‘সকালে বিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ বিকেলে চালু হয় কোন জাদুতে’
রামগতির লোকালয়ে ফসলি জমি ও ঘরবাড়ির পাশে গড়ে উঠেছে ইটভাটা সমকাল
মিসু সাহা নিক্কন, রামগতি (লক্ষ্মীপুর)
প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
রামগতিতে প্রশাসনের একের পর এক অভিযান চললেও বন্ধ হয়নি একটি অবৈধ ইটভাটাও। উল্টো গত তিন বছরে উপজেলায় নতুন করে গড়ে উঠেছে আরও ১৩টি। বর্তমানে রামগতির ৫৩টি ইটভাটায় জ্বলছে বনের কাঠ ও কৃষিজমির মাটি। এসব ভাটার মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র দুটির। বাকি ৫১টি ভাটা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ আদালত অবৈধ সব ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রশাসন সকালের অভিযান চালিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলে বিকেলে তা আবার চালু হয়। এ নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের ওপর ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, ‘অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। ভেঙে দেওয়ার পর আবার চালু করলে থানায় মামলা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।’
সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ফসলি জমির মাঝখানে গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলোয় নিয়মিত ইট পোড়ানো হচ্ছে। দিন-রাত ব্যস্ত শ্রমিকরা। কোথাও কোথাও শিশু শ্রমিকের উপস্থিতিও চোখে পড়েছে। প্রশাসনের অভিযানে কোথাও চিমনি ভাঙা আবার কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও বাস্তবে কোনো ভাটাই স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়নি।
চররমিজ ইউনিয়নের বাসিন্দা মনির উদ্দিন বলেন, ‘সকালে প্রশাসন এসে চিমনি ভেঙে দেয়, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। কিন্তু বিকালে আবার ভাটা চালু হয়। প্রশ্ন হলো বিদ্যুৎ সংযোগ আসে কীভাবে, ভাটার মালিকরা কি এতটাই প্রভাবশালী যে প্রশাসনও অসহায়। এখন পর্যন্ত একজন ভাটা মালিকেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি।’
গত মৌসুমে উপজেলায় ইটভাটার সংখ্যা ছিল ৪৯টি; যার মধ্যে বৈধ ছিল মাত্র দুটি। চলতি মৌসুমে নতুন করে আরও চারটি ভাটা গড়ে উঠেছে। বর্তমানে চর আফজল গ্রামেই রয়েছে ২৭টি ইটভাটা। এত সংখ্যক ভাটা এক এলাকায় থাকায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর লক্ষ্মীপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক হারুন অর রশিদ পাঠান বলেন, ‘রামগতির ৫৩ ইটভাটার মধ্যে বনলতা ব্রিকস ও সরকার ব্রিকস নামে দুটি ইটভাটার পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে। বাকি ৫১টি ভাটা অবৈধ।
এগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে, পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি জানান জেলায় শতাধিক ইটভাটা রয়েছে যেগুলোর বৈধ কাগজপত্র নেই।
জেলা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির রামগতি জোনাল অফিসের উপ মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘৫৩টি ইটভাটার মধ্যে সাতটির বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। বাকিগুলো অবৈধ সংযোগে চলছে। সংযোগ বিচ্ছিন্নের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ তবে অভিযানের পর বিচ্ছিন্ন সংযোগ কীভাবে পুনরায় চালু হয় সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি।
ইটভাটা বন্ধে হাইকোর্টে রিটকারী জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালাহউদ্দিন দোলন বলেন, ‘রামগতি ও কমলনগরের সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। কিন্তু সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মজিবুর রহমান বলেন, ‘অনুমতি ছাড়াই অধিকাংশ ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এসব ভাটার কারণে তিন ফসলি জমির টপসয়েল নষ্ট হচ্ছে যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কৃষির জন্য মারাত্মক হুমকি।’
চর আফজল গ্রামের বাসিন্দা শারাজ উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিবছর বলা হয় ইটভাটা বন্ধ হবে কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয় না। দু-চারদিন অভিযান চলে জরিমানা হয় তারপর আবার সব আগের মতোই চলতে থাকে। একসময় এসব এলাকায় ধান ও সবজির ভালো উৎপাদন হতো। এখন চারদিকে ইটভাটার বিষক্রিয়ায় ফসল নষ্ট হচ্ছে, বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কামনাশিস মজুমদার বলেন, ‘পরিবেশসম্মত না হলে ইটভাটার কারণে শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এমনকি ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়ে।’
পরিবেশবাদী সংগঠন সবুজ বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বাবু বলেন, ‘অবৈধ ইটভাটা শুধু ফসলি জমি ধ্বংস নয়, পরিবেশ ও নদীভাঙন বৃদ্ধিতেও বড় ভূমিকা রাখছে। কার্যকর ও কঠোর অভিযান ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন নীপা বলেন, ‘গত মৌসুমে ৫১টি ইটভাটায় ৫৮ বার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ৮৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। চলতি মৌসুমেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
- বিষয় :
- ইটভাটা
