‘আপসহীন’ নেত্রীর খেতাব পান খালেদা জিয়া
বেগম খালেদা জিয়া- ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৩:৪০ | আপডেট: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৪:১১
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালের মে মাসে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয়, খালেদা জিয়া তখন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। রাজনীতি নিয়ে চিন্তাধারা তো দূরের কথা, রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানেও তাকে খুব একটা দেখা যেত না। সময়ের পরিক্রমায় সেই তিনিই একজন গৃহবধূ থেকে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে হয়েছেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। ঘরে-বাইরে নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে তাকে এই দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। স্বামী হারানোর বেদনার মধ্যে তার গড়া দলের হাল ধরতে হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। সেখানেও অনেক প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয়েছে তাকে। সেখান থেকে শুরু হয় রাজনৈতিক সংগ্রামের জীবন।
ঘরে-বাইরে নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে তাকে দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। স্বামী হারানোর বেদনার মধ্যে বিএনপির হাল ধরতে হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। সেখানেও অনেক প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয় তাকে। শুরু হয় রাজনৈতিক সংগ্রামের জীবন। টানা আট বছর রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া। একসময় পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। কখনো আপস করেননি বলে তাকে আপসহীন নেত্রীর উপাধি দেওয়া হয়। দৃঢ় মনোবলের কারণে, দেশপ্রেমের কারণে, গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে দেশের মানুষ তাকে ছেড়ে যায়নি।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধা পাওয়া খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪১ বছর। তিনি পাঁচবারের সংসদ সদস্য, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী; আর বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন দুইবার।
ভোটে হারের গল্প খালেদা জিয়ার নির্বাচনী ইতিহাসে নেই। যদি নির্বাচন জনপ্রিয়তার মান নির্ধারণ করে, তাহলে তিনি সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন। এমনকি যেসব নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারেনি, সেসব নির্বাচনেও তিনি যতটি আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন, তার সব কটিতে জয়ী হন। বাংলাদেশে বা উপমহাদেশে তার সমমর্যাদার অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতা এ ধরনের কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব
দলের মধ্যে একটি অংশের বাধার মধ্যেও খালেদা জিয়া ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ওই বছরের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি জীবনের প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হলে খালেদা জিয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। বিএনপির সাংগঠনিক বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যেই দলের হাল ধরে ১৯৮৩ সালে তিনি ৭ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করেন। শুরু করেন এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন। খালেদা জিয়া মূলত ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে ৭ দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। ওই সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দলের সাথে যৌথভাবে আন্দোলনের কর্মসূচি শুরু করেন। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফা আন্দোলন চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ছেদ পড়ে।
‘আপসহীন’ নেত্রীর খেতাব
নির্বাচন প্রশ্নে বিরোধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দল ভেঙে ৮ দল ও ৫ দলে ভাগ হয়। শেখ হাসিনার নের্তৃত্বে ৮ দল ও জামায়াত ৮৬ সালের নির্বাচনে যায়। এরপর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল, বাম দলগুলোর পাঁচ দলীয় ঐক্যজোট থাকে রাজপথে। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও’ এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। সংসদ ভেঙে দিতে বাধ্য হন এরশাদ। আওয়ামী লীগ সংসদ থেকে বের হয়ে এলে পুনরায় শুরু হয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। রাজপথে দীর্ঘ ৮ বছর একটানা আপসহীন সংগ্রামে ১৯৯০ সালে ৬ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে দেশবাসীর কাছে পেয়ে যান ‘আপসহীন’ নেত্রীর খেতাব।
নিঃসঙ্গ ও যোগাযোগহীন জীবনযাপনে বাধ্য
৩৫ বছরের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া সবসময় জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য সোচ্চার ও সংগ্রামমুখর ছিলেন। তার প্রতিশ্রুতির জন্য তাকে ভুগতে হয়েছে। তাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, তার সভা ও মোটর শোভাযাত্রা বিরোধীদের ভয়ঙ্কর আক্রমণের শিকার হয়েছিল। তাকে নিঃসঙ্গ ও যোগাযোগহীন জীবনযাপন করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি শুধু বাংলাদেশেই নয়, সম্ভবত বৈশ্বিক ক্ষেত্রেও একমাত্র রাজনীতিবিদ, যিনি ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ২৩ সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং কোনোটিতেই পরাজিত হননি।
২০১৮ সালের নির্বাচনেও খালেদা জিয়া তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। এসব আসন হচ্ছে ফেনী-১. বগুড়া-৬ ও বগুড়া-৭। কিন্তু দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হবার কারণে নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে পড়েন। খালেদা জিয়ার অতীত নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি বগুড়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রামের আসন থেকে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এছাড়া ১৯৯১ সালে ঢাকার একটি আসন থেকে এবং ২০০১ সালে খুলনার একটি আসন থেকে ভোটে লড়েছেন। নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শুধু জয়লাভই নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সাথে খালেদা জিয়ার ভোটের ব্যবধানও ছিল বেশি।
‘দেশনেত্রী’ সম্বোধন
তিনি দেশের অদ্বিতীয় জননন্দিত নেতা। দেশের প্রায় সব জায়গায় তিনি গেছেন। তিনি শ্রমসাধ্য দীর্ঘ সফর করতে পারঙ্গম ছিলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের ১৪ দিন আগে তিনি সারা দেশে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেছিলেন। যখন তিনি কোনো নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতেন, তখন তিনি অদম্য প্রাণপ্রাচুর্যে বলীয়ান হয়ে উঠতেন। তখন তিনি সকাল, দুপুর বা রাতের খাবারের জন্য কোনো সময়সূচি বজায় রাখতেন না। তিনি রাত তিনটায় নির্বাচনী সভায় ভাষণ দিয়েছেন। তিনি তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকতেন এবং একবার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে কঠোরভাবে তা মেনে চলতেন। বিশ্বের ১০০ জন ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় ফোর্বস ম্যাগাজিন খালেদা জিয়াকে ২০০৪ সালে ১৪তম, ২০০৫ সালে ২৯তম এবং ২০০৬ সালে ৩৩তম স্থান দেয়। ২০১১ সালের ২৪ মে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি সিনেটে গণতন্ত্রের যোদ্ধা (ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি) হিসেবে সম্মানিত হন। তাঁর দলীয় কর্মী ও সমর্থকরা তাঁকে অকপটে সম্বোধন করেন ‘দেশনেত্রী’ বলে।
আজ মঙ্গলবার ভোর ৬টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।
শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় গত ২৩ নভেম্বর জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। এর আগে ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রওনা দিয়ে গাড়িতে ওঠেই অস্বস্তি বোধ করছিলেন তিনি। বহু বছর ধরেই খালেদা জিয়া লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস এবং চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।
