ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

নির্বাচন কমিশনে বিএনপির ২১ দফা

ভোটের আগে হয়রানি নয়: সিইসি

ভোটের আগে হয়রানি নয়: সিইসি
×

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা -ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২০ | ০৯:৪৯

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার সঙ্গে দেখা করে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল ২১ দফা দাবি উত্থাপন করেছে। ঢাকার দুই সিটি ভোটে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়েও তাদের আপত্তি তুলে ধরেছে বিএনপি।

সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সিইসির সঙ্গে সাক্ষাতে বিএনপির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপির পক্ষ থেকে ২১ দফা লিখিত দেওয়া হলেও এর মধ্যে ইভিএম প্রসঙ্গে কিছুই বলা হয়নি। তবে সিইসির সঙ্গে বৈঠকে ইভিএম প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়।

পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিইসি জানান, বিএনপি পুলিশি হয়রানি, প্রার্থীদের ভয়ভীতি এবং হামলার অভিযোগ করেছে। কমিশনের পক্ষ থেকে তাদের বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বসে তাদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হবে, যাতে নির্বাচনের সময় নিষ্প্রয়োজনীয় হয়রানি না করে।

সিইসি বলেন, নিষ্প্রয়োজনীয় কোনো হয়রানি করা যাবে না। তবে এর অর্থ এই নয় কেউ ক্রিমিনাল অফেন্স (ফৌজদারি অপরাধ) করলে বা আদালত কারও বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে তাকে নির্বাচনী দোহাই দিয়ে গ্রেপ্তার করা যাবে না। তিনি বলেন, কোনটি প্রয়োজনীয় কোনটি নিষ্প্রয়োজনীয় তা নিয়ে কমিশন পুলিশের সঙ্গে বসবে। এজন্য ইসি কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ আলমগীরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনি নিজেও আলাদাভাবে কথা বলবেন বলে জানান। সিইসি বলেন, ইতোমধ্যে তার সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা হয়েছে। তারা (পুলিশ) কখনও নির্বাচন নিয়ে পক্ষপাতমূলক আচরণ করবে না।

তিনি বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি পালনের বিষয়ে পত্রপত্রিকায় সংবাদ দেখে রিটার্নিং অফিসাররা অ্যাকশন নিয়েছেন। রিটার্নিং অফিসাররা আইনকানুন ও বিধি মেনেই নির্বাচন পরিচালনা করবেন। কোনো পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই। কে কোন দল করে তা তারা দেখা হবে না। আইন ও বিধির মধ্যে থেকে সুষ্ঠুভাবে তারা নির্বাচন পরিচালনা করবেন।

সিইসি বলেন, বিএনপি দাবি জানালেও ইভিএম থেকে সরে আসার কোনো পরিকল্পনা ইসির নেই। এটা সম্ভবও নয়। ইভিএমে ভোটগ্রহণে ইসি সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তিনি বলেন, ইভিএম নিয়ে বিএনপি আপত্তি করেছে। তবে কমিশন তাদের বুঝিয়ে বলেছে- ইভিএম নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এখানে নীরবে কারচুপির কোনো সুযোগ নেই। ইভিএমে যার ভোট কেবল তিনিই দিতে পারবেন। জাল ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোনোরকম অনিয়ম হওয়ার সুযোগ নেই। ইভিএমের মাধ্যমে সুষ্ঠু ভোটের নানা প্রটেকশন নেওয়া হয়েছে। অতীতে ব্যালট ছিনতাই, পুড়িয়ে দেওয়াসহ নানা অনিয়ম হতো। এসব থেকে পরিত্রাণের জন্যই ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ইভিএমের মাধ্যমে সংসদ নির্বাচনসহ অনেক নির্বাচন হয়েছে। সেখানে কোনো কারচুপির অভিযোগ আসেনি। ভোটারদের মাঝে এটা নিয়ে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল না। প্রার্থীরাও কোনো অভিযোগ করেননি। ইভিএম অফলাইন পদ্ধতি হওয়ার ফলে এটা হ্যাকিংয়ের কোনো সুযোগও থাকবে না। এর প্রোগ্রামিং কমিশনের হাতে থাকবে। আগে প্রোগ্রামিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। এটা ভোটগ্রহণের আগে কেউ খুলতে পারবে না। আর নির্ধারিত সময়ের পর তা বন্ধ হয়ে যাবে।

এদিকে বৈঠক থেকে বেরিয়ে বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে বিএনপি চেষ্টা করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে তারা এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশে নির্বাচনের কোনো পরিবেশ নেই। নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই।

সাবেক এই বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালে ভোটার ও প্রার্থীবিহীন নির্বাচন করে ক্ষমতা দখল করা হয়েছে। ২০১৮ সালে ভোটের আগে মধ্যরাতে ব্যালট বাপ ভর্তি করে ক্ষমতায় আসা হয়েছে। আর এখনকার নির্বাচনে নতুন পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে, যার নাম ইভিএম। এর মাধ্যমে তারা নির্বাচনে জয়ী হতে চায়।

তিনি বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে কমিশনকে বলা হয়েছে ইভিএম নীরব, নির্দেশিত, নিঃশব্দ ও স্বয়ংক্রিয় ভোট চুরির প্রকল্প ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ প্রোগ্রামিং এখানে দেখা যাচ্ছে না। প্রিন্ট করার সুযোগ নেই। এখানে ভোটাররা জানতে পারছেন না ভোট কোথায় যাচ্ছে। ইভিএম নিয়ে তাদের মধ্যেই দ্বিমত ছিল। ইভিএমের টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য জামিলুর রেজা চৌধুরী এটাতে সই করেননি। এই ইভিএমে ভেরিফাই করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের শত শত কোটি টাকা চুরির মতোই নীরবে নিঃশব্দে ভোট চুরির প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। জোর করে ব্যালটবাপ ভর্তি করারও একটা কষ্ট আছে। ইভিএমে তাও নেই। ফল নিয়ন্ত্রিত হবে তাদের করা প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে। এখানে সবকিছু ঠিক থাকবে, পরিবেশ শান্ত থাকবে কিন্তু ফল তারা যা চাইবে তা হবে। ইভিএম নিয়ে ইসির যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আমীর খসরু বলেন, বিএনপি ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের অভিযান চলছে। ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। ইসি কথা দিয়েছে অভিযান আর হবে না। দৃশ্যমান কোনো ঘটনা না ঘটলে ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত গ্রেপ্তার বন্ধ থাকবে। এ মুহূর্তে দৃশ্যমান কোনো ঘটনা না ঘটলে (যেমন মার্ডার) কোনো গ্রেপ্তার হবে না।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বিএনপির এক প্রার্থীকে গ্রেপ্তার ও আরেকজনকে অপহরণের পর মুন্সীগুঞ্জের আলু ক্ষেতে পাওয়া গেছে। সংরক্ষিত নারী আসনের এক প্রার্থীর বাড়িতে হামলা করা হয়েছে। ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।

বিএনপির প্রতিনিধি দলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনে তাদের দলীয় মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বিজন কান্তি সরকার ও যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে সিইসি ছাড়াও নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম ও কবিতা খানম উপস্থিত ছিলেন।

ইসিতে বিএনপির ২১ দফা : প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সই করা ২১ দফা দাবি কমিশনের কাছে দেওয়া হয়। এতে রয়েছে- নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে কোনো ধরনের মামলায় প্রার্থীদের গ্রেপ্তার করা যাবে না। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া প্রার্থীদের দ্রুত জামিনের ব্যবস্থা নিতে হবে। ইসির অনুমতি ছাড়া নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব ধরনের অভিযান স্থগিত রাখতে হবে। নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা ম্যাজিস্ট্রেটদের তালিকা এক সপ্তাহ আগে প্রার্থীদের দিতে হবে। প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তার তালিকা তৈরি করতে হবে প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে এবং এক সপ্তাহ আগে এই তালিকা প্রার্থীদের দিতে হবে। নির্বাচনী প্রচারের সময় সংশ্নিষ্ট এলাকায় কোনো প্রকল্প উদ্বোধন করা যাবে না। সরকার নিয়ন্ত্রিত রেডিও ও টিভিতে প্রার্থীদের প্রচারে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি টিভিতে নির্বাচনী সংবাদ প্রচারে সাম্য বজায় রাখার নির্দেশ দিতে হবে। নির্বাচনের আগে সব বৈধ অস্ত্র থানায় জমা দেওয়ার নির্দেশ দিতে হবে। নির্বাচনী দায়িত্বে কোনো আধা-সরকারি বা বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ করা যাবে না। নির্বাচনী কেন্দ্রের ৫০০ মিটারের মধ্যে কোনো নির্বাচনী ক্যাম্প তৈরি না করার নির্দেশ দিতে হবে। নির্বাচনের দিন কেন্দ্র থেকে ৫০০ মিটার পর্যন্ত এলাকায় সশস্ত্র বাহিনীর আওতাধীন বলে ঘোষণা করতে হবে। মেয়র প্রার্থীদের নিরাপত্তায় ১০ সদস্যের বিশেষ নিরাপত্তা টিম নিয়োগ দিতে হবে। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে প্রতি কেন্দ্রে নিরাপত্তা সেল তৈরি করতে হবে এবং এই সেলের সঙ্গে অভিযোগকারীদের সহজেই যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখতে হবে। কেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা দিয়ে নিরপেক্ষভাবে তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে। পোলিং এজেন্টদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে দেশি-বিদেশি সব পর্যবেক্ষককে সর্বাত্মক সহায়তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। সব ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের অবাধে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে। ভোট গণনার অভিযোগ উঠলে সঙ্গে সঙ্গে পুনঃগণনার ব্যবস্থা রাখতে হবে। গণনার সময় গণমাধ্যমকর্মী ও পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন-সংক্রান্ত সব ধরনের অভিযোগ ইসিকে দ্রুত অবহিত করার জন্য বিশেষ সাক্ষাতের অনুমোদনপত্র দিতে হবে।

আরও পড়ুন

×