গরমে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ, পানি সংকট এবং দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে।
পাকিস্তানের করাচি শহর, যা সাধারণত আরব সাগরের সমুদ্রবায়ুর কারণে কিছুটা শীতল থাকে, এবার তীব্র গরমের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। মে মাসের প্রথমার্ধে শহরটিতে একাধিকবার ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। পাকিস্তান আবহাওয়া দফতর (পিএমডি) জানিয়েছে, সম্প্রতি করাচিতে ৪৪.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা ২০১৮ সালের ৩১ মে-র পর সর্বোচ্চ। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, সামনে আরও তাপমাত্রা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে করাচির উপকূলীয় ও নিম্নআয়ের এলাকায়। দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও পানির সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শহরের অন্যতম বড় মাছধরা সম্প্রদায় অধ্যুষিত ইব্রাহিম হায়দেরিতে বাসিন্দারা বলছেন, জীবনধারণ দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে মাছ ধরার কাজে যুক্ত আবদুল সাত্তার জানান, সম্প্রতি এক সহকর্মী তাপদাহে অচেতন হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, 'আমরা তাকে লেবুর পানি খাইয়ে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাই। পরে তিনি শিরায় স্যালাইন দেওয়ার পর জ্ঞান ফিরে পান।'
তাপমাত্রার চাপ এখন স্বাস্থ্য খাতেও স্পষ্ট। ইব্রাহিম হায়দেরি সরকারি হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের প্রধান ডা. সুরেশ কুমার জানান, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে শিশু রোগীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, 'সাধারণ দিনে আমরা ৫০-৬০ জন শিশু দেখতাম, এখন তা ২০০ ছাড়িয়ে গেছে।' তার মতে, এসব শিশুর বেশিরভাগই ডায়রিয়া, পেটের সংক্রমণ ও পানিশূন্যতায় আক্রান্ত—যা সাধারণত তীব্র গরম ও দূষিত পানির কারণে বেড়ে যায়।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই পরিস্থিতি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। দ্রুত নগরায়ন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এই ধরনের চরম আবহাওয়া ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা প্রায় তিনগুণ বেড়ে গেছে। তাদের মতে, প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় এই ধরনের তাপপ্রবাহ প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ইয়াসির দারিয়া বলেন, করাচির আর্দ্রতার কারণে ৪০ ডিগ্রির নিচের তাপমাত্রাও অনেক বেশি গরম অনুভূত হয়। তিনি আরও বলেন, শহরে এখন আগের তুলনায় উষ্ণ রাতের সংখ্যা বাড়ছে, যা ঘুম, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ২০২৪ সালের পর থেকে তাপের তীব্রতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মতে, করাচিতে পর্যাপ্ত কুলিং সেন্টার ও জনস্বাস্থ্য সহায়তা কেন্দ্রের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া নগরীর গাছপালা কমে যাওয়ায় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব আরও ভয়াবহ হচ্ছে।
পাকিস্তান আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে, আর সিন্ধ প্রদেশে এই বৃদ্ধি প্রায় ১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকাল ছোট হয়ে আসছে এবং গ্রীষ্ম দীর্ঘ ও আরও তীব্র হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—জনসাধারণের জন্য কুলিং সেন্টার স্থাপন, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা প্রস্তুতি এবং শহরজুড়ে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ।
