এনআইসিইউ থেকে ছড়াচ্ছে জীবাণু
.
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৪ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৬:৪৮
আজ ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে দিনটি পালিত হচ্ছে। ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৭২তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সমাবেশে রোগীর সুরক্ষায় বিশ্বব্যাপী পদক্ষেপ কর্মসূচি গৃহীত হওয়ার মাধ্যমে ১৭ সেপ্টেম্বরকে ‘বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস’ ঘোষণা করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রত্যেক নবজাতক এবং প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ যত্ন’। বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য বিশ্বব্যাপী রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এ উপলক্ষে সমকালের এই বিশেষ আয়োজন।
অত্যন্ত সংকটাপন্ন নবজাতকের চিকিৎসায় নির্ভরযোগ্য সেবাকেন্দ্র নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ)। অথচ এসব কেন্দ্রে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় সেখান থেকেই শিশুদের শরীরে ছড়াচ্ছে ভয়ংকর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু। চিকিৎসা নিতে এসে নতুন সংক্রমণ নিয়ে বাড়ি ফিরছে শিশুরা।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সরকারি হাসপাতালে পরিচালিত এক গবেষণায় উদ্বেগজনক এমন তথ্য উঠে এসেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুপস্থিত থাকায় এনআইসিইউতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর উপস্থিতি ও বিস্তার কতটা– জানতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত একটি সরকারি হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি হওয়া ৩৬০ শিশুর ওপর এ গবেষণা পরিচালিত হয়।
শিশুদের পায়ুপথের আশপাশ অঞ্চল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার পর দেখা যায়, এনআইসিইউতে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ৩১ শতাংশ শিশুর শরীরে কার্বাপেনেম প্রতিরোধী ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়ার (সিআর-কেপিএন) জীবাণু পাওয়া গেছে। তিন দিন পর এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ শতাংশে। সাত দিন পর ৬৯ শতাংশ, দুই সপ্তাহে ৭২ শতাংশ এবং তিন সপ্তাহ পর্যন্ত ভর্তি থাকা শিশুদের ৭৩ শতাংশের শরীরে এই ভয়ংকর জীবাণুর উপস্থিতি মেলে।
এমন পরিস্থিতিতে আজ বুধবার সারাবিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য– ‘প্রতিটি নবজাতক ও শিশুর জন্য নিরাপদ যত্ন’।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদন বলছে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বাড়লেও নবজাতকের জীবনের প্রথম সপ্তাহে মৃত্যুহার কমার গতি মন্থর হয়েছে, যার একটি প্রধান কারণ হচ্ছে নিম্নমানের চিকিৎসা ব্যবস্থা। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ২৩ লাখ নবজাতক মারা যায়, যার প্রায় ১৫ শতাংশ মৃত্যুর কারণ হলো রক্তে সংক্রমণ। দ্য ল্যান্সেট কমিশন অন হাই কোয়ালিটি হেলথ সিস্টেমস অনুযায়ী, গুণগত মানসম্পন্ন চিকিৎসা যা নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করা গেলে নবজাতকের ৬০ শতাংশ মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকা, দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন থাকা, অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং কার্যকর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব এ ধরনের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্ট (এএমআর) জীবাণুর বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে সময়মতো সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় দেখা গেছে, যথাযথ আইপিসি ব্যবস্থা গ্রহণের পর নবজাতকের রক্তে সংক্রমণের হার এবং মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। গবেষণার সময় আইপিসি ব্যবস্থা নিশ্চিত করে দুই সপ্তাহ পরপর সংক্রমণ পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা যায়, ভর্তি হওয়া প্রতি ১০০ নবজাতকের মধ্যে রক্তে সংক্রমণের হার ২৩ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে কমে ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মৃত্যুহারও হ্রাস পায়। প্রথমদিকে যেখানে মৃত্যুহার ছিল প্রায় ১৭ শতাংশ, তা ধীরে ধীরে কমে দাঁড়ায় ১৪ শতাংশে।
এ গবেষণা দলের একজন সদস্য আইসিডিডিআর,বির অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ডা. গাজী মো. সালাহ্উদ্দীন মামুন বলেন, সিআর-কেপিএন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু নবজাতকের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। যথাযথ আইপিসি ব্যবস্থা না থাকলে এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তবে সঠিক আইপিসি ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
তিনি আরও জানান, তারা চিকিৎসা পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি হাসপাতালের সার্বিক তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে— নিয়মিত চাদর পরিষ্কার ও পরিবর্তন হচ্ছে কিনা; ফ্লোর যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত করা হচ্ছে কিনা, এসব তদারকি। এই কার্যকরী উদ্যোগের মাধ্যমে রক্তে সংক্রমণের হার সর্বাধিক হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে।
২৪ শতাংশ হাসপাতালে নেই সংক্রমণ প্রতিরোধী ব্যবস্থা
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ২৪ শতাংশ হাসপাতালে নেই সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। ৪১ শতাংশের আছে কেবল প্রাথমিক ব্যবস্থা, ১৯ শতাংশে মাঝারি মানের এবং মাত্র ১৬ শতাংশ হাসপাতালে উন্নত সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে। ৬৫ শতাংশ হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল। সরকারি হাসপাতাল ও জাতীয় ইনস্টিটিউটগুলোর মধ্যে এই দুর্বলতার হার আরও বেশি, ৮২ শতাংশ।
গবেষক দলের সদস্য ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. রাহনুমা পারভীন বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক উন্নত সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকলেও সরকারি হাসপাতাল ও জাতীয় ইনস্টিটিউটগুলোতে এ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে পেশাদার লোকবল অপ্রতুল। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞের অভাবও রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে অনেক সময় আইপিসি গাইডলাইন নেই বা মানা হচ্ছে না। প্রশিক্ষণ নেই। মূল্যায়ন ও তদারকিরও কোনো ব্যবস্থা নেই।
আইসিইউর জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফজলে রাব্বি জানান, বর্তমানে এমন কিছু সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে,
যেগুলো সাধারণত হাসপাতালের নিবিড়
পরিচর্চা কেন্দ্রে (আইসিইউ) সীমাবদ্ধ থাকার কথা। কিন্তু এখন তা কমিউনিটিতেও পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে অ্যাসিনেটোব্যাক্টর নামে একটি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে
ছড়িয়ে পড়ছে, যা মূলত হাসপাতালের আইসিইউতে দেখা যায়। এখন তা বাইরের সমাজেও ছড়িয়ে পড়ছে, যা হাসপাতাল থেকে জীবাণু ছড়ানোর বাস্তব প্রমাণ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ সমকালকে বলেন, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) একটি বাস্তব ও প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি। রোগীর নিরাপত্তা এবং সেবার মান
নিশ্চিত করতে এটি অত্যাবশ্যক। কিন্তু দেশে আইপিসি ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে হাসপাতালগুলোই এখন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, অনেক সময় রোগীরা এক সংক্রমণ থেকে সুস্থ হতে হাসপাতালে ভর্তি হলেও সেখানে গিয়ে নতুন সংক্রমণ নিয়ে বাড়ি ফেরেন, যা তাদের আগে ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব সংক্রমণ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট। ফলে প্রচলিত ওষুধে তা আর সাড়া দিচ্ছে না।
