সাক্ষাৎকার: ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন
তিনি ছিলেন গরিব মানুষের নেতা
ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন
সাক্ষাৎকার গ্রহণ জাকির হোসেন
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২০ | ০১:৫৮
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে?
উত্তর : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয় দু'ভাবে। একটা হলো আদর্শগতভাবে। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে তিনি ৬ দফা প্রস্তাব পেশ করেন। ৬ দফা পড়ে মনে হয়েছে, বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। এভাবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সঙ্গে পরিচয়। চাক্ষুষ পরিচয় ১৯৭৩ সালের জুলাই বা আগস্টের কোনো একটা তারিখে, যেদিন থেকে তার একান্ত সচিব হিসেবে কাজ শুরু করি।
প্রশ্ন :একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের শুরুর দিনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কী কথা হয়েছিল?
উত্তর :ছিলাম বিসিকের পরিচালক। বদলি হলাম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপসচিব (নথি) হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তখন পুরোনো গণভবনের দোতলায় বসতেন। সকাল ১০টায় কাজে যোগদান করলাম। প্রধানমন্ত্রীর সচিব রফিকউল্লাহ চৌধুরীর (জাতীয় সংসদের বর্তমান স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর বাবা) কাছে যোগদানপত্র দিলাম। তিনি জানালেন, জাতির পিতা বিকেল ৩টায় দেখা করতে বলেছেন। ৩টায় গেলাম। কদমবুচি করে দাঁড়ালাম জড়োসড়ো হয়ে। দেখলাম, বঙ্গবন্ধু আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছেন। বললেন, 'কী মিয়া, তুমি তো ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলে, এসএম হলের ভিপি ছিলে; কিন্তু ছাত্রলীগের সব বড় নেতা তোমার প্রশংসা করে। কী ব্যাপার বল তো?' বললাম, স্যার, তারাই ভালো বলতে পারবেন। বঙ্গবন্ধু তারপর বললেন, 'রাজনীতি করার কোনো অভিলাষ আছে?' বললাম, 'স্যার, আমি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অযোগ্য। তবে আপনি আদেশ দিলে অন্য কথা।' বঙ্গবন্ধু এভাবে আমাকে একদম সহজ করে নিলেন। মনে হলো, আমার জন্য তিনি কিছু ঠিক করে রেখেছেন। পরক্ষণেই বললেন, 'তোকে আমার একান্ত সচিব হিসেবে ঠিক করে রেখেছি। কাল থেকে কাজে যোগ দিতে হবে।' মসিউর রহমান (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা) একান্ত সচিব-১ ছিলেন। আমাকে নিয়োগ দেওয়া হলো একান্ত সচিব-২ হিসেবে।
প্রশ্ন : দায়িত্বের বিষয়ে কোনো বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছিলেন?
উত্তর :প্রাথমিক আলাপ শেষে বঙ্গবন্ধু দায়িত্বের বিষয়ে কিছু ব্রিফ করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য তার সেই কথাগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ, যা স্মরণ করলে এখনও চোখে পানি আসে। বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, 'আমি গরিব দেশের প্রধানমন্ত্রী। আমার দরজা সবার জন্য খোলা। সব রকমের লোক আমার কাছে আসবে। যারা বড়লোক কিংবা মধ্যবিত্ত তাদের তুই ঠেকাস বা না ঠেকাস, তাদের কাজ তারা করিয়ে নেবে। কিন্তু আমার কাছে যারা গাঁও- গেরামের কৃষান-কৃষানি, শ্রমজীবী, গরিব-দুঃখী ও অশিক্ষিত মানুষ আসবে, তাদের ঠেকাস না। এসব মানুষের যাওয়ার জায়গা শুধু শেখ মুজিবের কাছে। তাদের আমার কাছে আসতে দিবি। এমনকি যদি তোর শক্তিতে কুলায়, তাদের কাজ করে দিবি।' বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শন ওখানেই। এর মানে সব মানুষের বিশেষত গরিব ও বঞ্চিত মানুষের সমস্যার সমাধান করা, তাদের রুটি-রুজি, শিক্ষা, বাসস্থান ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। অন্য কথায়, এসব মানুষের দারিদ্র্য, বঞ্চনা, শোষণ, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, গৃহহীনতাসহ নানা প্রতিকূলতা লাঘব করে একটি সোনার বাংলা গড়ে তোলা। প্রথম দিনই তার এই দর্শন আমার মর্মমূলে গেঁথে যায় এবং এই ৪৭ বছরে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করেছি।
প্রশ্ন :প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিদিনকার কাজের ধরন কেমন ছিল?
উত্তর :বঙ্গবন্ধু সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার দিকে অফিসে চলে আসতেন। একগাল হাসি নিয়ে দোতলায় উঠে যেতেন। এরপর চা-পানি পান করতেন। অনেক দর্শনার্থী আসতেন, তাদের সময় দিতেন। সৈয়দ আব্দুস সামাদ (বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান) তখন ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপসচিব (নথি-১)। তিনি ফাইলপত্র নিয়ে বঙ্গবন্ধুর রুমে ঢুকতেন। যুগ্ম সচিব ছিলেন মনোয়ারুল ইসলাম। তিনি অনেক ফাইলপত্র নিয়ে আসতেন। এর ফাঁকে ফাঁকে দর্শনার্থীরা যেত। কিছু দর্শনার্থী সময় ঠিক করে আসতেন। তবে বেশিরভাগ দর্শনার্থী অ্যাপয়েনমেন্ট ছাড়াই চলে আসতেন। কাউকে আটকানো হতো না। আমি গিয়ে বলতাম, 'স্যার অমুক এসেছেন। বলতেন, জলদি নিয়ে আয়।' কোনোদিন কাউকে 'না' করতে শুনিনি। বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে মানুষ আসতেন। মুক্তিযুদ্ধে স্বামী মারা গেছে, খাওয়া-পরার কিছু নেই- এমন নানা কষ্টে থাকা মানুষ তার কাছে চলে আসতেন। যুদ্ধাহত পরিবারের সদস্যদের জন্য এককালীন দুই হাজার টাকার একটা অনুদানের ব্যবস্থা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। একটু ফাইলওয়ার্ক করে তাৎক্ষণিকভাবে ওই অনুদান দেওয়া হতো।
প্রশ্ন : দর্শনার্থীদের নিয়ে কোনো বিশেষ ঘটনা মনে পড়ে?
উত্তর : অনেক ঘটনাই তো আছে। একটি ঘটনা বলি। বঙ্গবন্ধু তখন নতুন গণভবনে অফিস শুরু করেছেন। একদিন দেখা করতে এলেন মেজর শরিফুল হক ডালিম (পরে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত)। ওই সময়ে ডালিমের অনেক ঘটনা মানুষের মুখে মুখে। এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গাজী গোলাম মোস্তফার সঙ্গে তিনি খারাপ ব্যবহার করেন, যা বঙ্গবন্ধু মিটমাট করে দেন। ডালিম যখন দেখা করতে এসেছেন, তখন শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাকে সদ্য চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তার ব্যাজ নিয়ে নেওয়া হয়। যাই হোক, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি মেজর ডালিম? আপনার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু দেখা করবেন? ডালিম বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই উত্তর দিলেন, বলেই দেখেন? বঙ্গবন্ধুকে গিয়ে ডালিমের কথা বললাম। শুনেই বললেন, 'জলদি নিয়ে আয়। ও আমার ছেলে।' এই হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। এটা ছিল বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতা, তবে বোকামি। শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে যার ব্যাজ কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তিনি চট করে এলেন এবং বঙ্গবন্ধু তার সঙ্গে দেখা করলেন। আরেকটি ঘটনা বেশ মনে পড়ে। তখন জাসদ গঠন হয়ে গেছে। দুই ছাত্রলীগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাড়ি আক্রমণ করল জাসদ এবং জাসদ ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধু খুব বিচলিত হলেন। এ ছাড়া বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছাকে মাত্র ৪-৫টি ঘটনায় খুব বিচলিত হতে দেখেছি। এটি তার মধ্যে একটি। বঙ্গবন্ধু বললেন, 'এটা কী হলো? সিরাজুল আলম খানের তো আমাকে না জানিয়ে এমন কিছু করার কথা নয়।' সিরাজুল আলম খানের ওপর বঙ্গবন্ধু ভরসা করছিলেন যে, তিনি তার কথা শুনবেন। এটা ছিল বঙ্গবন্ধুর এক ধরনের সরলতা।
প্রশ্ন : নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
উত্তর :এককথায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন জাতীয়তাবাদী। জাতীয়তাবাদী বাঙালি। তিনি একাধিকবার বলেছেন, আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় উদার মুসলিম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হতে চাই এবং এখানে আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্ভাবনা গগনচুম্বী। সার্কের কিন্তু জন্ম এভাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পরবর্তী সময়ে সার্কের জন্মদাতা অন্যদের বলা হলো। ১৯৭৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গপ হুইটলাম এলেন। অস্ট্রেলিয়া তখন পশ্চিমাঘেঁষা একটি দেশ। এশিয়ার দিকে তাকায় না। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক শেষে হুইটলাম বললেন, এখন থেকে আমরা এশিয়ার দিকে অনেক বেশি মনোযোগ দেব। এরপর মার্শাল টিটো এসেছেন, ইন্দিরা গান্ধী এসেছেন, জুলফিকার আলী ভুট্টো এসেছেন। অনেক রাষ্ট্রপ্রধান এসেছেন। সবার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু মাথা উঁচু করে কথা বলেছেন। একটি কথা এখানে বলতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় নেহরু, ইন্ধিরা গান্ধী কিংবা বন্দরনায়েক- এসব নামকরা নেতাদের সবাই ছিলেন ভদ্রলোকের নেতা, মধ্যবিত্তের নেতা। বঙ্গবন্ধু ছিলেন গরিব মানুষের নেতা। তার রাজনীতির মূল উপজীব্য ছিল, মাটি এবং মাটি থেকে উঠে আসা নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র মানুষ। দেশ যে স্বাধীন হবে, তা নিয়ে তার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদে তিনি প্রকারান্তরে স্বাধীনতার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, 'মাননীয় স্পিকার, আপনাদের লোকজন আমাদের পূর্ব পাকিস্তান বলে। আমরা কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান নই, পূর্ব বাংলা। বাঙালিদের একটা ঐতিহ্য আছে। একটা ভাষা, সংস্কৃতি, চেতনা আছে। এটাকে আমরা ধারণ করি।' আমি তো মনে করি, স্বাধীনতার ঘোষণা তিনি ওখানেই দিয়েছেন। বাংলাদেশের সংবিধান রচনার বিভিন্ন কার্যক্রম দেখেছি। আমি তখন তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের একান্ত সচিব। কীভাবে মানবাধিকার রক্ষিত হবে, কীভাবে মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষিত হবে, কীভাবে নারীদের অধিকার রক্ষিত হবে, কীভাবে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে- এসব বঙ্গবন্ধুই নির্দেশনা দিয়েছেন।
প্রশ্ন : স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে বঙ্গবন্ধুর চিন্তাভাবনাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
উত্তর :১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে আসেন। ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করলেন। তিনি দেখলেন, শুধু নেই আর নেই। গুদামে খাদ্য নেই। মাঠে ফসল নেই। কোনো ব্যাংকিং ব্যবস্থা নেই। রাস্তাঘাট, রেল, কলকারখানার অবকাঠামো সব ধ্বংস করে দিয়েছে পাকিস্তানি সেনারা। এদিকে সারা পৃথিবীতেই তখন অর্থনৈতিক সংকট চলছে। স্বর্ণমান ভেঙে গেছে। পেট্রোলের দাম হু-হু বাড়ছে। চাল ও গমের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু অগ্রাধিকার ঠিক করলেন, প্রথমে কৃষির দিকে নজর দিতে হবে। কৃষকদের প্রায় বিনামূল্যে সার, বীজ, কীটনাশকসহ অন্যান্য উপকরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাদের সার্টিফিকেট মামলা বাতিল করে দিলেন। খাজনা মওকুফ করে দিলেন। মানুষের মধ্যে হাহাকার দেখলেন বটে; কিন্তু তাদের চোখে উৎসাহ দেখলেন। মানুষের বিশ্বাস ছিল, আমাদের নেতা এসেছেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। সুতরাং গগণচুম্বী প্রত্যাশা; কিন্তু তহবিল শূন্য- এমন এক অবস্থায় দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন বঙ্গবন্ধু। এরপর নজর দিলেন শিক্ষার দিকে। সব প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করলেন। শিক্ষকদের সরকারি চাকরিজীবীর মর্যাদা দিলেন। শিক্ষার জন্য গঠন করলেন কুদরত-এ-খুদা কমিশন। এরপর নজর দিলেন শিল্পের দিকে। তেজগাঁও শিল্প এলাকা, চট্টগ্রাম শিল্পনগরী এবং জেলায় জেলায় বিসিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেন। তিনি জানতেন, বিদ্যুৎ ছাড়া শিল্প হবে না। বিদ্যুতের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিলেন। যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশ সরকারকে যে খাদ্য সহায়তা দিত, তা হ্রাসকৃত মূল্যে বাজারে বিক্রি করে কাউন্টারপার্ট তহবিল গঠন করা হয়। এই তহবিলের একটি অংশ দিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ এবং আরেকটি অংশ দিয়ে পোলট্রি চাষে উৎসাহ দিতে খরচ করা হতো। তখন থেকেই হাঁস-মুরগি চাষের বিপ্লব শুরু হলো এবং যা এখনও অব্যাহত আছে। তিনি জানতেন, জনসংখ্যা যদি খুব দ্রুত বেড়ে যায় তাহলে খুব বিপদ হবে। শেখ মুজিবের শাসনের প্রথম দিন থেকেই পরিকল্পিত জনসংখ্যা নীতি গ্রহণ করা হয়।
প্রশ্ন :ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং শিল্পের বিকাশ পর্ব সম্পর্কে যদি কিছু বলেন...
উত্তর :বঙ্গবন্ধু যখন দায়িত্ব নিলেন তখন দেশে কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেই এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা নেই। এমন একটি অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল মাত্র ১৮ ডলার। তাৎক্ষণিকভাবে সুইডেন অথবা কানাডা কিছু স্বর্ণ অনুদান দিল। এই সামান্য ডলার ও স্বর্ণ নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন বাংলাদেশ ব্যাংক। পাকিস্তানিরা যেসব ব্যাংক পরিত্যাগ করে চলে গেছে, কিছু বিদেশি ব্যাংক এবং বাংলাদেশের কয়েকটি ব্যাংক একত্রীভূত করে ছয়টি তফসিলি বা বাণিজ্যিক ব্যাংক সৃষ্টি করলেন। যেহেতু সমাজতন্ত্র সংবিধানের প্রধান অঙ্গ, সেহেতু কৃষি ছাড়া বাকি প্রায় সবকিছুই সরকারি মালিকানায় আনা হলো। কৃষিতেও ভর্তুকির মাধ্যমে বেশিরভাগ বিনিয়োগ ছিল সরকারের। ব্যক্তি খাতের শিল্প শুরু করার জন্য তিনি ডাকলেন জহুরুল ইসলামকে (প্রয়াত শিল্পপতি, ইসলাম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা)। তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আগে থেকে পরিচয় ছিল। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১০টি করপোরেশন করলেন। সুইডেন ছিল বাংলাদেশের খুবই মিত্র রাষ্ট্র। সুইডেন 'স্টেট বার্টার' শুরু করল; তবে তার ব্যবস্থাপনায় থাকবে ব্যক্তি খাত। বঙ্গবন্ধু তখনকার বাণিজ্য সচিবকে বলে দিলেন, ব্যক্তি খাতে এই ব্যবসা করবে বেক্সিমকো। কে কোন দলের লোক তা বিবেচনায় না নিয়ে, কে কোন কাজ করতে পারবে এমন চিন্তা থেকে তিনি ব্যক্তি খাতকে সহযোগিতা করতে থাকলেন। এভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু হয়ে গেল।
প্রশ্ন :১৯৭৪ সালে খাদ্য ঘাটতি বা দুর্ভিক্ষ কোন কারণে হয়েছিল বলে আপনার মনে হয়?
উত্তর :নানা কারণে ১৯৭২-৭৩ সালে অর্থনীতির অবস্থা খারাপ ছিল। বড় মাপের মূল্যস্ম্ফীতি হলো। সারা পৃথিবীতে তখন মহাবিপর্যয়। গমের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেল। পেট্রোলের দাম বেড়ে গেল তিনগুণ। এমন অবস্থা যে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০ থেকে ২০ ভাগ কেটে দিল অর্থ মন্ত্রণালয়। ১৯৭৪ সালে বড় বন্যা ও খরার কারণে বড় ধরনের ফসলহানি হয়। এতে বোঝা গিয়েছিল, খাদ্য ঘাটতি হবে। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন বা খাদ্য মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্টভাবে প্রধানমন্ত্রীকে কিন্তু বলেনি, এই সময় খাদ্য আমদানি করতে হবে। তাদের একটা ভরসা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের পিএল-৪৮০-এর অধীনে খাদ্য সাহায্য আসবে। এর আওতায় খাদ্যভর্তি দুটি জাহাজ ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করার কথা ছিল। এর আগের একটি ঘটনা এ ক্ষেত্রে বলতে হবে। ১৯৭৩ সালের অক্টোবর বা নভেম্বরে যখন জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন হলো তখন কিউবার রাষ্ট্রনায়ক ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুর কাছে বললেন, তাদের পাটের বড় দরকার। কিউবার তখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধংদেহী অবস্থা। বঙ্গবন্ধু তখন অগ্র-পশ্চাৎ চিন্তা না করে দেশে এসে কিউবাতে পাট পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিলেন। পিএল-৪৮০-এর অন্যতম শর্ত ছিল, কিউবাসহ সমাজতান্ত্রিক কোনো দেশের সঙ্গে কোনো বৈদেশিক বাণিজ্য করা যাবে না। অর্থ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা খাদ্য মন্ত্রণালয়- কেউ বঙ্গবন্ধুকে কিউবায় পাট রপ্তানি করতে মানা করেনি। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য সহায়তা ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এর ফলে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়। অমর্ত্য সেন ওই সময়কার কথা তার বইতে লিখেছেন যে, জোগানের যতটা সমস্যা ছিল, তার চেয়ে বেশি সমস্যা ছিল ব্যবস্থাপনায়। আরেকটি কথা বলি, বাসন্তীর যে স্টোরি তা ছিল বানোয়াট এবং বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় তা প্রমাণিত হয়েছে। যাই হোক, খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ায় এবং ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হয় অন্তত ৫ শতাংশ। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে নির্মম ও ঘৃণ্য হত্যার মাধ্যমে ওই অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয় ঘাতকরা।
ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব
