খাই খাই বন্ধ করুন, বিএনপি নেতাকর্মীদের এমপি জামাল
ফেসবুক পোস্টের এ মন্তব্যে ঝালকাঠিতে তোলপাড়
রফিকুল ইসলাম জামাল
ঝালকাঠি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫৬ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘খাই খাই’ বন্ধ করে দল ও মানুষের জন্য কাজ করার আহ্বান জানিয়ে নিজের দলের নেতাকর্মীদের কড়া বার্তা দিলেন ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল। নিজের ফেসবুক আইডিতে এ কথা পোস্ট দিয়ে নিজ আসনের বিএনপি নেতাকর্মীদের একদিকে সমর্থন, অন্যদিকে সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। এ বিষয়টি অনেকেই জেলা পরিষদ প্রশাসকের সঙ্গে এমপির দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পক্ষে ওকালতি করা, বাড়িঘর, ঠিকাদারি কাজ এবং টাকার বিনিময়ে বিএনপিতে যোগদান করানোর মতো গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক সম্পাদক। গত বৃহস্পতিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এসব কথা বলেন তিনি। পোস্টটি প্রকাশের পর থেকেই ঝালকাঠির রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। তাঁর পোস্টের মন্তব্যের ঘরে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছেন।
এমপি রফিকুল ইসলাম জামাল তাঁর পোস্টে লেখেন, ঝালকাঠির বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের খাই খাই বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করছি। ছয় মাসে অনেক খেয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পাহারার বিনিময়ে খেয়েছেন, তাদের পক্ষে ওকালতি করে খেয়েছেন, বাড়িঘর পাহারা দিয়ে খেয়েছেন, ঠিকাদারি পাহারা দিয়ে খাচ্ছেন এবং স্বৈরাচার পতনের পর বিএনপির মামলায় অনেককে আসামি না দিয়ে খেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগদের দলে যোগদান করিয়েও খাচ্ছেন।
পোস্টের এক পর্যায়ে তিনি আরও লেখেন, মনে হচ্ছে আপনারা দলটাকেই খেয়ে ফেলবেন। দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিরস্কারের সুরে বিএনপির এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, লজ্জা থাকা উচিত। যাদের রক্তের বিনিময়ে আপনাদের এত খাওয়ার সুযোগ হয়েছে, সেই ‘৩৬ জুলাই শহীদদের’ জন্য ৫ আগস্ট একটু দোয়া-মোনাজাতও করতে পারেননি।
শুধু নেতা হওয়ার জন্য পদ-পদবির আকাঙ্ক্ষায় যারা থাকেন, তাদের উদ্দেশে সতর্ক করে এমপি জামাল বলেন, শুধু নেতা হতে পদের আকাঙ্ক্ষায় থাকলে দ্রুতই দল থেকে ঝরে পড়বেন।
ফেসবুকে এমপির এমন পোস্টের পর মন্তব্যের ঘরে নেতাকর্মীদের মধ্যে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। কেউ এমপির বক্তব্যকে সমর্থন করলেও কেউ কেউ তাঁর নিজের চারপাশের নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
ফেসবুকে এমন স্ট্যাটাস দেওয়ার যুক্তিতে রাজাপুরের বিএনপির অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী জানান, রাজাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি আফরোজা আকতার লাইজুর বিরুদ্ধে কোনো মামলা করতে দেওয়া হয়নি। যিনি রাজাপুরে গণঅভ্যুত্থান আন্দোলন ঠেকাতে লগি-বৈঠার মিটিংয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এমনকি বিগত স্বৈরাচারের সময় একচেটিয়া টেন্ডার সিন্ডিকেট করে রাতারাতি কোটিপতি সেই আওয়ামী লীগ নেত্রী এখন রাজাপুরে নিজ বাসায় অবস্থান করলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। এ বিষয়ে লাইজুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
হঠাৎ করে কেন এমন মন্তব্য প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম জামাল সমকালকে বলেন, সবচেয়ে দুর্ভাগ্য হলো, আমার জেলা বিএনপির অনেক নেতা আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। সর্বশেষ দেখলাম কীর্তিপাশা ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি আ. রহিমকে দলে নিয়েছে। অথচ এই আওয়ামী লীগ দ্বারা আমি নিজেসহ সবাই নির্যাতিত হয়ে রক্তাক্ত হয়েছি। এ ছাড়া আমার আসনে কোনো মিথ্যা মামলা বা মামলা বাণিজ্য করতে দিইনি।
তিনি এ পরিস্থিতি ও ভূমিকার জন্য জেলা বিএনপিকে দায়ী করে বলেন, জেলা বিএনপি যারা ধরে রেখেছে, তারা কেন ছয় বছরে একটা পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি। স্বার্থ হাসিলের জন্য এরাই আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব হয়ে আছেন। তাদের প্রত্যেককে আমি অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও জেলা পরিষদ প্রশাসক অ্যাডভোকেট শাহাদাত হোসেন বলেন, এমপির ফেসবুকে দেওয়া মন্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত। তিনি বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাই সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের মন্তব্য করতে পারেন কিনা, সে বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। তিনি নিজেও জেলা বিএনপির সদস্য। জেলা বিএনপির কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আমাকে অবগত করতে পারেন। বরং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে রাজাপুর-কাঁঠালিয়ার পদ স্থগিত করা নেতাদের প্রকাশ্যে তিনি সঙ্গে নিয়ে চলেন।
প্রশাসক বলেন, ঝালকাঠি-১ আসনের এমপির কোনো প্রকল্প প্রস্তাব আসেনি জেলা পরিষদে। তাই এ ঘটনার জের ধরে ফেসবুকে তিনি ওই মন্তব্য করেছেন বলে আমার মনে হয় না। তাঁর এ ধরনের বক্তব্যে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
- বিষয় :
- বিএনপি