জিন্নাহর স্থলে গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার ছবি
ডাকসুর সংগ্রহশালা
ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ। সোমবার দুপুরে - ভিডিও থেকে
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৩ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর ছবি রাখা নিয়ে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একজন শিক্ষার্থী গিয়ে জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলেন। পরে সে জায়গায় গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার ছবি স্থাপন করেন একটি ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা।
ছাত্রদলসহ একাধিক ছাত্র সংগঠন ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি রাখার প্রতিবাদ করেছে। জিন্নাহর ছবি স্থাপনসহ আরও কিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও।
ডাকসু সংগ্রহশালায় বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামের আলোকচিত্র ও নিদর্শনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গৌরবোজ্জ্বল কিছু ছবি ছিল। গত রোববার সংগ্রহশালা উন্মুক্ত করার পর দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর একক ছবি বাদ দেওয়া হয়েছে। আর পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত করা হয়েছে।
সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি রাখার ঘটনায় গতকাল দুপুরে প্রতিবাদ সমাবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। এর কিছুক্ষণ পর ডাকসুর সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর ছবিগুলোর ফ্রেম ভেঙে ছিঁড়ে ফেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার।
জিন্নাহর ছবি রাখার প্রতিবাদে জামায়াতের সাবেক আমির, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আমৃত্যু দণ্ডপ্রাপ্ত (পরে প্রয়াত) গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার ছবি সংগ্রহশালায় টানিয়ে দেন ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা।
আবু তৈয়ব বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহ যখন বলেছিলেন– ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’; তখনই প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার জিন্নাহকে পুনর্বাসনের চেষ্টা বড় চক্রান্ত।
গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার ছবি টানিয়ে প্রতিবাদ
গতকাল বিকেল ৩টায় ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে এক দল শিক্ষার্থী ডাকসুর সংগ্রহশালায় গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার ছবি স্থাপন করেন। সংগ্রহশালায় গিয়ে দেখা যায়, যে স্থানে জিন্নাহর ছবি লাগানো হয়েছিল, তার ওপরে আশির দশকে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার ছবি লাগানো হয়েছে।
ছাত্র ফেডারেশনের নেতা অর্ক বড়ুয়া বলেন, ‘ইতিহাসের একপক্ষীয় উপস্থাপন কেউ মেনে নেবে না। আর গোলাম আযমরা একাত্তরে যা করেছেন, তার ফলে আশিতে তাঁকে মানুষ জুতাপেটা করেছে। আমরা এ দেশের আপামর মানুষ সেই ইতিহাস সংরক্ষণ করেছি।’
ডাকসু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে: ছাত্রদল
ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ সমাবেশে ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশচন্দ্র রায় সাহস বলেন, ‘বিতর্কিত ডাকসু থেকে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের অধিকাংশ ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িত। সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের ছবি তারা টানিয়েছে। আমরা এটা সহ্য করতে পারি না। এটা অপসারণ করা না হলে ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অফিস এবং ডাকসু সংগ্রহশালায় কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।’
জিন্নাহর ছবি সরানোর জন্য ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটামও দেয় ছাত্রদল।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (একাংশ) ঢাবি সংসদের সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, ‘ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন করা ভাষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহ্যের প্রতি স্পষ্ট অবমাননা। আমাদের চাওয়া ছিল, মহান মুক্তিযু্দ্ধকে আওয়ামী দখলদারিত্ব এবং হেয় করা– এই দ্বিমুখী অপতৎপরতার বিপরীতে ডাকসু এ দেশের মানুষের প্রকৃত লড়াইয়ের ইতিহাস ছাত্র-জনতার কাছে তুলে ধরবে। ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদর্শ চর্চার স্থান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না; ডাকসু হবে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর। কিন্তু ডাকসু এ দেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সামনে আনার পরিবর্তে মুছে দেওয়ার অপতৎপরতা চালাচ্ছে।’
ছাত্র ফেডারেশন ও অন্যান্য
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের আহ্বায়ক সৈকত আরিফ বলেন, “ডাকসু লজ্জাজনকভাবে ইতিহাসকে বিকৃতি করেছে। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে যে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা জিন্নাহর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়াতেই তৈরি হয়েছিল। রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে তিনি বলেছিলেন– ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ সেখানে ডাকসু জিন্নাহকে নায়ক হিসেবে উত্থাপন করেছে। তা ইতিহাস বিকৃতি। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। ডাকসু সংগ্রহশালায় ইতিহাসকে যেভাবে উত্থাপন করা হয়েছে, তা ইতিহাসের বিকৃতি। এ ঘটনায় ডাকসুর নেতৃবৃন্দের জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।”
জিন্নাহর ছবি টানানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট।
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ সমকালকে বলেন, ‘আমরা জিন্নাহকে দায়মুক্তি দিইনি। জিন্নাহ যে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, আমরা সেটাই তুলে ধরেছি। বরং যারা জিন্নাহর ছবি ছিঁড়েছে, তারাই জিন্নাহ-প্রেম দেখাচ্ছে।’
সোমবার রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমরা অবগত হয়েছি (জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলার বিষয়ে)। আমরা বলব, যারা রাজনীতির ইতিহাস জানেন না; শুধু প্রথাগত দলীয় রাজনীতিতে যারা অন্ধ, তারা এ ধরনের আচরণ করতে পারেন।’
সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্বেগ
ডাকসু সংগ্রহশালায় ঐতিহাসিক আলোকচিত্র ও দলিলের উপস্থাপন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। সংগঠনটির অভিযোগ, মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর ছবি সংযোজন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু আলোকচিত্রের উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তারা ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের ধারাবাহিক ইতিহাস যথাযথ প্রেক্ষাপটে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইতিহাসবিদ, মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতামত নিয়ে সংগ্রহশালার প্রদর্শনী সাজানোর দাবি জানিয়েছে।
এর আগে রোববার ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা ডাকসু ভবনের নিচতলায় সংস্কার করা এ সংগ্রহশালার উদ্বোধন করেন। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদসহ অন্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের নেতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর তিনটি ছবি দেখা যায়। এর মধ্যে একটি ছবি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক অনুষ্ঠানের, যেখানে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন– ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। আরেকটি ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি গ্রুপ ছবি, যাতে জিন্নাহ রয়েছেন। ওই সম্মেলনে ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসকারী মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবি-সংবলিত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছিল। অন্য ছবিটি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে জিন্নাহর ছবি-সংবলিত পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকার প্রতিবেদনের কাটিং।
ডাকসুর কর্মকাণ্ডে প্রশাসনের আপত্তি
ডাকসু সংগ্রহশালায় মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শন বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও। ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে গতকাল ওক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য ডাকসুর উদ্যোগে অনুমোদন ছাড়া একটি ওয়েবসাইট চালুর বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তারা বলেছে, শিক্ষক মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষণ মূল্যায়ন নীতিমালা রয়েছে এবং তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত কাঠামোর বাইরে পৃথক কোনো শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর সুযোগ নেই।
- বিষয় :
- ডাকসু
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়