লর্ডস থেকে আহমেদাবাদ
পুরোনো হিসাব নতুন করে শুরু
জহির উদ্দিন মিশু
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৩ | ২০:০১ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৩ | ২০:০১
বর্ষার আকাশে ঘুরে বেড়ানো মেঘ কখন যে বৃষ্টি হয়ে নামে, তার কোনো হদিস নেই। এই জায়গায় মনের আকাশও অনেকটা তেমনি। বহুদিন ধরে একটু একটু করে পুষে রাখা আক্ষেপ বা না পাওয়ার বেদনা কখন যে চোখের জল হয়ে নামবে কিংবা ঝড় হয়ে বইবে, বলা মুশকিল। নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটাররা যেন সেই বর্ষার আকাশে ঘুরে বেড়ানো মেঘের মতো! কখন যে স্বপ্ন ভঙ্গের কষ্টে কেঁদে চোখ ভাসান, আবার কখন প্রতিপক্ষকে দুমড়ে-মুচড়ে জয়ের মশাল ওড়ান হলফ করে বলা যাবে না।
ঠিক চার বছর আগে লর্ডসের ময়দানে যে যুদ্ধে হেরেছিল নিউজিল্যান্ড, সেই হারের কষ্টগুলো শিশিরের মতো করে জমা হতে হতে আজ এক সাগর হয়েছে। যে ইংল্যান্ডের জন্য স্বপ্নের কবর হয়েছিল, আজ তাদের হারিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করতে চাচ্ছে দলটি। হিসাবের খাতার পুরোনো পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়ে নতুন করে এগিয়ে যেতে চাচ্ছে কেন উইলিয়ামসন বাহিনী। হয়তো এই যাত্রাটা সহজ হবে না। সেটা জেনেও লড়াইয়ে নামতে প্রস্তুত কিউইরা। হোক না প্রতিপক্ষ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড। এটাই যে পুরোনো ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ দেওয়ার সুযোগ।
সেদিন যে কিউইরা ডানা মেলে উড়তে পারেনি। উড়বে বলে মনের কোণে জমা স্বপ্নগুলো বড় যত্ন করে লালন করেছিল, কিন্তু এক অচেনা ঝড় এসে সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেয়। শান্ত-ক্লান্ত আর হতাশার সাগর বেয়ে শেষ পর্যন্ত মেনেই নিতে হয় পরাজয়। সেই পরাজয়ে তাদের কিছুতেই স্বস্তি দিচ্ছিল না। সপ্তাহ, মাস, বছর যায় কিন্তু লর্ডসের দুঃস্মৃতি কিছুতেই মাথা থেকে সরানো যায়নি। এক সাক্ষাৎকারে নিউজিল্যান্ডের সে সময়কার অন্যতম সেরা তারকা গাপটিলও শুনিয়েছেন বিভীষিকা অতীতটা, ‘আমার জীবনে এটি (বিশ্বকাপ ফাইনাল) একই সঙ্গে সেরা ও সবচেয়ে বাজে দিন। অনেক রকম আবেগ কাজ করেছে। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করাটা গর্বের, দুর্দান্ত সব সতীর্থের পাশে খেলেছি।’
গাপটিলের তৃপ্তিটা লড়াই করে হেরে যাওয়ার মাঝে লুকিয়ে। কিন্তু বেদনাটা-আফসোসটা এভাবে ম্যাচটা হেরে যাওয়ায়। শুধু গাপটিল নন, গোটা নিউজিল্যান্ডের দুঃখ এখানটায়। তাই সেই দুঃখের গল্পে এবার সমাপ্তি টানতে চান উইলিয়ামসন-ফার্গুসনরা। যার শুরু একই প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডকে দিয়ে। তবে মঞ্চটা বদলে গেছে। এবার আর লর্ডস নয়, আহমেদাবাদে খেলবে দুই দল। নতুন মঞ্চে নতুনভাবে তাদের এই শুরুর মাঝে আছে পুরোনো হিসাব। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ডের জন্য এই ম্যাচটা অতীতের দুঃখ ভোলার। আর ইংল্যান্ড চাইবে ২০১৯ এর ইতিহাসের পাতাটা আরেকটু রঙিন করতে।
ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ। ক্রিকেট বোদ্ধারা বলছেন, রানের ফুল ফুটবেই। সে ক্ষেত্রে কঠিন প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে হবে বোলারদেরই। তবে উপমহাদেশের উইকেট স্পিনবান্ধব হওয়ায় ঘূর্ণির জাদুকররা পেতে পারেন বাড়তি সুবিধা। যেখানে আজকের ম্যাচে ইংল্যান্ডের জন্য সুখবর বয়ে আনতে পারেন আদিল রশিদ-মঈন আলিরা। আর নিউজিল্যান্ডের হয়ে চমক দেখাতে পারেন ইশ সোধি-মিচেল স্যান্টাররা। এই তো ক’দিন আগেও বাংলাদেশ সফরে তারই একটা রিহার্সেল দিয়ে যান ভারতীয় বংশোদ্ভূত সোধি। বাংলাদেশের বিপক্ষে এক ম্যাচেই ৩৯ রান দিয়ে ৬ উইকেট শিকার করেন। ইংলিশ ব্যাটিং লাইনে ধস নামাতে একজন সোধিই যথেষ্ট। সেই সঙ্গে তাদের পেস আক্রমণও ক্ষুরধার। অভিজ্ঞ ট্রেন্ট বোল্টের সঙ্গে লকি ফার্গুসন এবং ব্যাটিং অলরাউন্ডার ড্যারেল মিচেলও। তবে একটা দুঃসংবাদ থাকছে তাদের জন্য। আরেক অভিজ্ঞ পেসার টিম সাউদি এই ম্যাচে খেলবেন না। কারণ, চোট থেকে এখনও পুরোপুরি সেরে ওঠেননি তিনি। থাকবেন না নিয়মিত দলনেতা উইলিয়ামসনও।
তার ওপর ইংল্যান্ডের মতো ‘অল স্পেশাল’ বোলারও নেই নিউজিল্যান্ডের। যে কিনা একাই ম্যাচের চেহারা বদলাতে পারবেন। ইংলিশরা এই ম্যাচে সেদিক থেকে এগিয়ে থাকবে। কারণ, তাদের ডেরায় যেমন মার্ক উডের মতো এক্সপ্রেস গতির পেসার আছেন, আবার বেন স্টোকসের মতো ম্যাচ উইনার আছেন। স্পিন আক্রমণ নিয়েও তাদের ভাবতে হয় না। এর পর মিডল অর্ডার থেকে দ্রুত রান তোলার মতো ব্যাটারের অভাব নেই। সব মিলিয়ে কেবল আজকের ম্যাচই নয়, গোটা বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষদের ঘুম হারাম করার মতো সব অস্ত্রের জোগাড় রেখেছে থ্রি লায়ন্সরা।
এত সব আলোচনার পরও ঘুরেফিরে দু’দলের খেলোয়াড়দের মনের আঙিনায় উঁকি দেবে গত বিশ্বকাপ। সেই থ্রিলার জয়। সমান স্কোর ভাঙতে সুপার ওভার, সেখানেও সমান লড়াই। এর পর বাউন্ডারির হিসাবে ইংল্যান্ডকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা। ম্যাচের পর বিতর্কে আগুন দাউদাউ করে জ্বলা। আবার যখন প্রতিপক্ষ হিসেবে ইংল্যান্ডকে পেল নিউজিল্যান্ড, তখন তো সেই নাটকীয় পতন তাদের ক্রিকেটারদের তাতিয়ে দেওয়ারই কথা।
কাকতালীয়ভাবে পরিসংখ্যানও লড়াইয়ের সমান ঘরে দাঁড়িয়ে। এক দিনের ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত ৯৫ বার দু’দল মুখোমুখি হয়েছে। যেখানে ইংল্যান্ড ৪৪ ম্যাচ জিতে, নিউজিল্যান্ডও ৪৪ ম্যাচে জয় পায়। বাকি সাত ম্যাচের তিনটি টাই আর চার ম্যাচে হয়নি ফল। সে ক্ষেত্রে এখানেও হিসাবটা নতুন করে শুরু করতে যাচ্ছে তারা। আর ওয়ানডে বিশ্বকাপের রেকর্ড বই বলছে, ইংলিশদের সঙ্গে ১০ ম্যাচের চারটি জিতেছে নিউজিল্যান্ড। অবশিষ্ট ছয় ম্যাচের একটি টাই আর পাঁচটিতে হেরে যায় তারা। এখানে তফাতটা উনিশ-বিশ। সেদিক থেকে আজ আহমেদাবাদে বিশ্বকাপের যাত্রাটা কোনো দলই সহজে ভঙ্গ হতে দেবে না। আর দু’দলের এমন কঠোর মনোভাব হয়তো ক্ল্যাসিকাল একটা ম্যাচেরই মঞ্চায়ন করতে পারে।