বন্যায় বাড়ে কান্নার জল
আগাম সবজি ক্ষেতের সর্বনাশ
চন্দনাইশ উপজেলার শঙ্খ নদী তীরবর্তী এলাকায় একটি আগাম সবজির ক্ষেত বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে সমকাল
মুহাম্মদ এরশাদ, চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় কৃষি, মৎস্য ও যোগাযোগ খাতে প্রায় ১২৮ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানি নেমে গেলেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, মাছের পুকুর, সড়ক ও সেতুর সংযোগ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জনজীবন ও স্থানীয় অর্থনীতি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে শতাধিক কাঁচা ও মাটির ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় আগাম সবজি ক্ষেতের বড় ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, টানা বর্ষণে উপজেলার দুই পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। বন্যার পানিতে হাজার হাজার হেক্টর আউশ ধান, আউশ-আমনের বীজতলা, সবজিক্ষেত, পান, পেঁপে ও আখের জমি তলিয়ে যায়। পাশাপাশি ১ হাজার ৬৩০টি মাছের পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া উপজেলার ৩২টি সড়কের প্রায় ৪ দশমিক ৩০০ কিলোমিটার অংশ এবং আটটি সেতু-কালভার্টের অ্যাপ্রোচ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, কৃষি খাতে প্রায় ৭০ কোটি, মৎস্য খাতে ২৩ কোটি এবং যোগাযোগ অবকাঠামোতে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২৮ কোটি টাকা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষিবিদ আজাদ হোসেন জানান, প্রায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর আউশ ধান, ৯০০ হেক্টর সবজি ক্ষেত এবং ২০০ হেক্টর পেঁপে, পান ও আখের জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এতে কৃষি খাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সরকারি প্রণোদনা পাওয়া গেলে দ্রুত তাদের মধ্যে সহায়তা বিতরণ করা হবে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তানভীর আহসান বলেন, ‘বন্যায় অনেক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে, কোথাও পাড় ভেঙে অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে, আবার কোথাও দূষিত পানি প্রবেশ করায় রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। উপজেলার ১ হাজার ৬৩০টি পুকুর, যার মোট আয়তন ৩২৪ হেক্টর, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ২৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য চাষিদের সহায়তার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে পুনর্বাসনে এগিয়ে আসতে হবে।’
উপজেলা প্রকৌশলী তন্ময় নাথ জানান, বন্যায় দুই পৌরসভা ও আট ইউনিয়নের প্রায় ৪ দশমিক ৩০০ কিলোমিটার সড়ক এবং আটটি সেতু-কালভার্টের অ্যাপ্রোচ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগাযোগ অবকাঠামোতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মাহাবুবুল আলম শাওন বলেন, ‘বন্যায় উপজেলার অন্তত ১১০টি মাটির ও কাঁচা ঘরবাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান জানান, বন্যাকবলিত মানুষের জন্য এ পর্যন্ত ১৫০ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ জসীম উদ্দীন আহমদ বলেন, ‘সাম্প্রতিক বন্যায় স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন এ জনপদের মানুষ। কৃষকরা তাদের ফসল হারিয়েছেন, মৎস্যচাষিদের পুকুর ও প্রকল্প তলিয়ে গিয়ে মাছ ভেসে গেছে, রাস্তাঘাট ও সেতু-কালভার্ট ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে আমি ১৪টি ইউনিয়ন ও দুই পৌরসভার প্রায় ৩০ হাজার পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছি। বন্যার পানি নেমে গেলেও মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। এখন চন্দনাইশ-সাতকানিয়াকে পুনর্গঠন করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
- বিষয় :
- বন্যা