সাক্ষাৎকার
‘দেখবেন, কীভাবে জবাব দিই’
এক ফ্রেমে বক্সার জিনাত ফেরদৌস ও কোচ কলিন মরগান। ছবি: সংগৃহীত
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ০৫:২৭
গেমস ভিলেজের বক্সিং রিংয়ে কোচ কলিন মরগানের সঙ্গে বক্সিং ফাইট করছেন। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় নিয়ম করে অনুশীলনে ঘাম ঝরাচ্ছেন আমেরিকানপ্রবাসী বাংলাদেশি জিনাত ফেরদৌস। বাংলাদেশি বাবা বেলায়েত হোসেন ও মা শাহনাজ ফেরদৌসের ঘরে জন্ম নেওয়া জিনাত এখন নিজেকে বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিতে বেশি গর্ব করেন। চীনের হ্যাংঝুতে এবারের এশিয়ান গেমসে পদক জিতে লাল-সবুজের পতাকাও ওড়াতে চান তিনি। প্রতিযোগিতার বক্সিংয়ে আজ নামার কথা থাকলেও বাই পেয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠায় তাঁর স্বপ্নের পরিধি বেড়ে গেছে। শুধু এশিয়াডই নয়, অলিম্পিকের মতো মঞ্চে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন জিনাতের। হ্যাংঝুতে নিজের স্বপ্ন এবং বক্সিংয়ে আসার গল্পগুলো বলেছেন সমকালের কাছে।
সমকাল : বাংলাদেশের হয়ে এশিয়ান গেমসের মতো বড় আসরে প্রথম অংশগ্রহণ। স্বপ্ন সত্যি হওয়ায় কেমন লাগছে?
জিনাত : আমি যেমন গর্বিত, তেমনি করে রোমাঞ্চিতও বোধ করছি। বাংলাদেশের পতাকা বুকে ধারণ করে বড় প্রতিযোগিতায় খেলছি, এটা তো অবশ্যই আমার জন্য বড় পাওয়া। আমি শুধু এটুকুই বলব, আমার রক্তে বাংলাদেশ।
সমকাল : এশিয়াডের মতো বড় মঞ্চে কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়তে হবে। একটু নার্ভাস লাগছে কি?
জিনাত : আমি যখন প্রথম বক্সিং শুরু করেছিলাম, তখন খেলার সময় খুবই নার্ভাস হয়ে যেতাম। কিন্তু গত দু’বছর আমি অনেক কিছুই শিখেছি। কীভাবে স্নায়ুর চাপ ধরে রাখতে হয়, সেটাও শিখেছি। বলতে পারেন, আমি এখন অনেক পরিপক্ব এবং পরিণত।
সমকাল : কেন বক্সিং পেশাকে বেছে নিলেন? আর ২৭ বছর বয়সেই কেন?
জিনাত : আমার হাজবেন্ড একসময় ফাইটার ছিল। সে আমাকে নিউইয়র্কে বক্সিং সংস্থার সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে। সে দেখেছে, আমি এই খেলাটা পছন্দ করি; তখন সে নানাভাবে আমাকে মোটিভেশন করে। সে শুধু বলত– চেষ্টা কর, এগিয়ে যাও। আমি যখন কোনো কিছুর প্রতি আগ্রহ করি, সেটা শেষ না করা পর্যন্ত ক্ষ্যান্ত হই না। আমি সেখানে একটা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করি। আসলে আমার কাছে মনে হয়েছে, ইচ্ছা শক্তি থাকলে সবই সম্ভব। বয়স কোনো সমস্যা নয়।
সমকাল : ফাইটে নামা তো চাট্টিখানি কথা নয়। প্রথম ফাইটের আগে নিজের কাছে কেমন লেগেছিল?
জিনাত : আমি বক্সিংয়ে প্রথমবার ঢুকেছি ২০১৯ সালে। ওই সময়টায় আমি পাঞ্চ পর্যন্ত করতে পারিনি। এরপর আমি একটা ইনজুরিতে পড়ি, যে কারণে ২০২০ সালে কিছুই করতে পারিনি। পরের বছরই আমি বক্সিংয়ে পুরোদমে মনোযোগ দিই। কয়েকটি চ্যাম্পিয়নশিপ খেলার পর আমি নিজের অবস্থান বুঝতে পারি। এরপর এই বক্সিং নিয়ে আমার স্বপ্নের পরিধিটা বেড়ে যায়।
সমকাল : বাংলাদেশের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা কীভাবে?
জিনাত : আমার পুরো পরিবারই আমেরিকায় বসবাস করছে। আমি আমেরিকায় থাকলেও বাবা-মা অনেকবার বাংলাদেশে নিয়ে গেছেন আমাকে। আমার নানি বাংলাদেশে আছেন। বাংলাকে ভালোবাসি বলে বাংলা ভাষায় কথা বলি। আমার বাবা-মা চেষ্টা করে, আমি যেন বাংলাদেশি জিনিসটা না ছাড়ি। নিউইয়র্কে থাকলেও আমি কিন্তু ভাত খুব পছন্দ করি। একসময় চিন্তা করলাম, বাংলাদেশের জন্য কী করব। তখন আমার কোচ কলিন মরগান বাংলাদেশের হয়ে খেলার আইডিয়াটা দেন। ‘যদি বাংলাদেশের হয়ে খেল, সেটা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হবে।’ এটা শোনার পর আমার হাজবেন্ডসহ পুরো পরিবারই ইতিবাচক ছিল। ভিকি নামে আমার একটা ভালো বন্ধু আছে, সে গুগলে কাজ করে। সে আগে বাংলাদেশে থাকত, তাকে আমি আগে থেকেই চিনতাম। ও আমার মেন্টরের মতো। আমি যখন বলেছি, বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে চাই, তখন সে খুবই খুশি হয় এবং আমাকে বলে দ্রুত কর। সত্যি কথা বলতে কী, ওর সঙ্গে যদি আমার বন্ধুত্ব না থাকত, তাহলে আজকে এখানে থাকতাম না। ও মামুন আঙ্কেল (শেখ বশির)সহ সবার সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়েছে।
সমকাল : গুগলে চাকরি করছেন। চাকরি করার সঙ্গে ট্রেনিং; কীভাবে ম্যানেজ করছেন?
জিনাত : যখন আমি কোনো প্রতিযোগিতায় খেলতে যাই, তখন সবাই বলে কত পয়সা পেয়েছ। আমি বলেছি, কোনো পয়সা পাই না। আমি পয়সা আসলে দিই। চাকরি এবং বক্সিং; দুটোই কীভাবে ম্যানেজ করি কথার অর্থটা আমি এভাবে দেখছি– যদি তুমি না চাও করতে, তাহলে এটা হবে না। বাস্তবতা হলো একটা দিনে কাজ করার মতো খুব কম সময় থাকে। একটা মানুষ ঘুমায় তো ১২ ঘণ্টা। কিন্তু আমি ১৬ ঘণ্টাই কাজ করি। ৮ ঘণ্টা অফিস, পাঁচ ঘণ্টা ট্রেনিং করি। চাকরি, ঘুম, ট্রেনিং– সবকিছুই আমি নিয়মের মধ্যে করি। তবে এটা খুব সহজ না। সকালে কাজে যাওয়ার আগে আমি এক ঘণ্টা দৌড়াই। সপ্তাহের ষষ্ঠ দিন আমি শুধুই বক্সিং করি।
সমকাল : বক্সিং নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?
জিনাত : আমার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য আছে। শর্টটার্ম লক্ষ্য হলো দেশের হয়ে জেতা, ইতিহাস করা। যেটা আমি চাচ্ছি। বাংলাদেশের হয়ে খেলার সুযোগ পাওয়াটা আমার স্বপ্নের অর্ধেক পূরণ হয়েছে। আমার টার্গেট হলো বাংলাদেশের হয়ে ইতিহাস গড়া। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো আমি বাংলাদেশে বক্সিং নিয়ে কাজ করতে চাই। গত জুলাইয়ে আমি যখন বাংলাদেশে গিয়েছিলাম, তখন দেখেছিলাম তরুণীদের বক্সিংয়ের প্রতি আগ্রহ। এগুলো আমাকে উদ্দীপ্ত করেছে।
সমকাল : এশিয়ান গেমসে পদক জিততে চান। এটা কতটা সম্ভব?
জিনাত : আমি এখানে ঘুরতে আসিনি। বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছি পদক জয়ের জন্যই। এখানে আমার কোচকে নিয়ে এসেছি। সকাল-সন্ধ্যা অনুশীলন তো করছি, তিনি আমাকে বিভিন্নভাবে মোটিভেশন করছেন।
সমকাল : এশিয়ার মঞ্চে বড় ফাইটারদের সঙ্গে খেলবেন। নিশ্চয়ই তাদের বিষয়ে ধারণা আছে?
জিনাত : আমি এখানে আসার আগে অনেক কিছু নিয়ে রিসার্চ করেছি। বিশেষ করে যারা আমার সমান ওজন শ্রেণিতে খেলছেন, তাদের নিয়ে কাজ করেছি। তাদের খেলা দেখার পর মনে হয়েছে ফাইটটা অনেক কঠিন হবে। সবাই উঁচু মানের অ্যাথলেট। আমেরিকায় অনেক মেয়ে আছেন, যারা চাকরি করেন এবং খেলেনও। কিন্তু এশিয়ানরা ছোটবেলা থেকেই বক্সিং শুরু করেন। যদি ওই জিনিসটা আমি চিন্তা করি, তাহলে তাদের কাছে আমি কিছুই না। কিন্তু অন্য বিষয় চিন্তা করলে আমি বলব লড়াই করার মতো সামর্থ্য আছে আমার। তবে বিভিন্ন অ্যাথলেট ভিন্ন ক্যাটাগরি। একেকজন একেক স্টাইলে খেলেন। আমি অনেককেই দেখেছি এবং নিজেকে প্রস্তুত করেছি। আপনি দেখবেন, আমি কীভাবে তাদের জবাব দিই।