ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রশি দিয়ে বাঁধা সিলিং ফ্যান গরমে কাবু শিশু শিক্ষার্থীরা

রশি দিয়ে বাঁধা সিলিং ফ্যান গরমে কাবু শিশু শিক্ষার্থীরা
×

এটি বানীগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভাঙাচোরা বেড়ার ঝুপড়ি ঘরে চলে পাঠদান সমকাল

আহমদ উল্লাহ, পটিয়া (চট্টগ্রাম)

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা। পটিয়ার কোলাগাঁও ইউনিয়নের বানীগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ঢুকতেই চোখে পড়ে ভাঙাচোরা টিনের সেমিপাকা ভবন, দেখে মনে হবে এটি কোনো ঝুপড়ি। এই ভবন ৫ বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া হলেও কাজ হয়নি। জীর্ণ এই ভবনের দুটি কক্ষে পাঠদান করা হয়। পাশে একতলা একটি পাকা ভবন– সেটির একটি কক্ষ অফিস ও অন্যটি শ্রেণির কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। 

বিদ্যালয় ভবনে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, চারপাশের পরিবেশ স্যাঁতসেঁতে। একটি শ্রেণি কক্ষে খুলে যাওয়া সিলিং ফ্যান দড়ি ও গাছের ডাল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। যে কোনো সময় এটি খুলে শিক্ষার্থীদের মাথায় পড়তে পারে। ফ্যান না চলায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা গরমে কাবু। এমনিতে টিনের ঘর প্রচণ্ড গরম, শিশুরা ঘামে ভিজে একাকার। অনেকে পড়ার ফাঁকে হাতপাখা দিয়ে নিজেকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছে। 

জানা যায়, ২০২০ সালে বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রকল্প থেকে পৌনে ৫ কোটি বরাদ্দ দেওয়া হলেও সাবেক সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরীর সঙ্গে ঠিকাদারের বিরোধের কারণে ভবন নির্মাণ হয়নি, টাকা ফেরত গেছে।
শিক্ষকরা জানান, শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে একাধিক শ্রেণিতে একসঙ্গে পাঠদান করতে হয়। রয়েছে শিক্ষক সংকট। আর অবকাঠামোর অবস্থা জীর্ণ। অভিভাবক জাকির হোসেন বলেন,

‘২০২১ সালে ভবন সংস্কারের কাজ শুরু হলেও পরে বন্ধ হয়ে যায়। আমরা বহুবার শিক্ষা অফিসে বলেছি, কিন্তু কেউ আসে না। আমাদের বাচ্চারা ভয়ে ভয়ে স্কুলে আসে, কখন টিনের চালা খুলে পড়ে।’
নির্মাণকাজ বন্ধ পাঁচ বছর: জানা গেছে, বিদ্যালয়ে বর্তমানে ২৬৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রধান শিক্ষকসহ আছেন সাতজন শিক্ষক, তাদের মধ্যে একজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। ১৯৯২ সালে রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে এই স্কুল। 
দীর্ঘদিন একতলা সেমিপাকা ভবনে পাঠদান চললেও ভবনটি ২০২০ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ওই বছর এলজিইডি ৪ কোটি ৭৩ লাখ ৬১ হাজার ৩০০ টাকা বরাদ্দ দেয় বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য। পুরোনো ভবন ভেঙে কাজও শুরু হয়, পাইলিং সম্পন্ন হয়। কিন্তু হঠাৎ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তারপর কেটে গেছে পাঁচ বছর– নতুন ভবন আর হয়নি। 

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিল্পী বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা বারবার উপজেলা শিক্ষা অফিসে জানিয়েছি। দায়িত্বশীলরা পরিদর্শন করলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এখন টিনের ঘরে ক্লাস চলছে, যেটি ঠিকাদার অস্থায়ীভাবে তৈরি করেছিল। সেটিও এখন নড়বড়ে। বৃষ্টি হলে টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে।’ 
সহকারী শিক্ষক অনিমেষ দে বলেন, ‘গরমে শিশুরা ক্লাসে টিকতে পারে না। মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। তাই শিক্ষার্থীর উপস্থিতিও কমছে। জীর্ণ ঘরে পাঠদানের পরিবেশ একেবারেই নেই।’
বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাব্বী জানায়, ‘বৃষ্টি হলে আমরা ভয়ে থাকি। টিনের ঘরটির এখানে সেখানে ভাঙা। কখন যে ভেঙে পড়ে! মাঠও নেই, খেলতেও পারি না।’
বরাদ্দ ফেরত গেছে ঠিকাদারি জটিলতায়: বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী আফিয়া নূরের পিতা ও কোলাগাঁও ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আহমদ নুর জানান, ‘২০২০ সালে বিশ্বব্যাংকের তহবিল থেকে ভবন নির্মাণের জন্য টাকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরীর সঙ্গে ঠিকাদারের বিরোধের কারণে কাজ থেমে যায়। ফলে বরাদ্দ ফেরত যায়।’

পটিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কর্মকার বলেন, ‘পুরো উপজেলার মধ্যে এমন জীর্ণ বিদ্যালয় আর নেই। শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ না রাখতে আপাতত টিনের ঘরে ক্লাস চলছে। ভবন নির্মাণে নতুন করে বরাদ্দের জন্য চিঠি দিয়েছি।’
পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ খুব জরুরি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই দ্রুত ভবন নির্মাণ শুরু হবে।’ 

আরও পড়ুন

×