বেড়ানো
দক্ষিণের শেষ গ্রামে সেন্টমার্টিনের শোভা
শাহপরীর দ্বীপে পর্যটকের ঢল
সীমান্তঘেঁষা নাফ নদ ও সাগরের মোহনায় অবস্থিত শাহপরীর দ্বীপ ধীরে ধীরে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠছে সমকাল
আব্দুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা নাফ নদ ও সাগরের মোহনায় অবস্থিত টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ একসময় ছিল নীরব ও অবহেলিত এক জনপদ। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ প্রান্ত সাবরাং ইউনিয়নের শেষ গ্রাম এই দ্বীপটি এখন নতুন পরিচয়ে পরিচিত হতে শুরু করেছে। নাফ নদ, সাগর, ডুবন্ত সূর্য আর দূরে ভেসে থাকা প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন– এই চার উপাদানের অপূর্ব সম্মিলনে শাহপরীর দ্বীপে বাড়ছে পর্যটকদের আনাগোনা।
কড়াকড়ি ও বিধিনিষেধের কারণে অনেক পর্যটক সরাসরি সেন্টমার্টিনে যেতে না পারলেও তার বিকল্প গন্তব্য হিসেবে বেছে নিচ্ছেন শাহপরীর দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত। এখান থেকে একসঙ্গে দেখা যায় নাফ নদের প্রবাহ, উত্তাল সাগর, মিয়ানমারের পাহাড় আর দূরে ভেসে থাকা সেন্টমার্টিন দ্বীপ। বিশেষ করে বিকেলের পর সাগরের বুকে ডুবন্ত সূর্যের দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন পর্যটকরা।
সরেজমিন দেখা গেছে, ছুটির দিনগুলোতে টেকনাফ শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শাহপরীর দ্বীপের দক্ষিণ পাড় যেন একটি পর্যটনকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ভ্রমণপিপাসু মানুষজন নাফ নদ–সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। আগে যেখানে ছিল ফাঁকা সাগরপাড়, সেখানে এখন গড়ে উঠছে ছোট ছোট অস্থায়ী দোকান, চায়ের স্টল, খাবারের দোকান এবং পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা। স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে বাঁশ, কাঠ ও ত্রিপল দিয়ে এসব দোকান তৈরি করছেন।
দক্ষিণ পাড়ে সাগরের ধারে ডাব বিক্রি করছিল ১৪ বছর বয়সী আবু বক্কর। সে হাজির বশির আহমদ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি গত এক মাস ধরে এ কাজে যুক্ত হয়েছে সে। আবু বক্কর জানায়, প্রতিদিন শাহপরীর দ্বীপে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। এখান থেকে একসঙ্গে সেন্টমার্টিন, নাফ নদ আর সাগর দেখা যায় বলেই মানুষ আসছে। এতে তার পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু আয়ও হচ্ছে।
সাগরপাড়ে ছোট একটি দোকান চালান মো. আজম। তিনি বলেন, ‘শিশুদের চকলেট, বিস্কুট, পানি ও হালকা খাবার বিক্রি করি আমি। প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার বিক্রি হয়। শুক্রবার ও শনিবার বিক্রি আরও বাড়ে। একসময়ের নীরব এলাকাটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় পর্যটনস্পটে পরিণত হচ্ছে।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, পর্যটকদের আগমনে শাহপরীর দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। নৌকা চালানো, দোকান দেওয়া, খাবার বিক্রি, পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা করা– এ ধরনের নানা কাজে যুক্ত হচ্ছেন দ্বীপের বাসিন্দারা। যারা আগে মূলত মাছ ধরা কিংবা দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, তারা এখন বিকল্প আয়ের পথ পাচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে অপরিকল্পিত দোকানপাট ও ভিড় বাড়লে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও করছেন সচেতন মহল।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা সরকারি চাকরিজীবী আমির হোসেন বলেন, ‘সেন্টমার্টিন যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও টিকিট না পাওয়ায় যেতে পারিনি। পরে জানতে পেরে শাহপরীর দ্বীপের শেষ প্রান্তে চলে আসি। এখান থেকে স্পষ্টভাবে সেন্টমার্টিন দেখা যায়– এটা কল্পনাও করিনি। নাফ নদ, সাগর আর মিয়ানমারের পাহাড়ের দৃশ্য মিলিয়ে পরিবেশটা সত্যিই অসাধারণ। সেন্টমার্টিনে যেতে না পারার আক্ষেপ অনেকটাই কেটে গেছে।
দ্বীপের বাসিন্দা ইবনে আমিন বলেন, শাহপরীর দ্বীপ প্রাকৃতিক দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আগে এসব সৌন্দর্য মানুষের অজানা ছিল। এখন পর্যটক বাড়ছে, বিশেষ করে সন্ধ্যায় ডুবন্ত সূর্য দেখতে মানুষের ভিড় হয়। এতে স্থানীয়দের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটি একটি টেকসই পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
সাবরাং ইউনিয়নের দক্ষিণ পাড়ার ইউপি সদস্য আবদুল মান্নান বলেন, শাহপরীর দ্বীপের শেষ প্রান্ত এখন ভ্রমণপিপাসুদের নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয়ভাবে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে, যাতে কেউ কোনো অসুবিধায় না পড়ে।
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, নাফনদ, পাহাড় ও সাগরের একসঙ্গে দৃশ্য দেখার জন্য পর্যটকরা এখানে আসছেন। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি পর্যটকরা যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও প্রশাসন নজর রাখছে।
সব মিলিয়ে নাফনদ–সাগর, ডুবন্ত সূর্য আর দূরে ভেসে থাকা সেন্টমার্টিনের দৃশ্য শাহপরীর দ্বীপকে এনে দিয়েছে নতুন পরিচিতি। সীমান্তের শেষ গ্রাম হয়েও এই দ্বীপ এখন পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠছে এক অনন্য গন্তব্য।
- বিষয় :
- সেন্টমার্টিন
