জামায়াত নিষিদ্ধ কতদূর
রাশেদ মেহেদী
প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:৪০
আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের সংশোধনীতেই আটকে আছে জামায়াত নিষিদ্ধ হওয়ার
প্রক্রিয়া। গত পাঁচ বছরেও এ সংশোধিত আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য
ওঠেনি।
বর্তমান আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর
প্রথম সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আইনের এই সংশোধনীর প্রক্রিয়া
সম্পন্ন করতে দ্রুত উদ্যোগ নেবেন এবং জামায়াত নিষিদ্ধ করার বিষয়টি তার এ
মেয়াদে প্রাধান্য পাবে। ওই সংবাদ সম্মেলনের পর প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও
সংশোধিত আইনের খসড়া মন্ত্রিসভার বৈঠকে না ওঠার কারণ জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী
সমকালকে বলেন, আইনটি যেন দ্রুততম সময়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ওঠে, সে জন্য
পদক্ষেপ নেবেন তিনি।
অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সন্তান এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
একাত্তরের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন জামায়াতে
ইসলামী নিষিদ্ধ করার বিষয়টি মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপরই নির্ভর করে। তারা
বলেন, জামায়াত নিষিদ্ধ না হলে শহীদ পরিবারগুলোর পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার
নিশ্চিত হবে না। একই সঙ্গে দেশের রাজনীতি থেকে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও
সাম্প্রদায়িকতাও দূর হবে না। জামায়াত নিষিদ্ধ না হওয়ার কারণেই জামায়াতের
মুখপত্র কাদের মোল্লার মতো ভয়ংকর ঘাতককেও 'শহীদ' উল্লেখ করার স্পর্ধা
দেখাতে পারছে। এ কারণে জামায়াত নিষিদ্ধের বিষয়টিতে সরকারের সর্বোচ্চ
গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তারা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের সংশোধন ছাড়াও
সংবিধানের ৩৮ (গ) ধারার মাধ্যমে এবং ২০১১ সালের সন্ত্রাস দমন আইনের
মাধ্যমেও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে জামায়াত নিষিদ্ধ করা সম্ভব।
যেখানে আটকে আছে প্রক্রিয়া :২০১৩ সালের ১ আগস্ট হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ
জাময়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে জামায়াতে
ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করে। পরে এ
রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে জামায়াত। সেই আপিলের নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। কেন
হয়নি জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম সমকালকে বলেন-
এটা সত্য যে, ওই আপিলের নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। তিনি জানান, এ ব্যাপারে
খোঁজখবর নিয়ে অবশ্যই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন তিনি। সাবেক আইনমন্ত্রী
ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, এ আপিল নিষ্পত্তি হলে স্থায়ীভাবে জামায়তের
নিবন্ধন বাতিল এবং নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ার ব্যাপারটি সম্পর্কে স্পষ্ট হওয়া
যাবে। এ কারণেই এই আপিলের নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত শীর্ষ
যুদ্ধপরাধীদের বিচারের দাবিতে ঐতিহাসিক গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন থেকে
জামায়াত নিষিদ্ধের প্রবল দাবি ওঠে। পরবর্তী সময়ে ওই বছর আগস্ট মাসে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে
সাংগঠনিকভাবে জামায়াতের অপরাধ এবং বিচার নিয়ে তদন্ত করে। ২০১৪ সালের ২৫
মার্চ তদন্ত সংস্থা প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক অপরাধ
(ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর সাতটি ধারায় জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা
হয়। এগুলো হচ্ছে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, জেনেভা কনভেনশন
ভঙ্গ, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অপরাধ এবং এ ধরনের অপরাধে সহযোগিতা ও
ষড়যন্ত্র। তদন্ত প্রতিবেদনে জামায়াতের পাশাপাশি দলটির ছাত্র সংগঠন ইসলামী
ছাত্র সংঘ, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর বিরুদ্ধে
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এবং জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার
বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও অপপ্রচার (প্রপাগান্ডা) চালানোর অভিযোগ আনা হয়।
প্রতিবেদনে জামায়াত নিষিদ্ধ এবং সংশ্নিষ্টদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত চায় তদন্ত
সংস্থা।
এ প্রতিবেদন দাখিলের পর সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে
ব্যক্তির অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে; কিন্তু সংগঠনের বিচারের জন্য
শাস্তির বিধান নেই। এ কারণে আইনের সংশোধনের প্রয়োজন। পরে এ লক্ষ্যে আইনের
প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত
সংশোধনীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের সংশ্নিষ্ট ধারায়
'ব্যক্তি' শব্দটির পর 'অথবা সংগঠন' সন্নিবেশ করা হয়। আরেকটি ধারায় 'দায়'
শব্দটির পরিবর্তে 'অথবা সাংগঠনিক দায়' এবং 'অভিযুক্ত ব্যক্তি' পরিবর্তে
'অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সংগঠন' শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়। এভাবে আইনটি
সংশোধন হলে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচারে আর
কোনো বাধা থাকবে না। আইন সংশোধন হলে যথাযথ বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে
জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার পথও খুলে যাবে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত পাঁচ বছর ধরে এই সংশোধনী মন্ত্রিপরিষদের সভায় ওঠার
অপেক্ষায় আছে। গত রোববার আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক জানান, তিনি আশা
করছেন, দ্রুতই সংশোধিত আইনের খসড়া মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদনের জন্য উঠবে।
অপেক্ষা আর কত দিন! :একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আবদুল আলীম চৌধুরীর
স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সমকালকে জানান, 'আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে
জানি না। যতদিন বেঁচে আছি জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি করেই যাব। সরকার বার বার
আশ্বাস দিচ্ছে। কতদিনে এই আশ্বাস পূরণ হবে সেটা জানা যাচ্ছে না। স্পষ্ট করে
বলতে চাই, জামায়াত নিষিদ্ধ না হলে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের
ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না বলেই মনে করি।'
তিনি আরও বলেন, একাত্তরের শহিদ পরিবারের বেশিরভাগই জানতে পারেনি সে সময়
তাদের স্বজনদের কোন ব্যক্তি হত্যা করেছিল। তারা দেখেছে হত্যা করেছে রাজাকার
বাহিনী, আলবদর বাহিনী, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্র সংঘ, পাকিস্তানি
হানদাররা। অতএব যুদ্ধাপরাধের দায়ে এসব সংগঠনের বিচার হওয়া জরুরি এবং এসব
সংগঠনের রাজনীতি স্বাধীন বাংলাদেশে চলতে পারে না।'
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির
সমকালকে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের জন্য নুরেমবার্গ
ট্রাইব্যুনালে যে বিচার হয়েছিল, সেখানে ব্যক্তির অপরাধের বিচারের পাশাপাশি
নাৎসি বাহিনীসহ যুদ্ধাপরাধে জড়িত চারটি সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। একাত্তরে
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠতম মিত্র হিসেবে গণহত্যা, গণধর্ষণের মূল
সহযোগী ছিল জামায়াতে ইসলামী এবং ওই সংগঠনের ব্যানারেই মানবতাবিরোধী অপরাধ
সংঘটনে সরাসরি যুক্ত ছিল রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটি। অতএব
সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচার না হলে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের
পূর্ণাঙ্গ বিচার হয় না।
তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জামায়াত নিষিদ্ধ
করেছিলেন, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন গভীর দূরদৃষ্টি এবং জাতির
বৃহত্তর কল্যাণের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে
হত্যার পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে জামায়াতকে রাজনীতি করার
সুযোগ করে দেওয়ার মতো দুস্কর্ম করেন। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে- এখন পর্যন্ত
জামায়াতকে নিষিদ্ধ না করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগ সেই
দুস্কর্মের দায় বহন করে চলেছে। তিনি আরও বলেন, আইন সংশোধন না করেও
জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব। সংবিধানের ধারা ৩৮ এর (গ) এর মাধ্যমে
জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা যায়। এ ছাড়া ২০১১ সালের সন্ত্রাস দমন আইন অনুযায়ী
সন্ত্রাসী দল হিসেবেও জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন শুধু
রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
শাহরিয়ার কবির বলেন, বাংলাদেশে ধর্মের নামে হত্যা, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের
উৎস এবং লালনকারী দল হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। অতএব জামায়াতকে রাজনীতি করার
সুযোগ দিয়ে সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। জামায়াত নিষিদ্ধ
হয়নি বলেই জামায়াতের মুখপত্র সংগ্রাম একাত্তরের ভয়ংকর ঘাতক কাদের মোল্লার
নামের আগে 'শহীদ' বিশেষণ ব্যবহারের স্পর্ধা দেখাচ্ছে।
একাত্তরের গেরিলা কমান্ডার ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন
ইউসুফ বাচ্চু সমকালকে বলেন, জামায়াত নিষিদ্ধের জন্য বছরের পর বছর ধরে দাবি
জানিয়ে যাচ্ছি। রাজনীতির কোন সমীকরণ কিংবা কী কারণে জামায়াত নিষিদ্ধ করা
হচ্ছে না, সেটা জানি না। বাস্তবতা হচ্ছে একাত্তরের মানবতার বিরুদ্ধে
সুপরিকল্পিত অপরাধে যুক্ত জামায়াত নিষিদ্ধ হতেই হবে। জামায়াত নিষিদ্ধ না
হলে এ দেশে সব সময়ই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক
মূল্যবোধ এবং শান্তি সব সময়ই হুমকির মধ্যে থাকবে। জামায়াত ধর্মের নামে নরম
মনের মানুষকে বিভ্রান্ত করে মানুষ হত্যা ও সন্ত্রাসের রাজনীতি চালিয়ে
যাচ্ছে। ত্রিশ লাখ শহীদের স্বাধীন বাংলাদেশে এটা চলতে পারে না। তিনি বলেন,
আশা করি আইনমন্ত্রী আইনানুগভাবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে জরুরি গুরুত্ব দিয়ে
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।
- বিষয় :
- জামায়াত
