ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শাস্তির পর নিয়ম ভাঙার আবদার

শাস্তির পর নিয়ম ভাঙার আবদার
×

সাখাওয়াত হোসেন জয়

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৩ | ০৪:৫৭

 লাইভ বেটিং (অনলাইন জুয়া) ও ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ঘটনায় দেশের ফুটবলে বড় ঝড় বয়ে গিয়েছিল ২০২১ সালে। প্রিমিয়ার লিগে আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের তিনটি ম্যাচে ফিক্সিংয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এএফসির নির্দেশনা অনুসারে বাফুফে ডিসিপ্লিনারি কমিটি ক্লাবটিকে শাস্তি হিসেবে প্রথম বিভাগে নামিয়ে দেয়। পরের বছর একই অভিযোগে উত্তর বারিধারা ক্লাবকে নামিয়ে দেওয়া হয় দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবল লিগে। ফিফা-এএফসির নির্দেশ অনুযায়ী বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের দেওয়া শাস্তি মানেনি দুটি ক্লাব। আরামবাগ খেলেনি প্রথম বিভাগ এবং উত্তর বারিধারা খেলেনি দ্বিতীয় বিভাগ। দেশের পেশাদার ফুটবলের চতুর্থ এবং তৃতীয় স্তরে না খেলেই সরাসরি দ্বিতীয় স্তর বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে (বিসিএল) খেলার আবেদন করেছে ম্যাচ পাতানোর দায়ে শাস্তি পাওয়া বারিধারা ও আরামবাগ।

শাস্তি না পেলেও নিয়ম ভেঙে তাদের পথে হেঁটেছে পুরান ঢাকার ক্লাব ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবও। তারাও প্রথম বিভাগ না খেলে বিসিএলে খেলতে বাফুফেতে চিঠি দিয়েছে এক মাসেরও বেশি সময় আগে। তিন ক্লাবের আবেদনের চিঠি উঠবে বাফুফে নির্বাহী কমিটিতে। সেখানেই সিদ্ধান্ত হবে ক্লাবগুলোর ভাগ্য। নিয়ম ভেঙে তিন ক্লাবের বিসিএলে খেলার আবেদন ফুটবল ফেডারেশন গ্রহণ করলে, তা দেশের ফুটবলের জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন ফুটবল-সংশ্লিষ্টরা। অনেকেরই মত, বাফুফের আসন্ন নির্বাচনের জন্যই কর্তারা এখন এসব বিষয়ে নমনীয়তা দেখাচ্ছেন।

 ২০২১ সালের ২৬ আগস্ট বাফুফে ডিসিপ্লিনারি কমিটি শাস্তি হিসেবে আরামবাগকে দুই মৌসুমের জন্য প্রথম বিভাগে নামিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে ক্লাবের কর্মকর্তা, কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড়সহ অনেককেই নিষিদ্ধ করেছিল বাফুফে ডিসিপ্লিনারি কমিটি। পরে ক্লাবটি আপিল করলে শাস্তি কমিয়ে শুধু এক মৌসুম প্রথম বিভাগে খেলতে হবে বলে রায় দেওয়া হয়। কিন্তু সেই শাস্তিও মানেনি আরামবাগ। শাস্তি পাওয়ার দুই বছরেও প্রথম বিভাগে খেলেনি তারা। না খেলার কারণ হিসেবে কোচের ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা দেওয়াকে সামনে এনেছেন ক্লাবটির সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী, ‘তৃতীয় বিভাগ থেকেও অনেক সময় আবেদন করে বিসিএলে খেলে। এ ক্ষেত্রে তো এটা খুব একটা বড় বিষয় না। আমাদের ভুল বলেন আর দোষ বলেন; একজনের মাধ্যমে এটা হয়েছে। সেখানে তো ক্লাব সম্পৃক্ত না।

ক্লাবের যেসব কর্মকর্তা ছিলেন, তারাই শাস্তি পেয়েছেন। এখন তো আর তারা নেই। আমরা এখন খেলতে চাই। পুরোনো টিম হিসেবে আরামবাগ খেলতে চায়।’ আরামবাগের মতো বড় অপরাধ করেনি উত্তর বারিধারা। ক্লাবের কোনো কর্মকর্তা ফিক্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। ম্যাচ পাতানোর দায়ে গত বছর পাঁচ ফুটবলারকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দিয়েছিল বাফুফে ডিসিপ্লিনারি কমিটি। তাতেই ক্লাবটিকে নামিয়ে দেওয়া হয় দ্বিতীয় বিভাগে। বাফুফের দেওয়া এ শাস্তি নিয়েই যত ক্ষোভ ক্লাব কর্তাদের। তাই দ্বিতীয় বিভাগে খেলেনি। এখন নিয়মবহির্ভূত বিসিএলে খেলার আবেদন করেছে বারিধারা। ‘যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, সেখানে আমার ক্লাবের কোনো কর্মকর্তা জড়িত নন। আমরা ফুটবলের জন্য এসেছি, ফুটবলের কাছ থেকে কিছু নেওয়ার জন্য আসিনি। আমার ক্লাব থেকে ফুটবলার উঠে আসছে’–বলেন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। আরামবাগ আর বারিধারার মতো অবশ্য কোনো শাস্তি পায়নি ফরাশগঞ্জ।

২০১৭-১৮ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ থেকে বিসিএলে নেমে যাওয়া ক্লাবটি প্রতিনিয়ত তলানিতে নামতে থাকে। ২০২১-২২ মৌসুমে বিসিএল থেকে প্রথম বিভাগে নেমে যায় ফরাশগঞ্জ। কিন্তু গত মৌসুমে প্রথম বিভাগে খেলেনি তারা। ক্লাবটির কর্মকর্তা মানস বোস বাবুরামের দাবি, তাদের গতবার প্রথম বিভাগে খেলতে কোনো চিঠি দেয়নি বাফুফে। আর প্রথম বিভাগ লিগ নাকি হয়নি। ‘আমাদের এই মৌসুমে প্রথম বিভাগ লিগে খেলার কথা। এখন বিসিএলে আবেদন করেছি, আশা করি অনুমোদন পাব।’ ফিফা-এএফসির নিয়ম অনুযায়ী যে কোনো ক্লাবই বিসিএলে খেলতে আবেদন করতে পারে। যেমনটি গত মৌসুমে করেছিল ব্রাদার্স ইউনিয়ন। আগের মৌসুমের অবনমন হওয়ায় তারা চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে খেলেনি। এর পর ফুটবল ঐতিহ্য ও সাফল্য বিবেচনায় নিয়ে তাদের বিসিএল খেলার সুযোগ দিতে গতবার আবেদন করেছিল গোপীবাগের ক্লাবটি। বাফুফে নির্বাহী কমিটির সভায় সেই আবেদনটি গ্রহণ করে। বিসিএলে চ্যাম্পিয়ন হয়েই এবার প্রিমিয়ার লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে।

কিন্তু শাস্তি পাওয়ার পরও আরামবাগ এবং বারিধারার নিয়ম ভেঙে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে খেলার আবেদন করাটা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। তবে নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো কিছু করা হবে না বলে গতকাল সমকালকে জানান পেশাদার লিগ ম্যানেজমেন্ট কমিটির আহ্বায়ক আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক, ‘এবার আমাদের বোর্ড থেকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যারা বিসিএল খেলার আবেদন করবে, তার সঙ্গে ৫০ লাখ টাকার পে-অর্ডার দিতে হবে। এরপর আবেদন যদি বিবেচনায় আসে, তাহলে তাদের লাইসেন্স দেব। যদি বিবেচনায় না আসে, তাহলে তাদের ওই পে-অর্ডার ফিরিয়ে দেব। নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি, নিয়ম ভাঙার মতো কিছুই হবে না।

নিয়মের বাইরে আমরা কখনও যাব না।’ শাস্তি পাওয়া ক্লাবগুলোকে অনুমতি দিতে হলে ফিফা-এএফসিকে আগে জানাতে হবে বাফুফের। এটা মনে করিয়ে দিলেন বাফুফে ও পেশাদার লিগ কমিটির সদস্য মো. ইলিয়াস হোসেন, ‘এখন যে কেউই অনুমতি চাইতে পারে, সে ক্ষেত্রে ফিফার গাইডলাইন দেখে তারপর আমাদের বোর্ড মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা অনুমতি দিলে ফিফা আবার বলতে পারে– তোমরা সাজাও দাও, আবার খেলার অনুমতিও দাও। সে ক্ষেত্রে আমরা আবার বিতর্কের মধ্যে পড়ে যাব। সে কারণে এটা খুব স্পর্শকাতর ইস্যু। বিষয়টিকে খুব সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ আরামবাগ ও বারিধারার ক্ষেত্রে বিষয়টি জটিল হলেও ফরাশগঞ্জের ক্ষেত্রে হয়তো তা নেই। তাই ব্রাদার্সের মতো তাদের বিষয়টি বিবেচনা করার সম্ভাবনা আছে।

আরও পড়ুন

×