দ্বিতীয় স্ত্রীর পরিচয় লুকিয়ে চাকরির সুপারিশ করেন জামায়াত এমপি
এমপি গাজী নজরুল ইসলাম
সমকাল প্রতিবেদক ও সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ২১:৩৩
সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) জি এম নজরুল ইসলাম বৈবাহিক সম্পর্ক গোপন করে দ্বিতীয় স্ত্রীর জন্য চাকরির সুপারিশ করেছেন। ৭৪ বছর বয়সী এই এমপি গত ১৭ জুন ১৮ বয়সী তরুণী মরিয়ম বেগমকে বিয়ে করেন। এর পাঁচদিন পর তার জন্য চাকরির ‘জোর সুপারিশ’ করেন।
অসম বয়সের এই দম্পত্তি গত ১৩ জুলাই একান্ত সময় কাটানোর সময় গোপনে ধারন করা ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়েছে। যাতে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন যুবক জি এম নজরুলকে ঘিরে ধরে প্রশ্ন করছেন। প্রশ্নবানে জর্জরিত এমপি নজরুল তাদের বলেছেন, এই প্রথম এসেছেন।
চাকরির সুপারিশ করা এমপিদের জন্য স্বার্থের সংঘাত হলেও সামাজিকমাধ্যমে সমালোচনা চলছে ব্যক্তিগত মুহুর্তের ভিডিও নিয়ে। জামায়াতের সমর্থকরা প্রথমে ভিডিওটিকে ভুয়া দাবি করলেও, এমপি এগুলোকে আসল বলে নিশ্চিত করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহছানুল মাহবুব যোবায়ের বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তারা ঘটনা প্রবাহে নজর রাখছে। আরও খোঁজখবর নিয়ে এবং প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
সোমবার রাতে এই ভিডিও ছড়ানোর পর যোগাযোগ করলে জি এম নজরুল সমকালকে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ের কাবিননামা পাঠান। তিন লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে নিবন্ধন হয় ১৭ জুন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে কাজীর কাছে। কাজী বদরুল আলম মো. বাকী বিল্লাহ জানিয়েছেন, বর, কনে এবং সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিয়ে নিবন্ধন করেছেন।
কাবিননামা অনুযায়ী, বিয়ের সাক্ষী হয়েছেন এমপি নজরুলের প্রথম স্ত্রী বেগম মাকসুদা ইসলাম। কনে মরিয়মের পক্ষে উকিল হন তার বাবা মাসুম বিল্লাহ। কাবিননামায় কনের বয়স ছিল ১৮ বছর এক মাস। বড় নজরুল ইসলাম তার চেয়ে ৫৭ বছরের বড়।
এমপির প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম সামাজিকমাধ্যমে ভিডিও বার্তা বলেছেন, তার অনুমতিতে নজরুল ইসলাম দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তার স্বামীর নামে রটানো কুৎসার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন।
এমপির দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা ভিডিওবার্তায় বলেন, মরিয়মের মামা এবং তার শ্যালক ওবায়দুল্লাহ গোপনে ভিডিও ধারন করেন। এমপির কাছ টাকা আদায়ে ভিডিও করে ফাঁসের হুমকি দেওয়া হয়।
এই দুইজনের সঙ্গে কথা বলতে পারেনি সমকাল। মঙ্গলবার সকালে একই ভাষ্য জানিয়েছেন নজরুল ইসলাম। এমপির দ্বিতীয় স্ত্রীর একটি জীবনবৃত্তান্ত পাওয়া গেছে। যাতে চাকরির জন্য জোর সুপারিশ করেন তিনবারের এমপি নজরুল। ২২ জুনের স্বাক্ষর রয়েছে। এতে মরিয়ম বেগমের বৈবাহিক অবস্থা লেখা, অবিবাহিত। মরিয়ম বেগমের দাবি, জীবন বৃত্তান্তটি বিয়ের আগে তৈরি। তাতে পরে সই করেন তার স্বামী।
কী চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন- এই প্রশ্নে মরিয়ম বেগম বলেন, ছোটখাট বেসরকারি চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় জীবনবৃত্তান্ত দিয়েছেন।
একজন এমপির স্ত্রীর কী ছোটখাট বেসরকারি চাকরির প্রয়োজন রয়েছে কিনা, চাকরি দেওয়ার কথা বলে এমপি তাকে বিয়ে করেছেন কিনা- প্রশ্নে মরিয়ম বেগম বলেছেন, তিনি পরিবারের মতামতে স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছেন। নিজের চেয়ে ৫৭ বছরের বড় একজনকে বিয়ে করারকে তিনি নিজের ইচ্ছা বলে আখ্যা দিয়েছেন।
আলোচনা-সমালোচনা, নেপথ্যে কী
সাতক্ষীরায় প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এমপির ভিডিও ফাঁস নিয়ে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এমপির ব্যক্তিগত সহকারী আবুল হাসান বলেন, নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়ি নেই। তিনি যে ভাড়ার গাড়ি ব্যবহার করেন, এর চালক এমপির মামা শ্বশুর ওবায়দুল্লাহ।
আবুল হাসান বলেছেন, এমপি ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী মগবাজারের অবস্থানের সময় কক্ষে গোপনে মোবাইল ফোন রেখে ভিডিও ধারন করেন ওবায়দুল্লাহ। পরে কয়েকজন যুবককে নিয়ে এসে হেনস্তা করে ১০ লাখ টাকার দাবি করেন। তিন লাখ টাকা দেওয়া হয়। বাকি সাত লাখ টাকা না দেওয়ায় ভিডিও ছড়িয়ে দেন।
ওবায়দুল্লাহর বক্তব্য জানতে পারেনি সমকালকে। তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তিনি লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। যেখানে তিনি এমপিকে দুশ্চরিত্র বলে আখ্যা দেন।
এমপির ভাষ্য
নজরুল ইসলাম বিবৃতিতে জানিয়েছে, তিনি দুই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গত ১৩ জুলাই মগবাজারে মরিয়মের বাবার কার্যালয়ে যান। সেখানে অবস্থানের সময়ে ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে যান। পরে তিনি ৫-৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে কক্ষে প্রবেশ করে, জিম্মি করে এক লাখ টাকা আদায় করে। ভাড়া করা গাড়িটিও আটকে রাখে। মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে পূর্বশত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জের এসব কাজ করেছেন ওবায়দুল্লাহ।
- বিষয় :
- জামায়াতে ইসলামী
- এমপি
- ভিডিও ভাইরাল
- বিয়ে
- সাতক্ষীরা