ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

জামায়াতের প্রতিক্রিয়া

বাজেট লক্ষ্যহীন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে পড়বে মানুষ

বাজেট লক্ষ্যহীন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে পড়বে মানুষ
×

মগবাজা‌রে দলীয় কার্যাল‌য়ে সংবাদ স‌ম্মেলনে কথা বলেন জামায়াতের সে‌ক্রেটা‌রি মিয়া গোলাম পরওয়ার

সমকাল প্রতিনিধি 

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ১৫:৫৭ | আপডেট: ১২ জুন ২০২৬ | ১৬:০০

বা‌জে‌টে ক‌র ও ভ্যাটের সীমা বৃ‌দ্ধি‌র কার‌ণে সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতি‌তে পড়‌বে ব‌লে দা‌বি ক‌রে‌ছে জামায়া‌তে ইসলামী। শুক্রবার রাজধানীর মগবাজা‌রে দলীয় কার্যাল‌য়ে সংবাদ স‌ম্মেলনে দ‌লের সে‌ক্রেটা‌রি মিয়া গোলাম পরওয়ার ব‌লেন, বাজেট লক্ষ্যহীন ও সাধারণ মানুষের পকেট কাটার। প্রস্তা‌বিত বাজেট ঋণনির্ভর, উচ্চাভিলাষী, অবাস্তবায়নযোগ্য ও লুটপাটের। 

জামায়াত প্রস্তাবিত বাজেট সংশোধন করে সাধারণ মানুষের ওপর থেকে করের বোঝা কমানোর এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে। গোলাম পরওয়ার বলেন, আর্থিক সংস্থান করতে গিয়ে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার যে রাজস্ব আয়ের কথা বলা হয়েছে, সেই রাজস্ব কীভাবে আদায় করা হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। বাজেটের ঘাটতি ২ লাখ ৩৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা কোথা থেকে পূরণ করা হবে- সেটি স্পষ্ট নয়। যেসব উৎস দেখানো হচ্ছে সেখানে যে কর কাঠামো, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রয়োজন- সেগুলোর উল্লেখ নেই। 

সংস‌দে প্রস্তা‌বিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কো‌টি টাকার বাজেট বাস্তবায়নে প্রধান তিন বাধা র‌য়ে‌ছে দা‌বি ক‌রে গোলাম পরওয়ার ব‌লেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই বিশাল আকারের বাজেট বাস্তবায়ন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম ক্রমাগত বাড়ানোর ফলে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।

বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। সরকার মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশ‌মিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তা আরও বাড়বে। আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব এই বাজেটকে আরও বেশি ঝুঁকিতে ফেলবে।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, এই বাজেটে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করা হয়নি। করের বোঝা মূলত সাধারণ নাগরিকদের ওপর চাপানো হয়েছে, অন্যদিকে ধনীদের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করা হয়েছে।

জামায়াত নেতারা বলেন, বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধেই চলে যাবে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) খাতে ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার সমালোচনা করেছে জামায়াত। মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করে ব‌লেন, সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ছাড়া করা হয়েছে, যা কেবল দুর্নীতি ও সরকারি দলের নেতাকর্মীদের লুটপাটের নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, এবারের বড় ঘাটতি বাজেটের যে ব্যয় সংকুলান, তা ব্যাংক লোন থেকে করা হবে। তাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে না, স্বাভাবাকিভাবে বেসরকারি খাতে প্রভাব পড়বে। 

তিনি আরও বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে। প্রথমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়। গত কয়েক মাসে গ্যাস, জ্বালানি এবং বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বৃদ্ধি করা হয়েছে। জ্বালানি হলো উৎপাদন ব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি। এর মূল্য বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং অর্থনীতির সব খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দ্বিতীয়ত; লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি কমার পরিবর্তে ক্রমাগত বাড়ছে। তৃতীয়ত; বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কারণে বাজেট বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

জামায়াতের ছায়া বাজেটের সঙ্গে সরকারের বাজেটের তুলনামূলক আলোচনা তুলে ধরে সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট পেশ করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫৫তম জাতীয় বাজেট। জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের জনগণ একটি জনবান্ধব, সুপরিকল্পিত, দূরদর্শী ও বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু সরকারের ঘোষিত বাজেটে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নের সুস্পষ্ট বার্তা প্রতিফলিত হয়নি।

মিয়া গোলাম পওয়ার বলেন, কর প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে কার্যকর সংস্কারের প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়নি। আশঙ্কা করছি, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই বিপুল অঙ্কের বাজেট বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতি, অপচয় এবং লুটপাটের ঝুঁকি বাড়বে। ৬ দশ‌মিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশ, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, সীমাহীন দুর্নীতি এবং বৈষম্যমূলক নীতির কারণে উৎপাদনশীলতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

গোলাম পরওয়ার বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের নিচে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। সেখানে ৬ দশ‌মিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইভাবে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশ‌মিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেন,  বর্তমান সরকারের গৃহীত এসব অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের নীতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এছাড়া উচ্চাভিলাষী এই বাজেটের অর্থায়ন করতে গিয়ে সরকারকে অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়েছে। দেশীয় উৎস, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়বে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। 

গোলাম পরওয়ার ব‌লেন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিল্প খাতের বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর ব্যয় ও কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পেট্রোলিয়াম, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধি জনজীবনে দুর্ভোগ বয়ে আনবে। আরএমজি তথা তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি আমাদের রপ্তানি খাতকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এই গণবিরোধী বাজেটের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, আশা করি, সরকার বাজেট সংশোধন করবে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে যে নৈরাজ্য ও অনিয়মের লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে, তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো পরিবর্তনের যে প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যাদের শেয়ার অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের শেয়ার যে মূল্যে নেওয়া হয়েছে, সেই মূল্যে ফেরত দেওয়া হোক। 

সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ এবারও রাখা হয়েছে- তা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। বাজেটকে দুর্নীতি ও কালো অর্থের প্রভাবমুক্ত করে একটি জনমুখী ও জনকল্যাণমূলক বাজেটে রূপান্তর করতে হবে। 

সংবাদ স‌ম্মেল‌নে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হা‌মিদুর রহমান আযাদ, আবদুল হালিম, নির্বাহী পরিষদ সদস্য ড. রেজাউল করিম প্রমুখ। 

আরও পড়ুন

×