ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

শফিউলের স্বপ্নভঙ্গ ২০১৯ বিশ্বকাপ

শফিউলের স্বপ্নভঙ্গ ২০১৯ বিশ্বকাপ
×

--

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২০ | ০০:৩৬ | আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২০ | ০০:৫০

করোনাভাইরাসের কারণে ক্রিকেটাররাও বেকার। ঘরবন্দি সময়ে তারা লড়াই করছেন ফিটনেস ধরে রাখতে। এই দুঃসময় পেছনে ফেলে আবার মাঠে ফেরার তীব্র বাসনা থেকে কাজগুলো করছেন শফিউল ইসলাম। জাতীয় দলের এ পেসার গতকাল জানান, বাসায় পরিবারকে সময় দেওয়া ছাড়াও খেটে খাওয়া মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। শফিউলের সঙ্গে আলাপনে আলী সেকান্দার

সমকাল : সময় কাটছে কীভাবে?

শফিউল : বিসিবি থেকে ফিটনেসের যে কাজগুলো দেয় সেগুলো করি। সিঁড়িতে একটু রানিং করি। এরচেয়ে তো বেশি কিছু করার সুযোগ নেই।

সমকাল : ঘরবন্দি থাকতে কষ্ট হচ্ছে?

শফিউল : অনেক দিন ধরে ঘরে। বাসার ভেতরে থাকা অনেকের কাছে একঘেয়েমি লাগলেও আমার লাগছে না। পরিবারকে তো এত সময় কখনও দিতে পারি না। তবে কী মাঝেমধ্যে বাইরে যেতে ইচ্ছে করে, মন ছুটে যায়। মেয়ের সঙ্গে কার্টুন দেখি। ইউটিউবে বিভিন্ন জিনিস দেখা হয়। বিশেষ করে ফানি ভিডিও দেখি, ওয়াজ শুনি। গত মাসের ১৬ তারিখে বাবা মারা যাওয়ার পর টিভি চালানো হয়নি।

সমকাল : ক্রিকেট নিয়ে কথা বলি, যখন খেলা মাঠে ফিরবে তার জন্য তো একটা প্রস্তুতি নিতে হবে?

শফিউল : তা তো অবশ্যই। পরিকল্পনা ছাড়া কোনো কাজেই ভালো করা যায় না। যখনই খেলা শুরু হবে তখন থেকেই যেন পুরোদস্তুর ছন্দ নিয়ে খেলতে পারি তার জন্য পরিকল্পনা রাখতে হবে। বাসার ভেতরে ক্রিকেটীয় স্কিল হয়তো করতে পারছি না, এ ছাড়া সবাই ফিটনেস নিয়ে কাজ করছে। আর ফিটনেস ঠিক থাকলে দু-তিন দিনেই স্কিলের ওপর দখল চলে আসবে। জাতীয় দলে বা ভালো পর্যায়ে যারা খেলা স্কিল নিয়ে তাদের কখনোই সমস্যা হয় না। সাকিব ভাইকে দেখেছি, ছয় মাস পরে এলেও ঠিক জায়গায় বল করেন। ব্যাটিং করলেও কোনো জড়তা থাকে না। কারও হয়তো প্র্যাকটিস একটু বেশি করতে হয়, কারও একটু কম।

সমকাল : ইনজুরির কারণে টানা জাতীয় দলে খেলতে না পারা কতটা আক্ষেপের?

শফিউল : মাঝেমধ্যে খুব খারাপ লাগত। দেখা গেছে, ইনজুরি থেকে ফিরে ম্যাচের ঠিক আগের দিন আবার ইনজুরিতে পড়েছি। কখনও গোড়ালিতে মোচড় লাগছে, কখনও বলের ওপর পাড়া লেগে চোট পেয়েছি। দেখা গেল দুটি ম্যাচ খেলার পর চোটে পড়েছি। নিউজিল্যান্ড সফরে যাওয়ার ঠিক আগে বিপিএলের শেষ ম্যাচে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি হলো। এসব ভাবলে খারাপই লাগে। ইনজুরি কম হলে নিয়মিত জাতীয় দলে থাকলে হয়তোবা আরও ৫০টি ম্যাচ বেশি খেলতাম। ক্যারিয়ার শেষে নিজের কাছেও ভালো লাগত। বাংলাদেশের একটা ম্যাচ মিস করলে খারাপ লাগে। কিন্তু বাস্তবতা তো মেনে নিতেই হয়। একটা সময় তো আশা ছেড়ে দেওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। জাতীয় দলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেভাবে বেড়েছে তাতে ফিরতে হলে অনেক পরীক্ষা দিতে হবে। ভাগ্য ভালো জাতীয় দলে আবার নিয়মিত হয়েছি। চেষ্টা করব ফিটনেস ধরে রেখে যতদিন পারি খেলে যাওয়ার।

সমকাল : কখন জাতীয় দলে ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন?

শফিউল : সত্যি কথা বলতে, শ্রীলংকায় ওয়ানডে সিরিজ খেলতে যাওয়ার কিছুদিন আগে থেকে মনে হচ্ছিল হয়তোবা আর জাতীয় দলে ডাকবে না। মনে হচ্ছিল, যারা আছে তাদের চ্যালেঞ্জ করে ঢোকা কঠিন। শ্রীলংকা সফরে হঠাৎ করে যে ডাক পাব চিন্তাও করিনি। ওই সিরিজে তামিম ভাই অধিনায়ক ছিলেন। কোচ খালেদ মাহমুদ সুজন ভাই আর বোলিং কোচ চম্পকা রমানায়েকে ছিলেন। এই তিনজনই আমাকে চেয়েছিলেন দলে। এই তিনজনের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। অনেক দিন পর জাতীয় দলের ম্যাচ খেলতে নামলে অভিষেক অভিষেক মনে হবে। এরচেয়েও বেশি চাপ থাকে, ভালো খেলতেই হবে। না পারলে পরের ম্যাচে সুযোগ দেবে না। শ্রীলংকায় দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পর এই চাপটা অনুভব করতে দেয়নি কেউ। তামিম ভাই বলেছেন- 'তুই তোর ক্রিকেট খেল, শুধু ইনজুরড হবি না।' সুজন ভাই বলেছেন, 'তুই মন খুলে বোলিং করবি, ১০ ওভারে ১০০ রান দিলেও সমস্যা নেই। রান ১০০ দিলে তো মরে যাবি না। খালি চেষ্টা করবি সেরা বোলিংটা করতে।' এভাবে উনারা আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়ে গেছেন। অনেক দিন পর দলে ঢুকে ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে এমন সাপোর্ট পাওয়ায় আমার সাহস অনেক বেড়ে গেছে। এর আগে কখনও এভাবে টিম ম্যানেজমেন্টের সাপোর্ট পাইনি। এর পর থেকে যে টি২০ ম্যাচগুলো খেলেছি মোটামুটি ভালো হয়েছে। ফিট থাকলে সামনে আরও ভালো করতে পারব।

সমকাল : ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে খেলার আশা ছিল নিশ্চয়ই?

শফিউল : এটা সত্য কথা, ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে যত না আশাবাদী ছিলাম তারচেয়ে অনেক বেশি আশা করেছিলাম ২০১৯ এর বিশ্বকাপে দলের সঙ্গে যেতে পারব। কারণ হচ্ছে- গত বছর বিপিএল ভালো করেছি। বিশ্বকাপের আগে নিউজিল্যান্ড সফরের দলে ছিলাম। ওই দলের প্রায় সবাই বিশ্বকাপে গেয়েছে। আমার বিশ্বাস ছিল আমাকে নেওয়া হবে। বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণার পর দেখলাম আমাকে রাখেনি। তখন খুব মন খারাপ হয়েছিল। কাউকে কিছু বলতেও পারছিলাম না। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের আগে ইনজুরি থেকে ফিরে সুযোগ পেয়েছি। এবার তো আগে থেকেই ফিট ছিলাম এবং ভালো করছিলাম। তাই আশাটা বেশি ছিল। সবাই যখন বিশ্বকাপের উদ্দেশে দেশ ছাড়ল তখন খুব বেশি খারাপ লেগেছে। যে কোনো দেশই তার সেরা দলটাই নিয়ে যায়। বাংলাদেশের সেরা দলই হয়তো খেলেছে। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে, ২০১৫ সালের চেয়েও ২০১৯ সালে আমি ভালো শেপে ছিলাম এবং খেলার সুযোগ পেলে ভালো করতাম।

সমকাল : মনের জোরটা কাজে লাগাতে পারতেন?

শফিউল : দেশের হয়ে খেললে এমনিতেই মনে জোর থাকে। সেখানে বিশ্বকাপের মতো আসরে ভালো করার তাড়না থাকে। ২০১১ সালের বিশ্বকাপে আমি সব ম্যাচ খেলেছি। ২০১৫ সালে ইনজুরির কারণে ম্যাচ খেলা হয়নি। ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ দলে থাকলে শতভাগের চেয়েও বেশি দিয়ে খেলতাম।

সমকাল : দল যখন বিশ্বকাপে খেলত তখন কী করতেন?

শফিউল : খেলা দেখতাম। সাকিব ভাই যখন পারফর্ম করতেন, তখন মনে হতো আরও ভালো করুক। উনার তিন সেঞ্চুরি হয়ে গেলে দোয়া করছিলাম পরের ম্যাচেও সেঞ্চুরি করুক। বিশ্বকাপে সাকিব ভাইয়ের খেলা খুব উপভোগ করেছি।

সমকাল : ইনজুরি ম্যানেজমেন্ট ভালো হলে আরও ফিট থাকতেন?

শফিউল : ইনজুরি ম্যানেজমেন্টের প্রক্রিয়াগুলো ঠিক ছিল। বিসিবির ফিজিও ও ট্রেনাররা খুব সাপোর্ট দিয়ে গেছেন। আসলে আমার ইনজুরিগুলো অদ্ভুত। গোড়ালি মচকে গেছে দু'বার। ওয়েস্ট ইন্ডিজে টেস্ট ম্যাচের আগে যেটা হয়েছে, নতুন স্পাইক হাওয়ায় ফিল্ডিং প্র্যাকটিসে ঘাসের ভেতরে আটকে মচকে যায়। ২০১২ সালের শেষের দিকে মিরপুরে বল গেম খেলতে গিয়ে পিচ্ছিল মাঠে পড়ে ইনজুরিতে পড়ি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে ফিরে চোটমুক্ত হয়ে এনসিএল ম্যাচ খেলতে নেমে হলাম ইনজুরড। ফিল্ডিংয়ে বলের ওপর পা পড়ে গোড়ালি মচকে গেল। বিপিএলে ফিল্ডিংয়ে স্লাইডিং করার পর দ্রুত উঠতে গিয়ে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পেলাম। দুর্ভাগ্য ছাড়া এটাকে কী বলবেন?

সমকাল : গুঞ্জন আছে, আপনি গোছানো একজন না?

শফিউল : আমি উচ্ছৃঙ্খল, কেউ বলতে পারবে না। অনেকে অনেক রকম ধারণা করতে পারে, সেটা সঠিক না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। খেলা না থাকলে যেটা হয় বেশি ঘুমাই। খাওয়া-দাওয়ায় বিরতি পড়ে। খেলা থাকলে বরং রুটিন মেনে চলতে হয়। তবে হ্যাঁ, ফিটনেস নিয়ে আরও অনেক কাজ করতে পারতাম, তাতে আমার লাভ হতো। মাঝেমধ্যে হতাশ হয়ে পড়তাম, ইনজুরি থেকে ফিরে আবার ইনজুরিতে পড়ছি। এখন বুঝি, যা-ই হোক আমাকে লড়াই করে যেতে হবে।

আরও পড়ুন

×